এ বছরও আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে সকালে কলেজ প্রাঙ্গণে ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং অ্যালামনাই ট্রাস্টের পতাকা উত্তোলন করেছি ট্রাস্টের পক্ষ থেকে। এ ছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজের কৃতী সন্তানদের সংবর্ধনা দেওয়া হবে। হবে দেশে-বিদেশে ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের স্মৃতিচারণামূলক অনুষ্ঠান। আমাদের বিশ্বাস, করোনা শেষ হলে আমরা আবারও মিলিত হব প্রাণের উচ্ছ্বাসে প্রিয় প্রাঙ্গণে। বাংলাদেশের ক্রান্তিলগ্নে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রছাত্রী এবং অ্যালামনাইদের অবদান অপরিসীম। জনগণের স্বাস্থ্যসেবা, দেশের চিকিৎসা পেশার মানোন্নয়ন এবং দেশের যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় এ কলেজের ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টির ৬ দফা, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনসহ ইতিহাসের প্রতিটি সন্ধিক্ষণে এ কলেজের চিকিৎসক ও ছাত্রছাত্রীদের বীরোচিত ভূমিকা জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে কয়েক সহস্র চিকিৎসক আজ নিয়োজিত জনগণের চিকিৎসাসেবায়।

কেবল দেশের সীমানায়ই নয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজের একসময়ের শিক্ষার্থীরা আজ ছড়িয়ে পড়েছেন বিশ্বের নানা প্রান্তে, সবখানেই পেশাগত প্রতিভায় তাঁরা দীপ্যমান। চিকিৎসা, শিক্ষা, গবেষণা ও সেবার সঙ্গে সঙ্গে জনগণের স্বাধিকার আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবে এই বিদ্যাপীঠের ভূমিকা ইতিহাসের গৌরবময় অংশ হয়ে আছে। দীর্ঘ স্বাধীনতাসংগ্রামের আন্দোলনের এই প্রতিষ্ঠান ছিল সামনের সারিতে। আমাদের স্বাধীনতার সূর্যটি ডা. ফজলে রাব্বী, ডা. আলীম চৌধুরীর মতো অসংখ্য চিকিৎসকের আত্মদানে হয়েছে উজ্জ্বলতর। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণ-আন্দোলনও এই মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন ছাত্র ও রাজপথের সহযোদ্ধা ডা. শামসুল আলম খান মিলনের রক্তে পেয়েছিল নতুন মাত্রা। এই দেশের গণমানুষের অধিকার আদায়ের প্রতিটি আন্দোলনে রয়েছে আমাদের সাহসী উত্তরাধিকার। ইতিহাসের পাদপীঠে স্রোতস্বিনী সময়ের মোহনায় দাঁড়িয়ে সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করছি মাতৃভাষার জন্য যাঁরা বুকের তাজা রক্তে রঞ্জিত করেছিলেন রাজপথ, যাঁদের হাত ধরে উদিত হয়েছিল স্বাধীনতার রক্তিম লাল সূর্য, যাঁরা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করেছেন, অতল শ্রদ্ধা সেসব আত্মত্যাগী বীর শহীদ চিকিৎসককে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দেশের চিকিৎসাসেবায় নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। নিরন্তর মানবতার সেবায় এই প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা ছড়িয়ে আছেন পৃথিবীর সর্বক্ষেত্রে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ তার সংগ্রামী ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বজায় রেখেছে এই দেশের গণমানুষের অধিকার আদায়ের প্রতিটি আন্দোলনে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের দুয়ার থেকে কোনো রোগীকে বিনা চিকিৎসায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে—এমন দৃষ্টান্ত নেই। করোনাযুদ্ধে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সন্তানেরা এগিয়ে এসেছেন সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে, তাঁদের আত্মত্যাগের এই ঋণ চিরস্মরণীয়।

১৯৪৬ সালের ১০ জুলাই উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন এ চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু করে। এর কিছুদিন পর ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কিন্তু জন্মলগ্ন থেকেই ভাষাকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রটির পূর্বাংশের জনগণের মধ্যে অসন্তোষের জন্ম নেয়। এ অসন্তোষের সূচনালগ্ন থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ১৯৫২ সালের ২৫ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকায় ঘোষণা দেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। এ সময় বঙ্গবন্ধু কারাবন্দী ছিলেন। অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কেবিনে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের কেবিনে বসেই তিনি ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি নঈমুদ্দিন, সাধারণ সম্পাদকসহ ছাত্রনেতাদের সঙ্গে গোপনে বৈঠক করে আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দিতেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি একুশে পদক প্রদান অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় এসব তথ্য তুলে ধরেন।

বাংলাদেশের ক্রান্তিলগ্নে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রছাত্রী ও অ্যালামনাইদের অবদান অপরিসীম। জনগণের স্বাস্থ্যসেবা, দেশের চিকিৎসা পেশার মানোন্নয়ন এবং দেশের যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় এ কলেজের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

ভাষা আন্দোলনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ

১৯৪৮ সালের মার্চে রমনার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন, ‘উর্দু, শুধু উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। সেদিন থেকে পূর্ব বাংলার ছাত্র-শিক্ষকসহ আপামর জনসাধারণ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সেই চাপা ক্ষোভ ১৯৫২ সালে আন্দোলনে রূপ নেয়। কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকে ৪ জানুয়ারি সফল ছাত্রধর্মঘটের পর শাসকগোষ্ঠী একুশে ফেব্রুয়ারি সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনেকেই ১৪৪ ধারা ভাঙার বিপক্ষে থাকলেও ছাত্রনেতারা তাঁদের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।
২১ ফেব্রুয়ারি সকালে ঐতিহাসিক আমতলায় (বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে, যেখানে নতুন অপারেশন থিয়েটার কমপ্লেক্স তৈরি হয়েছে) প্রতিবাদী ছাত্রদের সভার পর ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল শুরু হয়। পুলিশের বেপরোয়া লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও গ্রেপ্তারের কারণে শান্তিপূর্ণ মিছিল কিছুক্ষণের মধ্যে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দুপুরের পর পুলিশ গুলিবর্ষণ শুরু করে। ফলে, ব্যারাক চত্বর ও তার আশপাশে গুলির আঘাতে শহীদ হন রফিক, বরকত ও জব্বার। বরকতকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে জরুরি অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা লাশগুলো বর্তমান ডিসেকশন হলের পেছনে লুকিয়ে রেখেছিলেন পরদিন জানাজার জন্য, কিন্তু রাতে পুলিশ তা ছিনিয়ে নিয়ে যায় এবং আজিমপুর কবরস্থানে গোপনে দাফন করে।

পুলিশের গুলিবর্ষণের খবর ছড়িয়ে পড়লে হাসপাতাল ও ব্যারাক চত্বরে মানুষের ঢল নামে। একুশে ফেব্রুয়ারি রাতে তখনকার ছাত্র সংসদের সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, ব্যারাকে অবস্থানরত ছাত্রদের সঙ্গে আলাপ করে কন্ট্রোল রুম স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। এই কন্ট্রোল রুম স্থাপন মেডিকেল কলেজের তৎকালীন ছাত্রদের একটি বুদ্ধিদীপ্ত সাহসী সিদ্ধান্ত ছিল। পরবর্তী সময়ে এই কন্ট্রোল রুমেই রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবীসহ সর্বস্তরের জনতার সংহতি প্রকাশের একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। তা ছাড়া কন্ট্রোল রুমের মাইক থেকেই নেতারা পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন।
২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, রোববার, সরকারি ছুটির দিন। নবনির্মিত শহীদ মিনারটি প্রথমে উদ্বোধন করেন শহীদ শফিউরের বাবা। কিন্তু তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর ছুটির আরাম হারাম হয়ে যায়, যখন তিনি শুনতে পান স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ এবং দলে দলে লোকের তা দর্শন ও মুখ্যমন্ত্রীকে ধিক্কার দেওয়ার কথা। শহীদ মিনার আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। ছাত্র-জনতার মধ্যে প্রতিবাদী চেতনার নতুন উদ্ভাস তৈরি করে।

মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা মেডিকেল কলেজ

মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা চিকিৎসক, তৎকালীন ছাত্র, কলেজ ও হাসপাতালে কর্মরত নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। তাঁদের অনেকেই অস্ত্র হাতে পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। আবার কেউ কেউ হাসপাতালে মুক্তিযোদ্ধা ও অসহায় বাঙালিদের চিকিৎসা করেছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভূমিকা তিন ভাগে বর্ণনা করা যেতে পারে।
প্রথম ভাগে যাঁরা এই সময় কলেজের ছাত্র ছিলেন এবং প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাঁদের তৎপরতা। দ্বিতীয় ভাগে এ কলেজ থেকে পাস করা চিকিৎসকদের একটি অংশ, তৃতীয় ভাগ হলো যাঁরা অন্যান্য হাসপাতাল ও সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোরে কর্মরত ছিলেন, কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধ করেছেন।
এ কলেজের তৎকালীন ছাত্রদের মধ্যে বিভিন্ন সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধ করেছেন মোয়াজ্জেম হোসেন, সেলিম আহমেদ, আলী হাফিজ সেলিম, আবু ইউসুফ মিয়া, ইকবাল আহমেদ ফারুক, মুজিবুল হক, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, মোজাফফর, আমজাদ হোসেন, ওয়ালীত, ওসমান, গোলাম কবীর, জিলর রহিম, ডালু নুরুজ্জামান, শাহাদত প্রমুখ। তাঁদের অনেকেই ঢাকা শহর কমান্ডের তত্ত্বাবধানে থেকে যুদ্ধ করেছিলেন।

ছাত্রাবাসের ১০৭ নম্বর রুমে সে সময় রাজাকারদের ঘাঁটি ছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন হামলায় হোস্টেল গেটে পাহারারত দুজন রাজাকার নিহত হয়। গুলির শব্দ শুনে ১০৭ রুমে অবস্থানরত অন্য রাজাকাররা পালিয়ে যায়। এদের একজন সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের গুলির আঘাতে নিহত হয়। একই দিনে তারা ২১৯ নম্বর রুমে হামলা চালায়। গ্রুপটি কলেজ ডিসেকশন হলেও বোমা হামলা চালিয়েছিল। এ কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী নিপা লাহিড়ী যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ভারতে যাওয়ার পথে ফতুল্লায় নিহত হন। আরেক ছাত্র সিরাজুল ইসলাম হাসপাতালে বিভিন্নভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতেন। তিনি রাতে হোস্টেলে না গিয়ে হাসপাতালের ক্যানসার ওয়ার্ডে ঘুমাতেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের কিছু স্বাধীনতাবিরোধী ছাত্রের সহায়তায় তাঁকে ১১ ডিসেম্বর রাতে রাজাকার বাহিনী ক্যানসার ওয়ার্ড থেকে তুলে নিয়ে যায় এবং রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নির্মমভাবে হত্যাকরে।

তৎকালীন সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোরের সদস্যদের মধ্যে স্কোয়াড্রন লিডার এম শামসুল হক, মেজর খুরশীদ, মেজর শামসুল আলম, ক্যাপ্টেন আব্দুল লতিফ মল্লিক, ক্যাপ্টেন মোশারেফ হোসেন, ক্যাপ্টেন আ. মান্নান, লে. আখতার, লে. নুরুল ইসলাম প্রমুখ, অফিসার বিভিন্ন সেক্টরে নিয়োজিত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য ক্যাপ্টেন রশিদ বীর উত্তম ও লে. আখতার বীর প্রতীক উপাধি পেয়েছিলেন। তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোরের যেসব সদস্য শহীদ হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ডা. লে. কর্নেল এ এফ জিয়াউর রহমান, ডা. মেজর আসাদুল হক, ডা. লে. আমিনুল হক, ডা. লে. খন্দকার আবুজাফর মো. নুরুল ইমাম প্রমুখ ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছিলেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত প্রায় সব চিকিৎসকই আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা করতেন। মুক্তিযোদ্ধারা আসল নাম গোপন রেখে হাসপাতালে ভর্তি হতেন। হাসপাতালে এসব কাজের সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করতেন অধ্যাপক ফজলে রাব্বী। তিনি তাঁর আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করতেন। যুদ্ধের শেষ দিকে অধ্যাপক ফজলে রাব্বীসহ অনেক চিকিৎসককেই রাজাকার-আলবদর বাহিনী গোপন চিঠির মাধ্যমে মৃত্যুর ভয় দেখিয়েছিল।

তাদের চিঠির ভাষা ছিল, ‘কলকাতার মাড়োয়ারি দালালদের হত্যা করা হবে’। লাল কালির লেখা চিঠিতে একটি তরবারির প্রতিকৃতি আঁকা ছিল। তবে চিঠির নিচে প্রেরকের নাম-ঠিকানা ছিল না। রাজাকারদের ভয়ভীতি উপেক্ষা করেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকেরা বিভিন্নভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতেন। শহীদ অধ্যাপক আলীম চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের সময় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে কর্মরত থাকলেও বেশির ভাগ সময় কাটাতেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা অনেক চিকিৎসক ভারতে গিয়ে বিভিন্নভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এসব চিকিৎসকের অনেকে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন। আবার কেউ আহত মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের চিকিৎসা করেছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা চিকিৎসকদের মধ্যে যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাঁরা হলেন শিশির মজুমদার, ডা. সরওয়ার আলী, অধ্যাপক সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী, ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান, ডা. মাকসুদা নার্গিস, ডা. কাজী তামান্না, ডা. ফোজিয়া মোসলেম, ডা. সমূর কুমার শর্মা প্রমুখ (অনেকের নাম সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি)। দেশের ভেতর থেকে অসংখ্য চিকিৎসক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করার জন্য পাকিস্তান বাহিনী ও রাজাকারদের হাতে অনেককে জীবন দিতে হয়েছে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের প্রথম দিকে যুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের বেশির ভাগই ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তৎকালীন ছাত্র ও চিকিৎসকেরা বিভিন্নভাবে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা চিকিৎসক তৎকালীন ছাত্রছাত্রী এবং এই কলেজে কর্মরত চিকিৎসকদের তালিকা আমাদের সংরক্ষণ করা প্রয়োজন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ

নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণ-আন্দোলনও এই মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন ছাত্র ও রাজপথের সহযোদ্ধা ডা. শামসুল আলম খান মিলনের রক্তে পেয়েছিল নতুন মাত্রা। এ দেশের গণমানুষের অধিকার আদায়ের প্রতিটি আন্দোলনে রয়েছে আমাদের সাহসী উত্তরাধিকার। চিকিৎসাবিজ্ঞানে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দেশের চিকিৎসাসেবায় নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ তার সংগ্রামী ঐতিহ্য বজায় রেখেছে এই দেশের গণমানুষের অধিকার আদায়ের প্রতিটি আন্দোলনে।

অথচ মেলেনি স্বীকৃতি

দুঃখজনক হলেও সত্য, ঢাকা মেডিকেল কলেজ এখন পর্যন্ত কোনো জাতীয় স্বীকৃতি পায়নি। ২০২১ সালে ‘চিকিৎসা’ খাতে ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ’-কে ‘স্বাধীনতা পদক’ দেওয়ার জন্য আবেদন করেও আশাহত হয়েছি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা বললে যেমন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাদ দেওয়া যাবে না, তেমনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের নামটিও অবশ্যস্মরণীয়। তাই ঢাকা মেডিকেল কলেজকে স্বাধীনতা পুরস্কার অথবা একুশে পদক দেওয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

লেখক: অধ্যাপক ডা. এস এম মোস্তফা জামান, সেক্রেটারি জেনারেল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ অ্যালামনাই ট্রাস্ট