জেএসএসের এক কেন্দ্রীয় নেতার দাবি, এখন তাঁদের অন্তত এক হাজার নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা আছে। স্রেফ হয়রানির জন্য শাসক দল প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে এসব মামলা দিচ্ছে। এসব মামলা-হয়রানির জন্য তাঁদের অন্তত সাড়ে তিন হাজার নেতা-কর্মী এখন আত্মগোপনে। যে কেন্দ্রীয় নেতা এ তথ্য দিয়েছেন, তিনি নিজেও আত্মগোপনে আছেন।

এমনই এক আবহে আজ ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চুক্তির দুই যুগ পালিত হচ্ছে। এ চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর। তখন সরকারে বর্তমানের শাসক দল আওয়ামী লীগই ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে যে আস্থা নিয়ে জেএসএস চুক্তি করেছিল, দুই দলের একাধিক নেতার ভাষ্য, তাতে চিড় ধরেছে।

সন্তু লারমা গতকাল বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, সমতলে যেমন প্রধান বিরোধী দলকে পিষ্ট করা হয়েছে, পাহাড়ে তেমনি জেএসএসকে পিষ্ট করছে এখানকার আওয়ামী লীগ।

শাসক দলের ‘বৈরী আচরণ’ কেবল কে এস মংয়ের মতো কেন্দ্রীয় নেতার ওপর নয়, তা ছড়িয়েছে পাহাড়ের গ্রামগঞ্জেও। রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলার গিলাছড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন জেএসএস নেতা সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যা। চেয়ারম্যান হওয়ার দুই বছর পর ২০১৮ সালে তিনি পদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন বলে জানান পরিষদের সদস্য উদয় তঞ্চঙ্গ্যা। এখন সুশান্তকে এলাকায়ও দেখা যায় না। তাঁর পরিবারের এক সদস্য বলেন, তিনি ভান্তে (বৌদ্ধধর্মীয় গুরু) হয়ে গেছেন। রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছেন।

রাজস্থলীর তিন ইউনিয়নের দুটিতে গত মেয়াদে চেয়ারম্যান হয়েছিলেন জেএসএসের প্রতিনিধিরা। এবার সব কটিই আওয়ামী লীগ পেয়েছে।

জেএসএসের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ৩৫ জন। এর মধ্যে ২৫ জনই এলাকাছাড়া। দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় রাঙামাটির কল্যাণপুরে, জেলা কমিটির কার্যালয় উত্তর কালিন্দীপুরে। দুটো অফিস এখন কমই খোলা দেখা যায়।

জেএসএস-আওয়ামী লীগ দ্বন্দ্বের নেপথ্যে

১৯৯১ ও ১৯৯৬-এর সংসদ নির্বাচনে পাহাড়ের তিনটি আসনই পায় আওয়ামী লীগ। তাদের জয়ে জেএসএসের পরোক্ষ সমর্থন ছিল বলে অনেকে মনে করেন। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে পার্বত্য চুক্তি করে। তবে এর বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধ বাধে। ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি আসন পায় বিএনপি। জেএসএস সেই নির্বাচনে বিএনপিকে সমর্থন দেয় বলে আওয়ামী লীগ মনে করে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় হয়। ২০১৪ সালে জেএসএসের প্রার্থী হিসেবে রাঙামাটি আসনে জয়ী হন ঊষাতন তালুকদার। বিতর্কিত সেই নির্বাচনে জেএসএসের অংশ নেওয়ার শর্তই ছিল অন্তত একটি আসন। ২০১৬ সালে সেই ২০০১ সাল থেকে পড়ে থাকা পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের সংশোধনী গৃহীত হয়। জেএসএসের সঙ্গে শাসক দলের দূরত্বের শুরুটা এর পর থেকেই।

আইনটি নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের পুনর্বাসিত বাঙালিরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কারণ, পার্বত্য চুক্তির আলোকে ভূমি কমিশনের প্রধান কাজ ‘অবৈধ বন্দোবস্ত এবং দখল হওয়া’ জমির মালিকানা নির্ধারণ করা। আর তা হলে পুনর্বাসিত বাঙালিদের ভূমি হারানোর বা পাহাড় থেকে চলে যাওয়ার উপক্রম হবে। কারণ, পাহাড়ের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো জমির বন্দোবস্তি পেতে গেলে সার্কেল প্রধানের (রাজা হিসেবে পরিচিত) অধীনে থাকা হেডম্যানের সম্মতি লাগে। কিন্তু পুনর্বাসিত বাঙালিরা যেসব জমি পেয়েছেন, সেগুলোতে ১৯৮০-এর দশকে সরকারই তাঁদের বসিয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক গৌতম দেওয়ান প্রথম আলোকে বলেন, পাহাড়ি মানুষদের ন্যায্য দাবি আদায়ে সবচেয়ে বড় শক্তি জেএসএস। দলটি যাতে ভূমি অধিকার নিয়ে তৎপর না হতে পারে, সে জন্যই তাদের ওপর যত খড়্গ।

পাহাড়ের রাজনীতির নেতৃস্থানীয়দের ভাষ্য, যে পাহাড়ি ভোট পার্বত্য এলাকায় আওয়ামী লীগের বড় ভরসা ছিল, তা আর তাদের হাতে নেই। বিশেষ করে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির আসন ‍দুটিতে গত দুটি নির্বাচনের ফল হিসাব করলে দেখা যায়, পাহাড়িদের ভোটের ৮৫ শতাংশের বেশি জেএসএস এবং পাহাড়ের আরেক দল ইউপিডিএফে ভাগ হয়ে গেছে। এখানে বাঙালি ভোট একটি নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সে ভোট পেতে পুনর্বাসিত বাঙালিদের চটাতে চায় না আওয়ামী লীগ।

জেএসএসের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার শুরুও কিন্তু ২০১৬ সালের পর থেকেই বেশি। এরপর পাহাড়ে ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক ও মগ বাহিনী নামে দুটি কট্টরপন্থী সংগঠনের জন্ম হয়। মগ বাহিনীর আক্রমণে জেএসএসের বেশ কয়েকজন কর্মী নিহত হয়েছেন। এর সৃষ্টিতে বান্দরবান আওয়ামী লীগের এক বড় নেতার হাত রয়েছে বলে মনে করা হয়।

পাহাড়ের একসময়ে একটি দলই ছিল, জেএসএস। এখন সেখানে চারটি দল। এভাবেও জেএসকে হীনবল করে এর সুযোগ শাসক দল নিচ্ছে বলে মনে করেন গৌতম দেওয়ান।

তবে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়কমন্ত্রী ও বান্দরবানের সাংসদ বীর বাহাদুর উশৈসিং এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। জেএসএস কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও তাঁদের আত্মগোপনে থাকার বিষয়ে বীর বাহাদুর বলেন, ‘জেএসএসের বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয়, তা করে ওই সব ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা। আওয়ামী লীগের কোনো নেতা-কর্মী কি মামলা করেছে? আর জেএসএস নেতারা কেন আত্মগোপনে আছেন, এর জবাব ওই দলটির নেতারাই দিতে পারবেন।’

চুক্তির অচলাবস্থা

পার্বত্য চুক্তিতে ৭২টি ধারা আছে। সরকারের দাবি, এর মধ্যে ৪৮টি পূর্ণ, ২৫টি আংশিক এবং ৯টি বাস্তবায়নের পথে আছে। কিন্তু জেএসএস দাবি করে, মাত্র ২৫টি ধারা পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে। ১৮টি আংশিক এবং ২৯টি একেবারেই বাস্তবায়িত হয়নি।

পার্বত্য সমস্যার মূলে যে ভূমি সমস্যা, তার সমাধানে গঠিত ভূমি কমিশন অচল হয়ে আছে। মন্ত্রী বীর বাহাদুরও তা স্বীকার করেন।

পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে ‘চুক্তি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ কমিটি’ আছে। কমিটির সর্বশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৯ সালের ২০ অক্টোবর। এর প্রধান সাংসদ আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘চুক্তির বর্তমান অবস্থা নিয়ে কিছু বলব না। কিছু অর্জন হয়েছে, তবে সব তথ্য আমার হাতে নেই।’

পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আলোচনার একেবারে শুরুর দিক থেকে ছিলেন সাংসদ রাশেদ খান মেনন। তিনি বলেন, ‘জেএসএস ও আওয়ামী লীগের বিরোধ চুক্তির মূল চেতনাকেই নষ্ট করে দিচ্ছে। চুক্তির সঠিক বাস্তবায়নে দুই পক্ষকেই ছাড় দিতে হবে।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন