default-image

গত ২১ মে ভোরটা আমার কাছে ছিল অন্য রকম। রাতভর ঝড়ের তাণ্ডব শুনতে শুনতে কখন যে ভোর হয়ে গেছে, তা বুঝতে পারিনি। ভোরের দিকে ঝড়ের তাণ্ডব কিছুটা কমে আসার পর সামান্য ঝিমুনিও চলে আসে। এরই মধ্যে ফজরের নামাজ পড়তে তৎপর হয়ে ওঠেন মুসল্লিরা। ডেকে দেওয়া হয় আমার মতো যাঁরা মসজিদে আশ্রয় নিয়েছিলেন তাঁদের। এলাকার বয়স্ক, নারী ও মেয়েদের আশ্রয়কেন্দ্রে তুলে দেওয়ার পর ঠাঁই না পাওয়ায় আমার মতো শত শত মানুষের আশ্রয় হয়েছিল মসজিদে।

আমার বাড়ি খুলনার কয়রা উপজেলার সদর ইউনিয়নের ঘাটাখালী গ্রামে। কয়রার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কপোতাক্ষ নদের পাড় থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরত্বে আমার বাড়ি। করোনাভাইরাস সংক্রমণ আর ঈদুল ফিতরের জন্য ঘূর্ণিঝড় আম্পানের সময় বাড়িতেই ছিলাম আমি।

বিজ্ঞাপন

আমাদের এলাকায় রাস্তা বলতে যেটি বোঝায়, তার বেশির ভাগই পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ। অন্যদের মতো মসজিদ থেকে বের হয়ে রাস্তা ধরে পা বাড়াই বাড়ির দিকে। এ সময় আমার চারপাশের চেনা গ্রাম হয়ে ওঠে পুরোপুরি অচেনা। ভাঙাচোরা রাস্তা, পথের দুই পাশে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা বাড়িঘর, এখানে-সেখানে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন জায়গা থেকে উড়ে আসা ঘরের চাল ও টিন, দুমড়েমুচড়ে পড়া গাছপালা সবকিছু মিলিয়ে এক অন্য রকম পরিবেশ চারদিকে। কোনো কোনো জায়গা থেকে ভেসে আসা সব হারানো মানুষের হাহাকার ও আর্তচিৎকার। বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। নিজেকে যেন অন্য কোনো জায়গায় আবিষ্কার করলাম। নিজেদের ঘরগুলোও নিচের মাটির ভিত ছাড়া অর্ধভঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বেলা বাড়তেই ক্ষুধার্ত পেটগুলো হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে খাবার। কিন্তু কোথায় খাবার? কিছুই তো নেই। যেখানে থাকার জায়গাটুকু নেই, সেখানে খাবার আসবে কোথা থেকে। রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় অন্য কোথাও থেকে খাবার নিয়ে আসার মতো পরিস্থিতিও নেই।

জোয়ার আসতেই দেখা দেয় নতুন বিপত্তি। বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় জোয়ারের পানি প্রবেশ করছে লোকালয়ে। নিজেদের ভাঙা ঘরগুলো যাঁরা মেরামতের কাজ করছিলেন, তাঁরা দেখেন জোয়ারের পানি ঢুকে যাচ্ছে ঘরে। অনেকে ঘরের আসবাব বলতে অবশিষ্ট যা ছিল, তা নিয়ে আশ্রয় নিতে শুরু করেছেন বাঁধের ওপর খোলা আকাশের নিচে। জোয়ারের পানি থেকে বাঁচতে অনেকে ঘরের মধ্যেই উঁচু করে মাচান দিয়ে থাকার ব্যবস্থা করতে লাগলেন। যাঁদের সবকিছুই হারিয়ে গেছে, তাঁরা থেকে গেলেন আশ্রয়কেন্দ্রে। জোয়ার বা ভাটার স্রোতে বাইরে বের হওয়ার মতো কোনো পথ ছিল না।

আম্পানে কয়রা সদর ইউনিয়নের ঘাটাখালী, হরিণখোলা, ২ নম্বর কয়রা, পাশের ইউনিয়ন উত্তর বেদকাশীর হাজতখালী, পাথরখালী ও কাঠকাটার পুরো বাঁধই বিধ্বস্ত। ওই সব ভাঙা স্থান দিয়ে জোয়ারের সময় এলাকায় পানি প্রবেশ করছে। ভাটার সময় আবার সেই পানি কপোতাক্ষ নদে চলে যাচ্ছে। এভাবেই চলতে থাকায় পানি ওঠা-নামার কারণে গভীর হয়ে খাল হতে শুরু করল এলাকা। আর তাতে মানুষের বসতবাড়ি, জায়গাজমি চলে যেতে থাকে পানির তোড়ে। নিয়মিত জোয়ার-ভাটার কারণে প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। ঝড়ের দুই দিনের মধ্যে তলিয়ে যায় সদর উপজেলাও।

default-image

এমন পরিস্থিতিতে শুরু হলো নতুন সংগ্রাম। এলাকার মানুষ জানে, বাঁধ নির্মাণ না হলে টিকে থাকা অসম্ভব। তাই দুই দিন পর থেকেই শুরু হলো বাঁধ মেরামত ও সংস্কার করার অভিযান।

২ নম্বর কয়রা গ্রামের ভাঙা বাঁধ দিয়েই প্রবেশ করা পানি তলিয়ে দিচ্ছিল উপজেলা সদর। তা ছাড়া স্থানটিও ছিল তুলনামূলক কম ভাঙা। এ কারণে প্রথমে ওই জায়গায় পানি আটকানোর চিন্তা করেন এলাকাবাসী। সংগঠিত হতে শুরু করেন তাঁরা। এলাকাবাসীর ওই কাজে এগিয়ে আসে উপজেলা প্রশাসন।

২৩ মে বিকেলে গ্রামে গ্রামে মাইকিং করা হলো, প্রতিটি মসজিদে বারবার ঘোষণা হতে থাকল, ‘আপনারা বাইরে আসুন, বাঁধে আসুন, ঝোড়া কোদাল নিয়ে আসুন।’ জানানো হয় সাহ্​রির পরপরই শুরু হবে রিং বাঁধ দেওয়ার কাজ। পরদিন ভোরেই হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন ভাঙা বাঁধের স্থানে। অনেকে শুধু পানি আর শুকনা চিড়া-গুড় খেয়েই স্বেচ্ছাশ্রমে লেগে পড়েন বাঁধ নির্মাণের কাজে। জোয়ারের পানি ভরতেই সেদিনের মতো কাজের ইতি টানা হয়।

বিজ্ঞাপন
default-image

পরদিন ২৫ মে ঈদুল ফিতর। তাই সেদিন কাজ করা হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা। কিন্তু এলাকাবাসী ও প্রশাসন মিলে সিদ্ধান্ত নেয় কাজ করার। আবারও মসজিদে মসজিদে চলে মাইকিং, পুরুষদের কাজে যেতে উদ্বুদ্ধ করতে পাড়ায় পাড়ায় প্রচার চালানো হয়, বন্ধ ঘোষণা করা হয় কয়রা বাজার।

ঈদের দিন ভোরে আবারও ভাঙা বাঁধ এলাকায় হাজির হন হাজার হাজার মানুষ। নারীরা ছাড়া বাড়িতে কেউ ছিলেন না বললেই চলে। ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাদামাটি আর বৃষ্টিতে ভিজে সেদিন কাজ করেছিলেন সবাই।

ব্যক্তিগতভাবে জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজ বাঁধের সরঞ্জাম দিয়েছে, কেউ টিন, কেউ বাঁশ, বল্লি, বস্তা, কোদাল দিয়েছেন। স্বেচ্ছাশ্রমে করা ওই কাজের সাফল্য মানুষকে দ্বিগুণ উৎসাহিত করে। এ কারণে এক দিন বিরতি দিয়েই সবার প্রচেষ্টায় শুরু হয় ঘাটাখালী ও হরিণখোলা এলাকায় রিং বাঁধ দেওয়ার কাজ।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ নির্মাণকাজের দিকে না তাকিয়ে এভাবেই ঘাটাখালী, হরিণখোলা, ২ নম্বর কয়রা, হাজতখালীতে হাজার হাজার মানুষের স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত হয়েছে বাঁধ। এ যেন একটার পর একটা ভাঙা বাঁধ জয় করার গল্প।

হাসানুল বান্না: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র

মন্তব্য পড়ুন 0