ত্রিপুরার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য

মনীষা পাল চৌধুরী l ছবি: প্রথম আলো
মনীষা পাল চৌধুরী l ছবি: প্রথম আলো

ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মনীষা পাল চৌধুরী। তিনি একই সঙ্গে বাচিক ও নৃত্যশিল্পী এবং মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন চট্টগ্রামে। ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় ভূবনেশ্বরী টিভি নামের বেসরকারি একটি টেলিভিশন সম্প্রচার চ্যানেলের প্রধান নির্বাহী তিনি। কর্মব্যস্ত সময়ের এক ফাঁকে গত রোববার বিকেলে প্রথম আলো চট্টগ্রাম অফিসে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। আলাপচারিতায় উঠে আসে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক ও শিল্পচর্চার নানা প্রসঙ্গ।

এ দেশের কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সঙ্গে মনীষার রয়েছে নাড়ির টান। বাবার দিকের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন এখানকার বাসিন্দা। আবার তাঁর মায়ের সঙ্গে আত্মীয়তা আছে ত্রিপুরা রাজ পরিবারের। সেদিক থেকে বাঙালি-ত্রিপুরা এই দুই সম্প্রদায়েরই রক্ত বইছে তাঁর শরীরে। আলাপের শুরুতে তাই বাংলাদেশ আর ত্রিপুরা রাজ পরিবারের প্রসঙ্গ আসে।

বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের আমন্ত্রণে মনীষা ১৯৯২ সাল থেকে বাংলাদেশে আসছেন নিয়মিত। ঢাকা-চট্টগ্রামসহ এদেশের নানা জেলায় অনুষ্ঠান করেছেন। এদেশকে কখনোই বিদেশ বলে মনে হয়নি তাঁর। আসলে বাংলাদেশের সঙ্গে ত্রিপুরার বাসিন্দাদের সম্পর্ক অনেকটাই আবেগের বলে মন্তব্য করলেন মনীষা। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ত্রিপুরার প্রায় প্রত্যেক নাগরিক কোনো না কোনোভাবে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। মনীষা বলেন, ‘আমার তখন জন্ম হয়নি। তবে বাবা-কাকাদের কাছে শুনেছি আগরতলার প্রত্যেক বাসিন্দা মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁদের বাড়ির দরজা খুলে দিয়েছিলেন শরণার্থীদের জন্য।’

মনীষা বলেন, ত্রিপুরাবাসী মুক্তিযুদ্ধের কথা ভোলেনি এখনো। সে দেশের বিলোনিয়ার চিত্রামুড়ায় বড় এলাকাজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিপার্ক তৈরি হচ্ছে। অন্তত এই একটা কারণে ত্রিপুরার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। কখনো কেউ তা নষ্ট করতে পারবে না।

ত্রিপুরা রাজ পরিবারের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পর্কের প্রসঙ্গও এল আলাপচারিতায়। মনীষা বললেন, রবীন্দ্রনাথ যেমন এই পরিবারের অনুরাগী ছিলেন তেমনি তাঁরাও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে নিজের বলে ভেবেছিলেন। শচীন দেববর্মণের মতো গুণী শিল্পী বাংলা গানকে অন্য স্তরে নিয়ে গেছেন। কথা প্রসঙ্গে মনীষা বললেন, রাজ পরিবার এবং শহরে বসবাসকারী ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের অনেকেই বাংলায় কথা বলে। তবে পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের ভাষা ককবরক। তিনি নিজেও ককবরক ভাষা শিখেছেন বলে জানালেন।

মনীষা বললেন, ত্রিপুরা ছাড়াও ত্রিপুরা রাজ্যে ১৯টি নৃগোষ্ঠীর বসবাস। এদের কারণে ত্রিপুরায় একটা বহুজাতিক সাংস্কৃতিক আবহও রয়েছে। তবে একটা বিষয় উল্লেখ না করলে নয়, কোলকাতার চেয়ে আগরতলার পথে-ঘাটে বাংলা বেশি শোনা যায়।

ত্রিপুরা রাজ্যে সাতটির মতো বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আছে। তার মধ্যে ভূবনেশ্বরী টিভি অন্যতম। সেই চ্যানেলের প্রধান নির্বাহী এবং কর্ণধার তিনি। প্রতি ঘণ্টায় সংবাদ প্রচারের পাশাপাশি সেখানে শিল্প-সাহিত্যবিষয়ক নানা অনুষ্ঠানও প্রচার হয়। মনীষা বলেন, এ দেশের অনেক শিল্পী, লেখক ও সাংবাদিক এখন আগরতলায় পরিচিতি পেয়েছেন ভূবনেশ্বরীর কল্যাণে।

বাংলাদেশের ঢাকা, রংপুর, সিলেটসহ বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠান করেছেন মনীষা। তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছে চট্টগ্রাম। এই শহরটা যেন আগরতলার বোন। তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামে এলেই আমার ভালো লাগে। শহরটা খুব আপন। নিজের শহরের সঙ্গে অনেক মিল। তবে শিল্প-সংস্কৃতির চর্চায় চট্টগ্রাম অনেক এগিয়ে।