ঢাকা থেকে মাত্র ৩ ঘণ্টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রাম

বিজ্ঞাপন
default-image

বছর দুয়েক বছর আগের কথা। কোরবানির ঈদে বাড়ি যাচ্ছিলাম। আরামবাগে নটর ডেম কলেজের অপর পাশে থাকা কাউন্টার থেকে বাসে উঠি। সময় রাত ১০টা। গ্রীন লাইন স্কেনিয়া।

মতিঝিল শাপলা চত্বর হয়ে যাত্রা শুরু হয়। সায়েদাবাদ হয়ে যাত্রাবাড়ী পার হতেই বেজে যায় রাত প্রায় সাড়ে ১১টা। মেঘনা, গোমতী নদীতে এসে পড়তে হলো দীর্ঘ যানজটে। সময়ের পর সময় অপচয় হয়ে চলছে। গাড়ি আর চলে না। অনেক পরে সেতু পার হওয়া গেল। জরাজীর্ণ সড়কে বাস ও ট্রাকের তীব্র প্রতিযোগিতার ভিড়ে আটকে যাচ্ছি বারবার। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাস চট্টগ্রাম পৌঁছাতে লেগে যায় প্রায় ৯ ঘণ্টার মতো।

চট্টগ্রামে খানিক বিরতির পর যাত্রা শুরু হলো কক্সবাজারের পথে। ছোট্ট, আঁকাবাঁকা সড়ক। তীব্র যানজট। কক্সবাজার যেতে লেগে যায় আরও ৭ ঘণ্টা! মোট ১৬ ঘণ্টা।

১৬ ঘণ্টা যে নিয়মিত লাগত, তেমনটা নয়। সাধারণত জ্যাম কম থাকলে ঢাকা থেকে কক্সবাজার যেতে ১০-১২ ঘণ্টার মতো সময় লেগে যেত।

এই সময়ের মধ্যেই চলার পথে যাত্রীরা বিরক্ত হয়ে কত রকমের যে গালি দেয়, তা বলার ভাষা নেই; দেওয়ারই কথা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটা জায়গায় বসে থাকার মতো বিরক্তি আর কিছুতে তো হতে পারে না। আমি নিজেও মনে মনে সড়কের আর সরকারের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করেছি অনেকবার। কড়া সমালোচনা করে স্ট্যাটাসও দিয়েছি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে।

জরাজীর্ণ সড়ক। তীব্র যানজট। তার ওপর দীর্ঘ যাত্রায় বাস ভাড়া অনেক৷ এসি বাসে দুই হাজার। স্লিপিংয়ে গেলে ২৫০০ টাকা। নন এসি কিছুটা কম বটে৷ কিন্তু দীর্ঘ যাত্রায় সেই বাসে ওঠাটা চরম ভোগান্তি।

এসব ভোগান্তি থেকে একটা সময় আমি তো বাড়ি যেতে আগ্রহই হারিয়ে ফেলি। কক্সবাজার যাওয়ার চেয়ে আমার কাছে কলকাতা থেকে ঘুরে আসা আরও সহজ মনে হয়েছে। তিন মাসে আগে সেটাই করেছিলাম। অফিস থেকে ১০ দিনের ছুটি নিয়ে কম খরচে এক সপ্তাহ কলকাতায় ঘুরে এসেছি। কক্সবাজার এলে তার ডাবল খরচ পড়ে যায়।

default-image

যা হোক, সেই গতবার ঈদে বাড়িতে এসেছিলাম। আর এক বছর পর এবার ঈদে আসা হলো। ঢাকা থেকে সড়ক পথে দেশ ট্রাভেলস করে সময় লাগল ৭ ঘণ্টা! মূলত ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের পথে সময় লাগে মাত্র ৩ ঘণ্টা ৪০ মিনিট৷ ঢাকা থেকে বের হতে ৩০ মিনিট না লাগলে এবং কুমিল্লা ২০ মিনিটের বিরতি না থাকলে মাত্র ৩ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে আসা যেত। যে পথে আগে ৭-৯ ঘণ্টা লাগত। সেই পথেই এখন চার ঘণ্টার নিচে নেমে এল কীভাবে, প্রশ্ন হতে পারে।

হ্যাঁ, এই পরিবর্তন হঠাৎ করে হয়নি। দীর্ঘ কয়েক বছরের পরিকল্পনার ফসল জনগণ এখন পাচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রামের মহাসড়ক এখন ফোর লেনের। এরপর কদিন আগে বাংলাদেশের অর্থনীতির ‘লাইফ-লাইন’ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বহুল প্রতীক্ষিত দ্বিতীয় মেঘনা ও দ্বিতীয় গোমতী সেতুর উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেতু দুটি চালুর ফলে এবারের ঈদে যানজট এড়িয়ে স্বস্তিতে ঘরে ফেরার সুযোগ তৈরি হলো আমাদের।

বাংলাদেশ সরকার ও জাইকার অর্থায়নে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ১ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে গোমতী নদীর ওপর ১৭টি স্প্যানের ১ হাজার ৪১০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১৭ দশমিক ৭৫ মিটার প্রস্থের দ্বিতীয় গোমতী সেতু এবং ১ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে মেঘনা নদীর ওপর ১২টি স্প্যানের ৯৩০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১৭ দশমিক ৭৫ মিটার প্রস্থের দ্বিতীয় মেঘনা সেতু নির্মাণ করা হয়। কাজ শুরুর ৪১ তম মাসে এসে শেষ হয় সেতু দুটির নির্মাণকাজ।

নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় সাত মাস আগে দ্বিতীয় কাঁচপুরসহ এ নতুন দুটি সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ায় প্রায় ৭০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে।

সেতুর উদ্বোধনের শুরুতে শুভেচ্ছা বক্তব্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত হিরোইয়াসু ইজুমি বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

জাপান এই দেশের সর্বত্রই দারুণভাবে সহযোগিতা করে থাকে। এই সহযোগিতার ধারা অব্যাহত থাকলে দারুণ হবে। সামনে যদি চট্টগ্রামের সঙ্গে কক্সবাজারের রেলপথ নির্মিত হয় এবং মহাসড়ক ফোর লেন করা হয়, তাহলে দূরত্ব আরও কমে আসবে। আর যদি জাপানের মতো বুলেট ট্রেন নির্মাণ করা যায় এবং ঘণ্টায় ২৮৫-৩০০ কিলোমিটার গতিতে আসা যায়, তবে বুঝুন ঢাকা থেকে কক্সবাজার আসতে কত সময় লাগবে?

সম্প্রতি জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘জাপানের মডেলে বাংলাদেশের উন্নয়ন করা হবে। বঙ্গবন্ধুও সেটা চেয়েছিলেন।’ আমার দৃঢ় বিশ্বাস তা হবে। বুলেট ট্রেনের এই প্রকল্প আগামী ২০২২ সাল নাগাদ শেষ হবে। ফলে ২০২২ সাল থেকেই ঢাকা-চট্টগ্রামগামী যাত্রীরা পাচ্ছে বুলেট ট্রেন। ইতিমধ্যে সেই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে গেছে বলেও শোনা গেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের ট্রেন যাত্রার লম্বা সময়ের ঝক্কি থেকে মুক্তি পেতে যাচ্ছে যাত্রীরা। কারণ এই পথে হাই-স্পিড ট্রেন সার্ভিস চালু হতে যাচ্ছে। এই সার্ভিস চালু হলে বর্তমানের ৬-৭ ঘণ্টার যাত্রা হয়ে যাবে মাত্র দেড় থেকে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টার। শুনেছি এই ‘বুলেট ট্রেন’ চলবে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২০০ কিলোমিটার গতিতে। বাংলাদেশের বর্তমান আন্তনগর ট্রেনগুলোর গতি ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটার। এমন একদিন হয়তো আসবে, যেদিন ঢাকা থেকে বুলেট ট্রেনে করে কক্সবাজারে মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টায় আসা যাবে।

পর্যটনের অগ্রগতির জন্য যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়নের বিকল্প নেই। বুলেট ট্রেন চালু হবে ইনশা আল্লাহ। উন্নত দেশ হবে বাংলাদেশ।

এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ...জয় বাংলা।

সাইফুল্লাহ সাদেক, গবেষক।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন