বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেঝেতে মারজিয়া (১৩) যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল। পাশে কোনো স্বজন নেই। রেড ক্রিসেন্টের একজন স্বেচ্ছাসেবী স্যালাইন লাগিয়ে দিচ্ছিলেন। মারজিয়া মা আর বোনকে খুঁজছিল। কিন্তু কেউ কোনো জবাব দিতে পারছিল না। তাই ফ্যালফ্যাল করে অসহায় মারজিয়ার চোখ গড়িয়ে নীরবে জল ঝরছিল। মারজিয়ার মা মারুফা আক্তারের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে, বড় বোন মাহিদা নিখোঁজ।
মারজিয়া ঢাকার একটি মাদ্রাসার ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। তার বড় বোন মাহিদাও একই মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। তাদের মা মারুফা ওই মাদ্রাসায় তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। মায়ের সঙ্গে দুই বোন গ্রামের বাড়ি বরগুনার পাথরঘাটায় বেড়াতে যাচ্ছিল। ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে ঢাকা থেকে বরগুনাগামী অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আরও অনেকের মতো গুরুতর জখম হয়েছে তারা। গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে ওই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। মারজিয়ার বাবা মোস্তফা মিয়া ঢাকায় আছেন। তিনি দুপুর পর্যন্ত বরিশালে পৌঁছাননি।
মারজিয়ার মতো অনেকের পরিবারের সদস্যরা নিখোঁজ। তাঁদের পরিণতি কী হয়েছে, তা এখনো কেউ নিশ্চিত নয়। এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩৬ জনের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও যৌথবাহিনী।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানায়, লঞ্চটিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দগ্ধ হওয়া শিশু তাইফাকে (৮) ঢাকা নেওয়ার পথে বরিশালের কাশীপুর এলাকায় পৌঁছালে বেলা দুইটার দিকে তার মৃত্যু হয়। তাইফা বরগুনা জেলার কেওড়াবুনিয়া এলাকার বশির উদ্দীনের মেয়ে।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু সার্জারি ওয়ার্ডে আটজনের মধ্যে বেলা দুইটা পর্যন্ত তিন শিশুকে ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে মহিলা সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা ২০ জনের মধ্যে ৬ জনকে এখন পর্যন্ত ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তাঁরা হলেন খাদিজা, হনুফা, স্বপ্না, সাদিয়া, জেসমিন ও মনিকা। পাশাপাশি ওই ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা মারুফা ও লামিয়াকে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মহিলা সার্জারি ওয়ার্ডের ইনচার্জ রওশন আরা।
এ ছাড়া হাসপাতালের পঞ্চম তলায় পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ডে থাকা সাতজনকে ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে।
বার্ন ইউনিট বন্ধ
অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক-সেবিকারা। একের পর এক দগ্ধ রোগী ভর্তি হওয়ায় চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে একজন চিকিৎসক ছিলেন। ২০২০ সালের ২৮ এপ্রিল ভাড়া বাসা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ মৃত্যুর রহস্য এখনো উদ্ঘাটিত হয়নি। এরপর এক বছর আট মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো চিকিৎসক দেওয়া হয়নি এ ইউনিটে। ফলে চিকিৎসক শূন্যতায় হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগ বন্ধ রয়েছে। এ কারণে দগ্ধ রোগীদের হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের তিন ইউনিটে ভর্তি করা হচ্ছে। ওই তিন ইউনিটে আগে থেকেই রোগী ছিল। এতে শয্যার সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক দগ্ধ রোগীকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক সাইফুল ইসলাম জানান, চিকিৎসকের অভাবে হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগটি বন্ধ রয়েছে। হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের ৩ ওয়ার্ডে ৫০ জন চিকিৎসক ও ইন্টার্ন চিকিৎসক দগ্ধ রোগীদের সেবা দিচ্ছেন, তবে সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।