default-image

তিন মাস থাকতে হয়েছে হাসপাতালে। ১১ বার অস্ত্রোপচার হয়েছে। রক্ত লেগেছে ২৫ ব্যাগ। ডান হাতটি পুরোপুরি কাটা পড়েছে। দুই পায়ের কোনোটিরই অবস্থা ভালো নয়। এত কিছুর পরও জীবনের কাছে হার মানেননি তিনি। বরং বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভাইভা শেষ করে ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
সংগ্রামী এই তরুণের নাম মিনার উদ্দিন (২৬)। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছেন। স্কুলজীবন কেটেছে ছাত্র পড়িয়ে। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক দুটিতেই জিপিএ-৫ পেয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন। যখন চাকরির পরীক্ষা দিতে শুরু করেছিলেন, তখনই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তাঁর জীবনপ্রদীপ নিভে যেতে বসেছিল। কিন্তু তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে হার মেনেছে মৃত্যু।
পুরান ঢাকার হোসেনী দালান রোডের সরু এক গলিতে ভাড়া বাসায় থাকেন মিনার। গতকাল বুধবার কথা হয় তাঁর সঙ্গে। ভবনটি অন্ধকার হলেও মিনারের কক্ষে প্রচুর আলো। জানালা দিয়ে আকাশ দেখা যায়। নিজের অসাধারণ নৈপুণ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগকে ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন মিনার। সেই মিনার এখন বিছানায়।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে ৩৬তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা দিয়ে ঈদের ছুটিতে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বাড়িতে গিয়েছিলেন মিনার। ১২ সেপ্টেম্বর রাতে একটি ভবনের সঙ্গে ঝুলে থাকা বিদ্যুতের তারে আকস্মিকভাবে স্পৃষ্ট হন। রাতেই তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে পরদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে। সেখানকার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মিনার প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘আমি বাঁচতে চাই। আমার স্বপ্নগুলো যেন শেষ না হয়ে যায়। আমি বিসিএসের ভাইভা দিতে চাই।’
মিনারের সেই আকুতি হৃদয় ছুঁয়ে গেছে মানুষের। অনেকেই তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। এরপর চলেছে দীর্ঘ চিকিৎসা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে প্রায় তিন মাস চিকিৎসা শেষে বেঁচে উঠেছেন মিনার। মাসখানেক আগে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরেছেন। এখনো চিকিৎসকদের কাছে যেতে হয়। তবে বিসিএসের ভাইভা দেওয়ার স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে মিনারের। গত মঙ্গলবার বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার ফল দিয়েছে। মিনার তাতে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তবে দুশ্চিন্তায় আছেন তাঁর পঙ্গুত্ব নিয়ে।
মিনার প্রথম আলোকে বলেন, ‘যখন আমি বিসিএস পরীক্ষা দিই, তখন তো সুস্থ ছিলাম। আমার প্রথম পছন্দ ছিল পুলিশ। কিন্তু এখন তো আমার ডান হাত নেই। দুই পায়ের অবস্থাও খারাপ। চিকিৎসকেরা বলছেন, অস্ত্রোপচার লাগবে। তবে এর জন্য আরও চার মাস অপেক্ষা করতে হবে। এখন থেরাপি দেওয়া হচ্ছে। এমন শারীরিক অবস্থায় আমাকে কি পুলিশে নেবে কিংবা প্রশাসনে? বিসিএসে তো এখন প্রতিবন্ধী কোটা আছে। কিন্তু আমি তো প্রতিবন্ধী হিসেবে আবেদন করিনি। দুর্ঘটনা আমাকে হঠাৎ প্রতিবন্ধী বানিয়েছে। আমি চাই পিএসসি আমার বিষয়টা মানবিকভাবে বিবেচনা করুক।’
মিনারের চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিওথেরাপিস্ট খায়রুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি এক মাস ধরে ওকে থেরাপি দিচ্ছি। ওর তো ডান হাত নেই। ডান পায়ে অস্ত্রোপচার করতে হবে। বাঁ পা ঠিক করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু এটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। তবে মেধাবী এই ছেলেটির জীবন যেন থেমে না যায়, সে জন্য আমাদের সবার উচিত ওর পাশে থাকা।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আনিসুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মিনার আমাদের ছাত্র ছিল। ওর মতো ছেলে হয় না। আমরা চাই মানবিক দিক বিবেচনা করে পিএসসি, রাষ্ট্র সবাই মিনারের পাশে থাকবে।’

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন