বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

বাবার কাছে আরেক দিন জানতে পারে কচুবাগানে এক নেতিয়ে পড়া কচুগাছ দেখে বাবা কীভাবে এক হত্যা রহস্য উদ্‌ঘাটন করেছিলেন। বাবার পেশাগত অভিজ্ঞতা ক্রাইম ফিকশন ও থ্রিলার লেখায় আগ্রহী করে তোলে রোমেনা খাতুন খুকিকে। পরিণত বয়সে যিনি দস্যু বনহুর লেখক রোমেনা আফাজ নামে খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন। রোমেনা আফাজ মানেই অনেকের কাছে স্মৃতিরা হুড়মুড় করে সামনে চলে আসা। অলস সময়ে বা পাঠ্যবইয়ের আড়ালে নিয়ে ‘আউট বই’ পড়ায় মজে যাওয়া এবং সেই দিনগুলোর কথা ভেবে সুখ-বেদনামিশ্রিত অনুভূতিতে মন কেমন করে ওঠা।

ষাট, সত্তর ও আশির দশকের জনপ্রিয় এই লেখকের নানান স্মৃতি উঠে এসেছে তাঁর দুই ছেলে কানাডাপ্রবাসী মাহফুজুর রহমান এবং বগুড়ায় বসবাসকারী ছেলে মন্তেজুর রহমানের সঙ্গে প্রথম আলোর আলাপচারিতায়G

৯ বছর বয়সে হাতেখড়ি

রোমেনা আফাজ ১৯২৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর বগুড়া জেলার শেরপুরে জন্ম নেন। মায়ের নাম আছিয়া খাতুন। তিন ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। ৯ বছর বয়সে প্রথম লেখা ‘বাংলার চাষী’ নামক ছড়া প্রকাশ হয় কলকাতার মোহাম্মদী পত্রিকায়। ওই সময় তাঁর বাবা কলকাতার একটি থানার পুলিশ পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১০-১১ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে চলে আসেন শেরপুরে। ১৩ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় বগুড়া জেলার সদর থানার ফুলকোট গ্রামের চিকিৎসক মো. আফাজ উল্লাহ সরকারের সঙ্গে। ষাটের দশকে তিনি বসবাস শুরু করেন বগুড়া জেলার জলেশ্বরীতলায়। ২০০৩ সালের ১২ জুন (৭৭ বছর) জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ওই বাড়িতেই বসবাস করতেন।

সাত ছেলে দুই মেয়ের মধ্যে ষষ্ঠ মাহফুজুর রহমান কানাডা থেকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিয়ের পর আম্মা পুরোদমে লেখালেখি শুরু করেন। আব্বা সব সময় আম্মার লেখালেখির ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন।’ তিনি জানান, মেজ ভাই মোখলেছুর রহমান ও তিনি কানাডায় থাকেন। বড় ভাই মতিউর রহমান অধ্যাপনা করতেন, এখন অবসরে। সেজ ভাই মাহবুবুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। চতুর্থ ভাই মাজেদুর রহমান চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। বোন হেলেনা বেগম ১৯৭৬ সালে তরুণ বয়সে মারা যান। এরপরের ভাই মোস্তাফিজুর রহমান সোনালী ব্যাংকে চাকরি করতেন, কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। ছোট ভাই মন্তেজুর রহমান দেশে ব্যবসা করেন। সবার ছোট বোন সেলিনা বেগম দেশে চাকরি করেন, মাঝেমধ্যে লেখালেখি করেন। মা রোমেনা আফাজের সঙ্গে ‘মা ও মেয়ে’ নামে তাঁর একটি যৌথ ছোটগল্পের বই প্রকাশ হয়।

‘দস্যু বনহুর’ জনপ্রিয়তার তুঙ্গে নিয়ে যায়

‘দস্যু বনহুরের ভয়ে দেশবাসী প্রকম্পমান। পথে-ঘাটে-মাঠে শুধু ওই এক কথা, দস্যু বনহুর-দস্যু বনহুর। কখন যে কোথায় কার ওপর হানা দিয়ে বসবে কে জানে! ধনীরা তো সব সময় আশঙ্কা নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। তাদের ভয়ই বেশি।’ ‘দস্যু বনহুর’ বইটিতে এভাবেই দস্যু বনহুরের বর্ণনা দিয়েছেন লেখক। সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে দস্যু বনহুরকে, যিনি চোরাকারবারিদের অর্থ কেড়ে দরিদ্রদের দান করতেন।

১৯৬৫ সালে প্রথম প্রকাশ হয় ‘দস্যু বনহুর’। এই সিরিজ তাঁকে দারুণ জনপ্রিয়তা এনে দেয়। তাঁর পরিচিতি গড়ে ওঠে ‘দস্যু বনহুরখ্যাত রোমেনা আফাজ’ নামে। তবে তাঁর প্রথম বই হচ্ছে ‘রক্তে আঁকা ম্যাপ’। বগুড়ার ‘সাহিত্য কুঠির’নামের একটি প্রকাশনা সংস্থা ১৯৫৯ সালে বইটি প্রকাশ করে। সেটি ছিল দস্যুরানি সিরিজের প্রথম বই।

ছেলে মন্তেজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, রোমেনা আফাজের সিরিজ, উপন্যাস, ছোটগল্প, কাব্যগ্রন্থসহ বিভিন্ন ধরনের ২৫০টি বই প্রকাশ হয়েছে। এর মধ্যে ১৩৮টি দস্যু বনহুর সিরিজ এবং ১২টি দস্যুরানি সিরিজ। তিনি বলেন, ‘দেশে বইয়ের পাঠক সৃষ্টিতে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। মায়ের দস্যু বনহুর বই মানে ওই সময়ের অনেক পাঠকের কাছে স্মৃতির দুয়ার খুলে যাওয়া। মায়ের সঙ্গে কোথাও গেলে সেই অনুভূতির প্রকাশ দেখেছি। তাঁর সঙ্গে যেখানে যেতাম, তাঁকে ঘিরে ধরতেন লোকজন। দস্যু বনহুর পড়ে প্রতিবেশীরা বাড়ি এসে প্রশংসা করে যেতেন। নারী হয়ে রহস্য, থ্রিলার নিয়ে লেখা তাঁদের কাছে বিস্ময়ের বিষয় ছিল।’

মন্তেজুর রহমান বলেন, রোমেনা আফাজের লেখার কোনো সময় ছিল না। কাজের অবসরে নয়, তিনি কাজের ফাঁকে ফাঁকে লিখতেন। বললেন, ‘কখনো লিখতে বসে উঠে গিয়ে ভাত চড়াতেন। কত দিন শিশু আমি খাওয়ার বায়না ধরায় মা লেখা ছেড়ে উঠে খেতে দিয়েছেন! কখনো কোনো কিছুতে বিরক্ত হতেন না।’

দস্যু বনহুর ও ছয় সিনেমা

রোমেনা আফাজের ছয়টি বই থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে। ১৯৬৬ সালে ‘কাগজের নৌকা’ বইটির প্রথম চলচ্চিত্রায়ণ হয়। সেটি পরিচালনা করেন সুভাষ দত্ত। এরপর ১৯৭০ সালে ‘মোমের আলো’, ১৯৭৪ সালে ‘মায়ার সংসার’, ১৯৭৫ সালে ‘প্রিয়ার কণ্ঠস্বর’ বইটি থেকে ‘মধুমিতা’ এবং ১৯৯৪ সালে ‘মাটির মানুষ’, এই চারটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন পরিচালক মোস্তফা মেহমুদ। সবশেষ নব্বই দশকে ‘দস্যু বনহুর’ নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন মাসুদ পারভেজ ওরফে সোহেল রানা।

default-image

ছেলে মন্তেজুর রহমান বলেন, ‘প্রথম সিনেমাটি হওয়ার পর পুরো এলাকায় সাড়া পড়ে যায়। বাড়িটিকেই লোকজন বলা শুরু করে কাগজের নৌকা বাড়ি। মধুমিতা নির্মাণ হলে লোকজন আমাদের বাড়িকে মধুমিতার বাড়ি বলে ডাকা শুরু করে।’ তিনি বলেন, রোমেনা আফাজ ভক্তদের খুব মূল্যায়ন করতেন। আলমারি ভর্তি এখনো ভক্তদের চিঠি। তিনি বইয়ের পেছনে কোনো কোনো ভক্তের চিঠির উত্তর দিতেন, কারও কারও নাম উল্লেখ করতেন। ১৯৭৬ সালে মেয়ের মৃত্যুর শোকে একবার লেখালেখিতে ভাটা পড়ে। দ্বিতীয়বার তাঁর লেখায় ভাটা পড়ে ১৯৯৪ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর।
‘প্রদীপ যদি নিভে যায়- কি হবে তাতে তৈল ভরি হায়’

জীবদ্দশায় ব্যক্তিগত পাঠাগার ছিল রোমেনা আফাজের সবচেয়ে প্রিয়। চারতলা বাড়ির চারতলায় তাঁর পাঠাগার ছিল। বইয়ের আলমারির চাবি তিনি পরে ছোট ছেলে মন্তেজুরকে হস্তান্তর করেন। রোমেনা আফাজের মৃত্যুর পর ওই পাঠাগারটিকে ‘রোমেনা আফাজ স্মৃতিঘর’ গড়ে তোলেন তিনি। রোমেনা আফাজের স্মৃতি সংরক্ষণ করতে গত সপ্তাহে বগুড়া জেলা প্রশাসকের কাছে ‘রোমেনা আফাজ পাঠাগার’ করার জন্য সরকারি স্থান বরাদ্দ চেয়েছেন।

মৃত্যুর ৭ বছর পর ২০১০ সালে রোমেনা আফাজ স্বাধীনতা পুরস্কার পান। এর বাইরে ২৭টি পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন রোমেনা আফাজ।

default-image

মন্তেজুর রহমান বলেন, মরণোত্তর পুরস্কার নিয়ে মায়ের অনেক আক্ষেপ কাজ করত। মায়ের ঘনিষ্ঠ এক খ্যাতনামা ব্যক্তির মৃত্যুর পর নানা আয়োজন দেখে মা আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, ‘জীবনকালে যে পেলো না মালা– চিনিলো না যারে করি অবহেলা। দিলো না যার প্রতিভার দাম- মৃত্যুর পর কি হবে তার এ সুনাম। কি হবে আর তাঁহারে স্বরি- কি হবে স্মৃতিসৌধ গড়ি। প্রদীপ যদি নিভে যায়- কি হবে তাতে তৈল ভরি হায়।’ এই আক্ষেপ রোমেনা আফাজের জন্যও সত্য হয়েছিল। মৃত্যুর পর পেয়েছেন স্বাধীনতা পুরস্কার, বাড়ির সামনের সড়কের নামকরণ হয়েছে তাঁর নামে। পাঠক সৃষ্টির অনুপ্রেরণার গল্পে তাঁর নাম প্রজন্মের পর প্রজন্ম উচ্চারিত হবে এই প্রত্যাশা সন্তানদের।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন