বিশ্বব্যাপী তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ২০০৩ সালের মে মাসে ৫৬তম বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) চুক্তি অনুমোদিত হয়। বাংলাদেশ এ চুক্তির প্রথম স্বাক্ষরকারী দেশ এবং ২০০৪ সালে চুক্তিকে অনুসমর্থন করে। এরই ধারাবাহিকতায় সরকার এফসিটিসির আলোকে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫ (সংশোধিত ২০১৩) ও ২০১৫ সালে এ–সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়ন করে ।

২০১৬ ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাউথ এশিয়ান স্পিকার্স সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করার ঘোষণা দেন। দেশের ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ও জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার স্বাস্থ্য–সংক্রান্ত লক্ষ্য-৩ অর্জনে আন্তর্জাতিক চুক্তি এফসিটিসির বাস্তবায়ন ও তামাকজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় পদক্ষেপ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে ।

এ অবস্থায় বিদ্যমান আইন সংশোধনের প্রস্তাব এসেছে। সংশোধনের জন্য সক্রিয় ব্যক্তি ও সংগঠনগুলো বলছে, তামাকের কারণে পঙ্গুত্ববরণ করে আরও কয়েক লাখ মানুষ। দেশে এখন প্রায় চার কোটি প্রাপ্তবয়স্ক লোক তামাক ব্যবহার করেন, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ জন্য তামাকমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। সংশোধনীর মাধ্যমে বর্তমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনটি যুগোপযোগী করতে হবে। তাই এটি যাতে সংশোধন হয়ে দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে সবাই।

বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে যেসব সংশোধনী আনা উচিত

তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ছয়টি প্রস্তাবকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রস্তাবগুলো হলো সব জনসমাগমস্থল, কর্মক্ষেত্র ও গণপরিবহনে ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান বিলুপ্ত করা, বিক্রয়স্থলে তামাকজাত দ্রব্য প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা, তামাকজাত পণ্যের প্রতিষ্ঠানগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা, বিড়ি-সিগারেটের খুচরা শলাকা ও প্যাকেটহীন জর্দা-গুল বিক্রয় নিষিদ্ধ করা, ই-সিগারেট, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্টসহ (এইচটিপি) সব ইমার্জিং টোব্যাকো প্রোডাক্ট আমদানি ও বিক্রয় নিষিদ্ধ করা এবং তামাকপণ্য মোড়কজাতকরণে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তার আকার বৃদ্ধি করা।

default-image

শতভাগ ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতকরণ

বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বাংলাদেশে ৩৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করেন। ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারকারী ২ কোটি ২০ লাখ এবং ধূমপায়ী ১ কোটি ৯২ লাখ। বাংলাদেশে ১৩-১৫ বছর বয়সী ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার ৯.২ শতাংশ, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তামাক ব্যবহারজনিত রোগে দেশে প্রতিবছর ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষ অকালে মৃত্যুবরণ করে। ২০১৯ সালে প্রকাশিত ‘ইকোনমিক কস্ট অব টোব্যাকো ইউজ ইন বাংলাদেশ: আ হেলথ কস্ট অ্যাপ্রোচ’ শীর্ষক গবেষণা ফলাফলে দেখা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তামাক ব্যবহারের অর্থনৈতিক ক্ষতির (চিকিৎসা ব্যয় ও উৎপাদনশীলতা হারানো) পরিমাণ ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা ।

অধূমপায়ীদের রক্ষায় বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করে জনসমাগমস্থল ও গণপরিবহনে ‘ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান’ বিলুপ্ত করতে হবে । চতুর্দিকে দেয়ালে আবদ্ধ নয়, এমন রেস্তোরাঁসহ সব ধরনের হোটেল, জনসমাগমস্থল, কর্মক্ষেত্র ও একাধিক কামরাবিশিষ্ট যান্ত্রিক পরিবহন ও সব অযান্ত্রিক গণপরিবহনে ধূমপান সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করতে হবে। পাশাপাশি ধূমপানমুক্ত ভবন বলতে সেই ভবনের বারান্দাসহ সব আচ্ছাদিত স্থানকে আইনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

বিক্রয়স্থলে তামাকজাত দ্রব্য প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা

তামাকজাত দ্রব্য বিপণনে কোম্পানিগুলোর আগ্রাসী কৌশল মোকাবিলার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোলের (এফসিটিসি) ধারা ১৩ ও এ–সংক্রান্ত গাইডলাইন অনুযায়ী বিক্রয়কেন্দ্রে তামাকজাত দ্রব্য প্রদর্শন, বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা এবং পৃষ্ঠপোষকতা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে । বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করে বিক্রয়স্থলে তামাকজাত দ্রব্য প্রদর্শন নিষিদ্ধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তামাকজাত দ্রব্যের বিক্রয়স্থলে যেকোনো উপায়ে তামাকজাত দ্রব্য প্রদর্শন ‘তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন প্রচার’ হিসেবে গণ্য করা হবে মর্মে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে ।

তামাক কোম্পানির ‘সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচি’ কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধকরণ

তামাকের নেতিবাচক দিক থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরানোর জন্য তামাক কোম্পানিগুলো নানাবিধ সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রমের ঘোষণা দিয়ে থাকে । করোনা মহামারির শুরুর দিকে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) করোনাভাইরাসের টিকা আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়ে গণমাধ্যমে সেটি ব্যাপকভাবে প্রচার করে। এর আগে ২০১৪ সালের দিকে ইবোলার টিকা তৈরির দাবি করেছিল বিএটি, কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যায়নি।

বিদ্যমান ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫–এ সামগ্রিকভাবে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা নিষিদ্ধ করা হলেও তামাক কোম্পানির সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়নি । ফলে তামাক কোম্পানিগুলো এ কার্যক্রমের অজুহাতে নীতিপ্রণেতাদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সার্বিক তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে। কাজেই তামাক কোম্পানির সিএসআর কার্যক্রম বন্ধ করতে এফসিটিসির আলোকে বিদ্যমান ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ সংশোধন করে তামাক কোম্পানির ‘করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা’ বা সিএসআর কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে ।

বিড়ি-সিগারেটের খুচরা শলাকা এবং খোলা ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্য বিক্রয় নিষিদ্ধকরণ

বিদ্যমান ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ সংশোধন করে বিড়ি-সিগারেটের সিঙ্গেল স্টিক বা খুচরা শলাকা এবং প্যাকেট ব্যতীত বা খোলা ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্য বিক্রয় নিষিদ্ধ করতে হবে। এটি একই সঙ্গে করোনাভাইরাসের মতো যেকোনো ভবিষ্যৎ মহামারিতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করবে।

বিড়ি-সিগারেটের খুচরা শলাকা ও ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্য খোলা অবস্থায় বিক্রয় নিষিদ্ধ করা হলে জনগণের মধ্যে বিশেষ করে কিশোর, তরুণ, নারী ও স্বল্প আয়ের মানুষের মধ্যে এসব পণ্যের সহজলভ্যতা ও ব্যবহার হ্রাস পায়। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, পাকিস্তানসহ বিশ্বের ১১৮টি দেশ সিঙ্গেল সিগারেট স্টিক বা ছোট প্যাকেট বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মহারাষ্ট্র প্রদেশ ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বিড়ি-সিগারেটে খুচরা বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে। এ ছাড়া শ্রীলঙ্কায় সিগারেটের খুচরা শলাকা বিক্রয় নিষিদ্ধ করার উদ্যোগটি প্রক্রিয়াধীন।

সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা

গবেষণায় দেখা গেছে, দৈনিক এক প্যাকেট সিগারেট ব্যবহারকারী একজন ধূমপায়ী সিগারেট কেনা ও ব্যবহার করার সময় দিনে কমপক্ষে ২০ বার, বছরে ৭ হাজার বার সিগারেটের প্যাকেটে ছাপানো ছবি দেখে থাকে। অথচ তামাকজাত পণ্য যখন খুচরা শলাকা বা খোলা হিসেবে বিক্রি হয়, তখন স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা দেখা যায় না। ফলে তামাক নিয়ন্ত্রণে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা তামাকপণ্যের ব্যবহার হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে না। তাই বিদ্যমান আইন সংশোধন করে বিড়ি-সিগারেটের এক স্টিক বা খুচরা শলাকা ও প্যাকেট ব্যতীত বা খোলা ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্য বিক্রয় নিষিদ্ধ করতে হবে। এটি একই সঙ্গে করোনাভাইরাসের মতো যেকোনো ভবিষ্যৎ মহামারিতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করবে।

default-image

ই–সিগারেট নিষিদ্ধ করা

অনেক তরুণের কাছে এখন ইলেকট্রনিক সিগারেট ফ্যাশন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে । সাম্প্রতিক সময়ে এটি বেশ চোখে পড়ছে। অন্য তরুণদেরও এটি আকৃষ্ট করছে। বাংলাদেশে বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনায় ইমার্জিং টোব্যাকো প্রোডাক্ট বা ই-সিগারেটসহ সব ভ্যাপিং ও হিটেড তামাকপণ্যের উৎপাদন, আমদানি, বিক্রয় ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করতে হবে। ই-সিগারেট বিক্রি নিষিদ্ধ করা হলে তরুণ ও কিশোর বয়সীদের ধূমপানে আসক্ত হওয়া থেকে বিরত রাখা যাবে, যা ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ অর্জনে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে তা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ইতিমধ্যে ই-সিগারেট নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ ৩২টি দেশ এসব পণ্য বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছে।

আইন সংশোধনের প্রস্তাবের বর্তমান চিত্র: আইন সংশোধনের সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাইলে জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের সদস্যসচিব ও সংশোধনী আনয়নে গঠিত কমিটির স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও সমন্বয়কারী হোসেন আলী খোন্দকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিভিন্ন সংস্থা ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতামত নিয়ে আমরা আইন সংশোধনের প্রস্তাব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি । এটি এখন মন্ত্রণালয় পর্যালোচনা করে তা সংশোধন করে সরকারের সর্বোচ্চ মহলে পাঠাবে। সেখান থেকে চূড়ান্ত সংশোধনের সিদ্ধান্ত আইন আকারে মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া হবে।’

দ্রুত আইন সংশোধনের তাগিদ দিয়ে তামাক আইন সংশোধনের জন্য সক্রিয় ও তামাকবিরোধী সংগঠন প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের বলেন, ‘তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে বিদ্যমান আইনের সংশোধনের গুরুত্ব অনেক । আমরা যারা তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য কাজ করছি, তারা চাই, এ আইন সংশোধন হোক। আর তামাকমুক্ত বাংলাদেশ অর্জনের চাবিকাঠি হচ্ছে শক্তিশালী তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন। আমরা দেখেছি, ২০১৩ সালে বিদ্যমান তামাক আইন সংশোধন করা হলেও এতে বেশ কিছু ফাঁক রয়ে গেছে, যা তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অন্তরায়। এ অবস্থায় আমরা ছয়টি বিষয়ে সংশোধনের জন্য দাবি জানিয়েছি। এ প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করে বাস্তবায়ন করলে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার পথ সুগম হবে।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন