দেশের প্রথম ছাপাখানায় একদিন

বিজ্ঞাপন
default-image

‘হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হলো পার করো আমারে।/ তুমি পাড়ের কর্তা জেনে বার্ত্তা তাই ডাকি তোমারে।/ আমি আগে এসে ঘাটে রইলাম বসে।/ যারা পরে এল আগে গেল আমি রইলাম পরে...।’

এ গানটি কাঙ্গাল হরিনাথের। এটি জনপ্রিয় একটি গান। কুষ্টিয়ার কুন্ডুপাড়ায় জন্ম। এ রকম বহু গানের স্রষ্টা, কবি, সাংবাদিক ও সমাজ সংস্কারকের বাস্তুভিটায় গিয়ে সাক্ষ্য হতে পারি আমরা। ভ্রমণ ও ইতিহাসপ্রিয় মানুষ রোমাঞ্চিত হবেন নিশ্চয়।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী বলা হয় কুষ্টিয়াকে। ঐতিহাসিক এক উপজেলা কুমারখালী। এটি তাঁতশিল্পের জন্য বিখ্যাত। আছে রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি; শিলাইদহে। সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তুভিটা, লালনের আখড়া। আছে কাঙাল হরিনাথের বাড়ি ও মিউজিয়াম। সেখানে আছে ঐতিহাসিক কিছু সাক্ষী। তাই বলা চলে যেকোনো একটা স্থানে এলেই পাশাপাশি এসব দর্শনীয় স্থানের দেখা মিলবে। কুষ্টিয়া শহর থেকে কয়েক কিলোমিটারের মধ্যেই পড়বে। সবগুলোই একই দিকে, একই রাস্তায়। মেঠোপথ মাড়িয়ে যেতে হবে।
স্মৃতি জাদুঘরে কাঙ্গালের স্বহস্তে লেখা কবিতা, আছে ‘এমএন প্রেস’র ঐতিহাসিক ভবন। কুষ্টিয়া থেকে কুমারখালীর কাছেই কাঙ্গাল হরিনাথ সড়ক দিয়ে কিছুদূরে মিউজিয়াম ও বাড়ি। আধা কিমির মধ্যে এ দুটি স্পট। লালনের সঙ্গে সখ্য ছিল কাঙ্গাল হরিনাথের। পুরো নাম কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার। তাকে বাংলাদেশের সংবাদপত্র প্রকাশ ও সাংবাদিকতার অগ্রদূত বলা হয়। ১৮৬৩ সঙ্গে ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ নামে পত্রিকা প্রকাশ করেন। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লিখতেন তিনি এ পত্রিকার মাধ্যমে। সে সময়কার প্রেসটি এখনো আছে এখানে। ‘এম এন প্রেস’ নামে পরিচিত ছিল। সে সময়কার অক্ষরগুলোও আপনি দেখতে পাবেন এখানে। ঐতিহাসিক ছাপার যন্ত্র এমএন প্রেসের মডেল, কিছু যন্ত্রাংশ, বাংলা টাইপ অক্ষর, ছবি ও কিছু পাণ্ডুলিপিসহ বেশকিছু কালের সাক্ষী জাদুঘরে স্থান পেয়েছে। কিছু আছে প্রেসের ঘরেও।

default-image

চাকরির সুবাদে বেশ কয়েকবার গিয়েছি হরিনাথের স্মৃতিবিজড়িত কুণ্ডুপাড়ায়। আধা কিলোমিটারের মধ্যেই রয়েছে তার বাস্তুভিটা ও নতুনভাবে নির্মিত স্মৃতি কমপ্লেক্স বা মিউজিয়াম। কুষ্টিয়া থেকে এখানকার দূরত্ব ১০ থেকে ১২ কিমি।
কুমারখালী শহরের প্রায় কাছেই কুণ্ডুপাড়া। বাংলা সংবাদপত্রের ইতিহাস লিখতে গেলে কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের নাম সবার আগে চলে আসে। তাঁর স্বপ্নের সব নাড়ি কুমারখালীর কুণ্ডুপাড়ার মাটিতে পোঁতা। এত দিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে চরম অনাদর আর অবহেলায় পড়ে ছিল সাংবাদিক কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের স্মৃতিগুলো। অবশেষে স্মৃতিগুলো সরকারি উদ্যোগে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মিউজিয়াম, অডিটরিয়াম, লাইব্রেরি নির্মাণ করা হয়েছে। দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে এগুলো।

default-image

মিউজিয়াম সুন্দর, পরিপাটি। স্বল্প পরিসরে এ কমপ্লেক্সের নিচতলায় একটি আধুনিক সেমিনার কক্ষ। পাশের লাইব্রেরিতে আছে বইয়ের সমাহার। দৃষ্টিনন্দন গাছগাছালিতে ভরপুর পুরো কমপ্লেক্স। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলে দেখা মিলবে কাঙ্গাল হরিনাথের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন জিনিসপত্র, রেপ্লিকা। প্রেসের বিভিন্ন রেপ্লিকা, অক্ষর, কালির নিদর্শন। নয়রাভিরাম এ স্থানে হরিনাথের গান বাজছে, প্রামাণ্যচিত্রও প্রদর্শিত হচ্ছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন জাদুঘরটি এখানকার তত্ত্বাবধায়ক কর্মকর্তা এহসানুল হক ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সবকিছু দেখালেন। অন্য কর্মকর্তারাও যথেষ্ট আন্তরিক। এখান থেকেই কাঙ্গাল হরিনাথের ওপর কয়েকটি বই ও পুস্তিকা সংগ্রহ করলাম। তবে মূল প্রেসটি এখানে না থাকায় অতৃপ্তি থেকে গেল।
জাদুঘরটির নাম কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর। কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত জাদুঘরটি নান্দনিক। সবকিছুই ঊনবিংশ শতকের নির্ভীক সাংবাদিক সংবাদপত্র গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকার সম্পাদক কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারকে ঘিরে। তাঁর স্মৃতিকেই নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে নির্মাণ করা হয়েছে জাদুঘর। ২০ জুলাই ছিল কাঙ্গাল হরিনাথের জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করা হয়েছে। করোনার কারণে এবার সীমিত পরিসরে আলোচনা অনুষ্ঠান হয়েছে।
দেখলাম, ঐতিহাসিক ছাপার যন্ত্র এম এন প্রেসের মডেল, কিছু যন্ত্রাংশ, বাংলা টাইপ অক্ষর, ছবি ও কিছু পাণ্ডুলিপি কালের সাক্ষী হয়ে স্মৃতি জাদুঘরে আছে।
সাংবাদিক কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘরের দুইতলা ভবনে ছোট-বড় ১৫টি কক্ষ। সামনে রয়েছে শানবাঁধানো মুক্তমঞ্চ, সেখানে কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের ভাস্কর্য শোভা বৃদ্ধি করেছে। মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের সাহায্যে কাঙাল হরিনাথ মজুমদারকে নিয়ে ভিডিও প্রদর্শনেরও ব্যবস্থা জানাবে অনেক কিছুই।
দর্শনীয় নির্মাণশৈলীর দুইতলা ভবনে কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘরের গ্যালারিতে ১৬৬টি নিদর্শন রয়েছে। লাইব্রেরিতে বই প্রায় পাঁচ শ। শতাধিক আসনসংখ্যার আধুনিক একটি মিলনায়তন আছে।

মিউজিয়ামের সময়সূচি
বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক ছুটি। শুক্রবার বেলা ৩টা ৩০ মিনিট থেকে শুরু। অন্যদিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত থাকে মিউজিয়াম।

প্রবেশ ফি
সাংবাদিক কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘরে প্রবেশে টিকিট কাটা লাগে। দেশি ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রবেশ ফি ১০ টাকা, শিক্ষার্থী ও ৫ বছরের নিচে জনপ্রতি ৫ টাকা। সার্কভুক্ত বিদেশিদের জন্য জনপ্রতি ১০০ টাকা ও অন্য বিদেশিদের জন্য জনপ্রতি ৫০০ টাকা প্রবেশ ফি লাগবে।
এখান থেকে কাঙাল হরিনাথের পঞ্চম বংশধর দেবাসীশকে নিয়ে আধা কিমি দূরের বাস্তুভিটার দিকে রওনা দিলাম। দেশের প্রথম প্রেসে যাচ্ছি! যেখান থেকে মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ–সিন্ধু’ ছাপা হয়েছিল। লালনের একাধিক গান ছাপা হয়েছিল। বড় কথা দেশের প্রথম প্রেস ও প্রথম পত্রিকা গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা এখান থেকেই প্রকাশিত হয়েছিল। এসব ভাবতে ভাবতেই ১০ মিনিটেই পৌঁছে গেলাম হরিনাথের রোমাঞ্চ–জাগানিয়া বাস্তুভিটায়। গিয়ে অবাক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হতাশই হলাম। বাস্তুভিটা কাঙ্গাল কুটির নামেই পরিচিত। ইটগুলো খসে পড়ছে, দেয়াল ভাঙা। দরজা-জানালা ভেঙে পড়েছে। ধসে গেছে মেঝেও। আগাছা জন্মে টিনের চালাঘরটি রূপ নিয়েছে ঝোপঝাড়ে। আছে মাকড়সার বসতিও। এই হচ্ছে গ্রামীণ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের বাড়ি বর্তমান অবস্থা। কুটিরের ভেতরে এক কোণে রয়েছে সেই ঐতিহাসিক ছাপাযন্ত্রটি। কাঙ্গাল নেই, তার ছাপাযন্ত্রটিও আজ মৃতপ্রায়।

default-image

হরিনাথের পঞ্চম পুরুষ অশোক মজুমদারের স্ত্রী গীতা মজুমদার ও তাঁর দুই ছেলের একজন দেবাশিষ মজুমদারের সঙ্গে কথা হয়। দেবাশিষ মিউজিয়ামে অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করেন। অবহেলায় পড়ে থাকা ঘরের এক কোণের ঐতিহাসিক এম এন প্রেস। বন্ধু মথরা নাথের স্মৃতি ধরে রেখে প্রথম অক্ষর নিয়ে এ প্রেসের নাম রেখেছিলেন হরিনাথ। কাহিনি বলতে বলতে গীতা মজুমদার বলেন, ১৯৯৪ সালে সর্বশেষ এই যন্ত্রে কিছু ছাপা হয়েছিল। এরপর আর কোনো ছাপা হয়নি। এই যন্ত্রে লালন, মীর মশাররফ ও জলধর সেনের হাতের স্পর্শ রয়েছে। প্রেসটি কীভাবে চালানো হতো, তাও দেখালেন গীতা মজুমদার ও তাঁর ছেলে-নাতিন। এটা ইংল্যান্ড থেকে আসার পথে প্রথমে ছিনতাইও হয়ে গিয়েছিল বলে জানান গীতা। ১৮৬৩ সালে ৬০০ টাকায় নিলামের মাধ্যমে প্রেসটি কেনা হয় বলে জানান গীতা মজুমদার।
মুদ্রণযন্ত্রটি জাদুঘরে দেননি বলে জানান গীতা মজুমদার। চিঠি দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আমি লিখিতভাবে জানিয়েছি। আমার কিছু দাবি আছে, সেগুলো তাদের জানানো হয়েছে।’ তারপর তাদের দুঃখের কথা বলতে বলতে চোখ মুছতে থাকেন। পাশেই রয়েছে অপরিচ্ছন্ন ভবন। সেখানেই থাকেন বর্তমান বংশধরেরা।

বিশেষ আকর্ষণ
কুষ্টিয়ায় আসবেন আর কুষ্টিয়ার স্মৃতি ধরে রাখবেন না! কুষ্টিয়ার বিখ্যাত ‘তিলের খাঁজা’ ও ‘কুলপি’ মালাইয়ের স্বাদ গ্রহণ করতে ভুলবেন না!

default-image

কীভাবে যাবেন
দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে কুষ্টিয়ার মজমপুর যাওয়া যাবে। ঢাকা-দক্ষিণবঙ্গগামী ট্রেনে পোড়াদহ বা ভেড়ামারা নামতে হবে। এরপর অটো বা লোকাল বাসে কুষ্টিয়া। রাজশাহী বা খুলনার কিছু ট্রেন কুষ্টিয়াতেও আসে। রাজবাড়ী বা গোপালগঞ্জ থেকে ট্রেনে কুষ্টিয়া কোর্ট স্টেশন। তারপর বাস কিংবা অটোতে। এ ছাড়া ঢাকা থেকে সরাসরি সড়কপথে কুষ্টিয়া যাওয়া যায়। ঢাকার গাবতলী, কল্যাণপুর থেকে হানিফ এন্টারপ্রাইজ, কেয়া পরিবহন, স্কাইলাইন, এসএনএ পরিবহন, এনপি ফাতেমা পরিবহন, রোজিনা পরিবহন, এসবি পরিবহন ও শ্যামলী পরিবহনের বাস চলে এ পথে। ভাড়া ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা। একদিনে সব ঘুরতে হলে গাড়ি রিজার্ভ করে নিতে পারলে খুব ভালো হবে। অনেক সময় বেঁচে যাবে। তারপর লোকাল বাসে বা অটোতে কুমারখালী যাওয়া যাবে। কুমারখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে এক কিমি দক্ষিণে কুণ্ডুপাড়া গ্রাম। এখানেই আছে মিউজিয়াম ও বসতভিটা।

default-image

কোথায় থাকবেন
কুষ্টিয়া শহরে থাকার জন্য কয়েকটি আবাসিক হোটেল রয়েছে। এর মধ্যে হোটেল রিভারভিউ, ফেয়ার রেস্টহাউস, হোটেল গোল্ডস্টার, হোটেল পদ্মা, হোটেল আজমিরী ইত্যাদি। সাধারণ সিট ভাড়া সিঙ্গেল রুম ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। ডাবল রুম ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা। এ ছাড়া রাত যাপনের জন্য সরকারি রেস্টহাউস আছে।

লেখক: কবি

default-image
বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন