টানা তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করেন ঠিকাদার আবুল বাশার
টানা তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করেন ঠিকাদার আবুল বাশারছবি: আসাদুজ্জামান

চৈত্রের কাঠফাটা রোদে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন অন্তত চার শ মানুষ। এক সারিতে নারী, অন্য সারিতে পুরুষ। করোনাকালে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সামাজিক দূরত্ব ছিল না কোনো সারিতে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষ দাঁড়িয়ে থেকে বাজারের চেয়ে কম দামে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ট্রাক থেকে তেল, চিনি আর ডাল সংগ্রহ করছে।

টানা তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে বেলা দুইটার দিকে তেল, চিনি আর ডাল সংগ্রহ করেন আবুল বাশার ভূঁইয়া। বললেন, জীবনে প্রথমবার লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে টিসিবির গাড়ি থেকে পণ্য কিনলেন।

আবুল বাশারের ভাষায়, করোনায় গত বছরের টানা লকডাউনে তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্য শেষ হয়ে যায়। আয় ছিল না, কিন্তু ব্যয় তো ছিল। কিছু সঞ্চয় ছিল, তা শেষ হয়ে গেল। শুরু হলো নতুন জীবনযুদ্ধ। আবার যখন ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছেন, তখন আবার শুরু হলো লকডাউন।

আবুল বাশারের গ্রামের বাড়ি ফেনী জেলায়। কাজের খোঁজে ৩০ বছর আগে ফেনী থেকে ঢাকায় আসেন। শুরু করেন ক্ষুদ্র পরিসরে ঠিকাদারি ব্যবসা। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে থাকেন। বর্তমানে তিন মেয়ে, এক ছেলে আর স্ত্রীকে নিয়ে মুগদার ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। আবুল বাশারের চার সন্তানই লেখাপড়া করছেন। বড় মেয়ে একাদশ শ্রেণির, মাধ্যমিকের আর ছোট মেয়ে পড়ে অষ্টম শ্রেণিতে। ছেলে পড়ে কিন্ডারগার্টেনে।

বিজ্ঞাপন

বদলে যাওয়া জীবন

default-image

গত বছরের ৮ মার্চ দেশে করোনা শনাক্তের পর যখন মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, তখন আর পাঁচজনের মতো আবুল বাশারও আতঙ্কিত হন। কিছুদিন পর শুরু হয় লকডাউন। বন্ধ হয়ে যায় অফিস-আদালত। একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় বাশারের কাজ। আয় ছিল না। তবু ঘরভাড়া বাবদ মাস শুরুর প্রথম সপ্তাহে ১৫ হাজার টাকা বাড়িওয়ালাকে তুলে দিতে হয়েছে। স্কুল-কলেজ বন্ধ ছিল। তবু তিন মেয়ের অনলাইনে কোচিং ছিল। কোচিং বাবদ প্রতি মাসে খরচ হয়েছে অন্তত ১৫ হাজার টাকা। আর চাল, ডাল, তেলসহ সংসারের খরচ তো ছিলই। ক্ষুদ্র পরিসরে ব্যবসা করে জমানো কষ্টের টাকা খরচ হয়ে যায়।

আবুল বাশার প্রথম আলোকে বলেন, ‘যে সংসার করেন, সে–ই ভালো করে জানেন, কাছে যদি টাকা না থাকে, তাহলে মানসিক অবস্থা কেমন হয়। করোনায় ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে আমি হতাশ হয়ে পড়ি। আমার জমানো টাকা সব শেষ হয়ে যায়। কী করব, কীভাবে চলব, নানা দুশ্চিন্তা মাথায় ভর করে। আবার এসেছে লকডাউন। ব্যবসা-বাণিজ্যও বন্ধ।’

করোনার আগে ভালোই ছিলেন

করোনার আগে বাশারের আয় ভালোই ছিল। সরকারি-বেসরকারি অফিসে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে গড়ে প্রতি মাসে এক লাখ টাকা আয় ছিল। করোনাভাইরাস শুরুর পর থেকে সেই আয় এখন ৫০ হাজার টাকার নিচে নেমেছে। অথচ বাসাভাড়া, ছেলেমেয়েদের শিক্ষাব্যয়, সংসারের খরচসহ বাশারের মোট ব্যয় ৬০ হাজার টাকার বেশি। দিনের পর দিন করোনায় ব্যবসায় গতি না থাকায় আয়ের থেকে ব্যয়ের হার অনেক বেশি। পরিস্থিতির গ্যাঁড়াকলে পড়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন আবুল বাশার।

বাজারে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম পড়ে ১৪০ টাকা। সেখানে টিসিবির তেলের দাম প্রতি লিটার ১০০ টাকা। বাজারদরের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম টাকায় তেল, চিনি, ডাল, ছোলা পাওয়ার আশায় মতিঝিলে আসেন আবুল বাশার। টানা তিন ঘণ্টা রোদে দাঁড়িয়ে থেকে তেল, চিনি সংগ্রহ করে বাসায় ফেরার আগে বাশার বললেন, ‘এই শহরে যার আয় নেই, তার মতো অসহায় আর কেউ নেই।’ তিনি বললেন, ‘করোনায় বদলে যাওয়া জীবনের বড় বিপদ, মানসিক অস্থিরতা। আয় না থাকায় সেই অস্থিরতা আমার অনেক গুণ বেড়েছে। আমাদের মতো মানুষদের দেখার কেউ নেই।’

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন