জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, করোনা মহামারি মোকাবিলায় স্থায়ী সমাধান এনে দিতে পারে টিকা। প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিশ্বের বেশ কিছু দেশে ব্যাপকভাবে টিকাদান শুরু হয়েছে। আজ বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে টিকাদান শুরু হচ্ছে। তবে জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, করোনা থেকে দূরে থাকতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে, মাস্ক পরতে হবে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে।

এর আগে গত ২৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চ্যুয়ালি রাজধানীর কুর্মিটোলা হাসপাতালে টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। ওই দিন ২১ জনকে করোনার টিকা দেওয়া হয়। এর পরদিন রাজধানীর ৫টি হাসপাতালে ৫৪৬ জনকে টিকা দেওয়া হয়। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলা হয়, টিকা নেওয়া ৫৬৭ জনই সুস্থ আছেন। কারও বড় ধরনের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।

default-image

প্রস্তুতি ‘এ’ মানের

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা রাজধানীর টিকাদানকেন্দ্রগুলোর প্রস্তুতি দেখে এসে বিকেলে অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। প্রস্তুতির বিষয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, প্রস্তুতি ‘এ’ মানের।

পরামর্শ
* ১৮ বছরের কম বয়সী, গর্ভবতী নারী ও স্তন্যদানকারী মা টিকা নিতে পারবেন না।
* এখনই জ্বরে ভুগছেন, তিনি টিকা নেওয়া থেকে বিরত থাকবেন।
* করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন কিন্তু সুস্থ হওয়ার পর চার সপ্তাহ পার হয়নি, এমন ক্ষেত্রে টিকা নেওয়া যাবে না।
* ওষুধে অ্যালার্জি আছে এমন ক্ষেত্রে টিকা না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা সম্পর্কে জানতে চাইলে রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক ও অধিদপ্তরের মিডিয়া সেলের মুখপাত্র অধ্যাপক মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, রোববার সারা দেশে ২ হাজার ৪০০টি দল টিকা দেবে। প্রতিটি দলের ১৫০ জনকে টিকা দেওয়ার প্রস্তুতি আছে। সেই হিসাবে ৩ লাখ ৬০ হাজার মানুষকে টিকা দেওয়ার প্রস্তুতি আছে।
লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে কি না, জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ‘এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব না।’ নিবন্ধনকারী ব্যক্তি কোন টিকাকেন্দ্রে কবে টিকা নিতে পারবেন, তা মুঠোফোনে খুদে বার্তায় জানিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু নিবন্ধনকারীরা খুদে বার্তা পাচ্ছেন না। খুদে বার্তা না পেলে কী করে একজন টিকা নেবেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘খুদে বার্তা পাওয়ার পর অন্য দিন গেলেও তাঁকে টিকা দেওয়া হবে।’

আজ টিকাদান শুরু হয়ে তা কত দিন চলতে থাকবে, তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না সরকারি কর্মকর্তারা। গত মাসে সরকারি কর্মকর্তারা বলেছিলেন, প্রতি মাসে দুই সপ্তাহ ধরে টিকা দেওয়া হবে, সরকারি ছুটির দিন ছাড়া। গতকাল মহাপরিচালক বলেছেন, ‘আমরা প্রতিনিয়ত অবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। আমরা টিকা দিতে থাকব।’

টিকাকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে তাৎক্ষণিক নিবন্ধন করার ব্যাপারে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলেন, টিকাকেন্দ্রে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর দিয়ে নিবন্ধন করা যাবে। নিবন্ধনের দিনই টিকা দেওয়া হবে না। কোন দিন টিকা দেওয়া হবে, তা-ও জানিয়ে দেওয়া হবে।

অ্যাপের পরিকল্পনা ছিল অবাস্তব, এটা প্রমাণিত হয়েছে। সরকারের উচিত পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা
বে-নজির আহমেদ, জনস্বাস্থ্যবিদ

ডোজ বিতর্ক

দেশে যখন ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা আসার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছিল, তখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বলা হয়েছিল, প্রথম ডোজের চার সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হবে।

default-image

এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা। তাঁরা বলেছিলেন, অক্সফোর্ডের টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের পার্থক্য ৪ থেকে ১২ সপ্তাহ হতে পারে। প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের সময়ের পার্থক্য বেশি হলে সুফল বেশি পাওয়া যায়। এরপর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২ ডোজের পার্থক্য ৮ সপ্তাহ করে। গণমাধ্যম সেই তথ্য প্রচারও করে।

তিন দিন আগে থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলা শুরু করেছে, দুই ডোজের পার্থক্য হবে চার সপ্তাহ। সাংবাদিকেরা জানতে চান এটা কি কারিগরি কমিটির পরামর্শ, নাকি এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত? এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা বলেন, টিকা কর্মসূচির সুবিধার্থে কারিগরি কমিটির পরামর্শক্রমে এটা করা হয়েছে।

কে কোথায় টিকা নেবেন

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের আজ সকালে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে টিকা নেওয়ার কথা আছে।

default-image

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকসহ একাধিক প্রতিমন্ত্রীর টিকা নেওয়ার কথা আছে শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। অন্যদিকে একাধিক জ্যেষ্ঠ সচিবসহ বেশ কয়েকজন রাজনীতিবিদও টিকা নিতে পারেন।

প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, অ্যাপের পরিকল্পনা ছিল অবাস্তব, এটা প্রমাণিত হয়েছে। সরকারের উচিত পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা। দ্বিতীয়ত, মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো দরকার। তৃতীয়ত, টিকাকেন্দ্রগুলো মানুষের বাড়ির কাছে করার উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন