সূত্রটি জানিয়েছে, এর আগে ২০১৫ সালের জুনে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বেতজুরী এলাকায় ডিগনিটি টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড নামের একটি পোশাক কারখানায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতেও প্রায় ১৯ ঘণ্টা লেগেছিল। ইস্পাতের ফ্রেমের ওপর তৈরি ওই কারখানার পুরোটাই ভস্মীভূত হয়ে যায়। তবে ওই ঘটনায় কেউ মারা যাননি। এরপর ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টার রাসায়নিক গুদামে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসতে সময় লাগে প্রায় ৮ ঘণ্টা। ওই ঘটনায় মারা যান প্রায় ৭৮ জন। ২০১৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের টাম্পাকো ফয়েলস কারখানার অগ্নিকাণ্ডের স্থায়িত্ব ছিল প্রায় ৬ ঘণ্টা।

অগ্নিকাণ্ড এত দীর্ঘ সময় ধরে চলার কারণ কী? বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ওই ভবনে এমনিতেই দাহ্য পদার্থ এবং রাসায়নিকের পরিমাণ অনেক বেশি ছিল। ছিল জ্বালানি তেল, রাসায়নিক দ্রব্য, প্লাস্টিকসামগ্রী, ফয়েল পেপার, প্যাকেট তৈরির কাগজসহ নানা ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য ও তরল পদার্থ। এর সবই দাহ্য পদার্থ। এ ধরনের আগুন শুধু পানি ছিটিয়ে নেভানো সম্ভব নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে শুধু পানি ছিটালে আগুন আরও বেড়ে যায়।

বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. মাকসুদ হেলালী এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, আগুন নেভাতে এখানে কেন এত সময় লাগল, তা জানা দরকার। কারণ, কোন স্থানে কী ধরনের দাহ্য বস্তু আছে, তার ওপর নির্ভর করে অগ্নিনির্বাপণ করতে হয়। এ ধরনের কারখানার গুদামে যেসব উপাদান থাকে, তাতে আগুন লাগলে শুধু পানি ছিটিয়ে দ্রুত নেভানো যায় না। এ জন্য ফোম ও আগুন নেভানোর জন্য প্রয়োজনীয় কিছু রাসায়নিক পদার্থ পানির সঙ্গে মিশিয়ে ছিটাতে হয়। সেটি করা হয়েছে কি না, তা–ও দেখা উচিত।

বাংলাদেশ কারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের সূত্র বলছে, কোনো ভবনে রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থ থাকলে তার হিসাব স্থানীয় কারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর কার্যালয়ের কাছে জমা দিতে হয়। কিন্তু হাসেম ফুডের ওই ভবন পরিদর্শনের জন্য কারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর থেকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে অনুমতি না পাওয়ায় সরকারি ওই সংস্থার পরিদর্শকেরা সেখানে গিয়ে কোন তলায় কী আছে, তা পরিদর্শন করতে পারেননি।

কারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের উপমহাপরিদর্শক সৌমেন বড়ুয়া এ ব্যাপারে প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাসেম ফুড ২০০০ সালে আমাদের প্রধান কার্যালয় থেকে লাইসেন্স নেয়। পরবর্তী সময়ে তারা প্রতিবছর লাইসেন্স নবায়ন করেছে। তবে ওই ভবনের কোন তলায় এবং কোথায় কী ধরনের বস্তু আছে, তা দেখার জন্য আমরা সেখানে পরিদর্শনের জন্য আবেদন করেও অনুমোদন পাইনি। তাই আমাদের জানা নেই সেখানে কোথায় কোন ধরনের দাহ্য পদার্থ আছে।’

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বলছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর ভবনসহ বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নিয়মিতভাবে বাড়ছে। অগ্নিকাণ্ডের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে চুলা, বিদ্যুৎ-সংযোগ ও সিগারেটের আগুনকে দায়ী করা হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০১৫ সালে দেশে মোট ১৭ হাজার ৪৮৮টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০২০ সালে তা ২১ হাজার ৭৩টিতে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের জুলাই মাসে মগবাজারে ভবনে বিস্ফোরণ এবং সর্বশেষ রূপগঞ্জে হাসেম ফুডে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটল।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহাম্মেদ খান প্রথম আলোকে বলেন, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা প্রতিবছর কয়েক হাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কাজ করেন। দেশের অনেকগুলো বড় অগ্নিকাণ্ড তাঁরা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছেন। তবে ভবনের ভেতরে দাহ্য পদার্থগুলো সঠিক জায়গায় রাখা জরুরি, যাতে কোথাও অগ্নিকাণ্ড হলে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে না পড়ে। এ জন্য কারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনকে নিয়মিতভাবে কারখানাগুলোর ভেতরের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংযোগের জায়গাগুলো তদারকি করা দরকার। না হলে এ ধরনের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে।

কেন একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে, জানতে চাইলে শ্রম অধিকারবিষয়ক বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) সাবেক নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বাংলাদেশে নিয়মিতভাবে ঘটছে। এর প্রধান কারণ, অগ্নিকাণ্ডের জন্য যিনি সবচেয়ে বেশি দায়ী, তাঁর বিচার হয় না। ওই দায়ী ব্যক্তি হচ্ছেন প্রতিষ্ঠানটির মালিক বা প্রধান নির্বাহী। ফিনিক্স, তাজরীন, রানা প্লাজা থেকে শুরু করে এফ আর টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়ী প্রধান ব্যক্তিদের এখনো বিচার হয়নি। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতির কারণে মালিকেরা অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা উন্নত করেন না।