
বিপদে পড়লে এই পাখিরা কামড় বসাতে মহা ওস্তাদ। মোটা-শক্ত ঠোঁটের আগা তীক্ষ্ণ-ধারালো। পেশাদার জাল-ফাঁদ শিকারিরা এদের জালফাঁদ থেকে ছাড়ানোর সময় সাবধানতা অবলম্বন করেন। বন্দুক শিকারিরাও আহত পাখি ধরতে সতর্ক থাকেন। কামড় বসাতে পারলে ছাড়ানো কষ্ট। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বৃহত্তর খুলনার ফকিরহাট-চিতলমারী-মোল্লাহাট-তেরখাদা-ডুমুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে প্রকাশ্যে বিক্রি হতো। বন্দুক শিকারিরা গুলি করে মারতেন। হাটবাজার থেকে পাখি কিনে ক্রেতার হাতে ধরিয়ে দেওয়ার আগে বিক্রেতারা পাখিটির নাকের ভেতর দিয়ে এই পাখিটিরই ডানার একটি পালক ছিঁড়ে নাকের এপাশ-ওপাশ দিয়ে বের করে ঠোঁটে পালক বেঁধে দিতেন। ক্রেতারা মুরগির মতো পা ধরে উল্টো করে ঝুলিয়ে বাড়িমুখো হতেন। ২০১৭ সালেও এ পাখি বিক্রি হচ্ছে। তবে অতি গোপনে। দেশের হাওরাঞ্চলে ধরা-মারা-বেচাবিক্রি চলে আজও। চাহিদা ভালো। মাংসমূল্যের জন্যই পাখিটি আজ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। অথচ বন্য প্রাণী আইনে দেশের যেকোনো পাখিই ধরা-মারা-বিক্রি ও পোষা দণ্ডনীয় অপরাধ।
দুঃসাহসী-লড়াকু ও বদমেজাজি এই জলাজমির পাখিটির নাম কালিম। ফকিরহাট-বাগেরহাট তথা বৃহত্তর খুলনায় এটি ‘বুরি’ নামে ব্যাপকভাবে পরিচিত। ইংরেজি নাম purple swamphen। বৈজ্ঞানিক নাম porphyrio porphyrio। দৈর্ঘ্য ৪৫ সেন্টিমিটার। ওজন ৬৫০ গ্রাম। মারকুটে এই পাখিরা একনজরে চকচকে নীলচে-বেগুনি। রোমান যোদ্ধাদের মতো কপাল-মাথা জোড়া আলতা রঙের দর্শনীয় বর্ম। লালচে রঙের পা ও পায়ের লম্বাটে
আঙুল। লেজের তলা কার্পাস তুলোর মতো সাদা। চোখের পাশে বৃত্তাকারে সাদাটে ছোপ। বেশ নাদুসনুদুস স্বাস্থ্যবান এই পাখিরা সব সময় যেমন সতর্ক থাকে, তেমনি যেন রেগেও থাকে। প্রজনন মৌসুমে পোষা মোরগের কায়দায় দুটি পুরুষ যখন লড়াই করে, তখন কপালের বর্মে বর্মে শব্দ বাজে। বন্দুকের গুলির ছররায় যদি একখানা পা আহত হয়, তাহলে পা মুখে কামড়ে ধরে উড়ে পালায়।
এদের মূল খাদ্য জলজ উদ্ভিদ-গুল্মের কচি-নরম পাতা-ডগাসহ পদ্মফুলের ভেতরের অংশ, ব্যাঙের বাচ্চা, ছোট মাছ। ৫০ বছর আগেও হেমন্ত-শীতে ঢাকার শহরতলির বিল-ঝিলসহ সারা বাংলাদেশের বিল-হাওরে দেখা মিলত। এখন এরা কোণঠাসা দেশের কয়েকটি হাওরাঞ্চলে। গ্রীষ্ম-শরতে ভাসমান জলজ উদ্ভিদ-গুল্ম-কচুরিপানা ও ঝোপঝাড়ের তলায় ডাল-লতা দিয়ে বাসা বানিয়ে ডিম পাড়ে তিন-সাতটি। ছানা ফোটে ১৮-২৩ দিনে। ছানারা হয় শ্লেটি-কালো। তাতে ধূসরের আভা ছড়ানো। মাথা-কপাল জোড়া শিল্ড থাকে, রং ওই লালই। পা ও পায়ের আঙুলও লাল। মা-বাবা পাখি ছানাদের নিয়ে চরাই করে। মুরগিছানাদের মতো ছানারা মা-বাবার পিঠে চড়ে, তেমনি মায়ের দুই পাখা ও বুকের তলায় বসে অদৃশ্য হয়ে থাকে। কিশোরগঞ্জ ও শেরপুর-জামালপুরে পোষা পাখি তথা গৃহপালিত বুরি পাখি দেখা যায়।