বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
সেন্ট মার্টিনের পূর্ব উপকূলে পশ্চিম উপকূলের তুলনায় মাছের অধিক পরিমাণ ও প্রজাতিগত প্রাচুর্য লক্ষ করা গেছে।
এস এম শরীফুজ্জামান গবেষণা প্রকল্পের প্রধান ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেসের অধ্যাপক

যেখানে প্রকাশিত

সেন্ট মার্টিন দ্বীপের পরিচিত মৎস্য প্রজাতি হলো উড়ুক্কু মাছ। বর্তমানে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে তিন প্রজাতির উড়ুক্কু মাছ পাওয়া যায়। গবেষকদল ‘চিলেপোগন স্পিলোনোটোপটেরস (Cheilopogon spilonotopterus) নতুন এক প্রজাতি শনাক্ত করেন। এ সংক্রান্ত গবেষণা গত ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা স্প্রিংগারের ‘কনজারভেশন জেনেটিক রিসোর্সেস’ জার্নালে প্রকাশিত হয়। মাছের এ প্রজাতিটি পাওয়া যায় সেন্টমার্টিনের পশ্চিম সৈকতের সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায়। সেন্টমার্টিনের এই এলাকায় এবং টেকনাফে পাওয়া যায় আরও ছয় প্রজাতির মাছ। জেলেরা এসব প্রজাতিকে সচরাচর কাটাচাঁন্দা বলে চেনেন। এই ছয় প্রজাতির মাছ নিয়ে একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা ‘উইলে’-এর মাৎস্য শ্রেণিবিন্যাসের অন্যতম জার্নাল ‘জার্নাল অব ফিশ বায়োলজিতে’।

অন্যদিকে টাইডপুল থেকে পাওয়া নতুন ১১ প্রজাতির মাছের গবেষণা নিবন্ধটি প্রকাশিত হয় চলতি বছরের মার্চে। আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা ‘এলসেভিয়ারের রিজিয়নাল স্টাডিজ ইন মেরিন সায়েন্স’ জার্নালে এটি প্রকাশ পায়।

গবেষণায় যা উঠে এল

গবেষকেরা জানান, সেন্টমার্টিনে অধিক পরিমাণে পর্যটকদের ভ্রমণ ও পরিবেশ দূষণ কারণে টাইডপুলে প্রাণীদের বাসস্থানের ক্ষতি হচ্ছে। গবেষণায় টাইডপুলের মাছের সম্প্রদায় কাঠামো, সংখ্যাবৃদ্ধির গতি, স্থানীয় মাছের জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে সঠিক তথ্য সরবরাহ করেছে গবেষণা প্রকল্পগুলো।

এসব গবেষণা প্রকল্পের প্রধান গবেষক এস এম শরীফুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, সেন্ট মার্টিনের পূর্ব উপকূলে পশ্চিম উপকূলের তুলনায় মাছের অধিক পরিমাণ ও প্রজাতিগত প্রাচুর্য লক্ষ্য করা গেছে। পশ্চিম উপকূলের কম হওয়ার কারণ হিসেবে বলা যায়, ওই উপকূলে অত্যধিক পর্যটকের যাতায়াত রয়েছে। পাশাপাশি নাফ নদীর স্বাদু পানির মৃদু প্রভাবও আছে।

তিনি আরও বলেন, এ গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল সামুদ্রিক জীব প্রকৃতি সম্পর্কে বিশদভাবে জ্ঞান আহরণ করা। প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট কারণে এসব প্রাণী মোটামুটি হুমকির মধ্যেই থাকে। ফলে মাছের এ নতুন প্রজাতিগুলো রক্ষা করা গেলে জীববৈচত্র্যও সংরক্ষণ করা যাবে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাবে, দেশের সামুদ্রিক জলসীমায় প্রাপ্ত মাছের প্রজাতির মোট সংখ্যা ৪৪২। ১৯৭০ সালের আরেকটি প্রকাশনা অনুযায়ী, প্রাপ্ত মাছের প্রজাতির সংখ্যা ৪৭৫। তবে এ পর্যন্ত মৎস্য প্রজাতি সঠিক সংখ্যা নিরূপণের জন্য বিশদ কোনো গবেষণা হয়নি বলে জানান গবেষকেরা।

নতুন ১৮ প্রজাতি

সেন্টমার্টিনের আশপাশের জেলে ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে গবেষকেরা নতুন পাওয়া ছয় প্রজাতির বাংলা নাম বের করেছেন। বাকি প্রজাতির স্থানীয় নাম বের করার কাজ এখনো চলমান। অবশ্য সব কটিরই বৈজ্ঞানিক নাম রয়েছে। নাম পাওয়া ছয় প্রজাতি হলো:

ডোরাকাটা ব্যাঙ মাছ (Allenbatrachus reticulatus): দেহের তুলনায় মাথা প্রশস্ত। শক্ত প্রশস্ত পাখনা। তুণ্ড গোলাকার। দেহের সম্মুখভাগ থেকে পুচ্ছ পাখনা পর্যন্ত বাদামি ছোপ বিদ্যমান।

পাথুরে বেলে (Bathygobius coalitus): দেহের তুলনায় মাথা আকারে বড়। দেহ আইশ দ্বারা আবৃত। গালে সারিবদ্ধ প্যাপিলা বিদ্যমান।

নুন্যা বাটা (Crenimugil crenilabis): তুণ্ড (চোখের সামনের অংশ) মাথার তুলনায় ছোট। এই মাছের দেহও আইশ দ্বারা আবৃত। পৃষ্ঠীয় পাখনা ও পায়ু পাখনার গোরা আইশ বিদ্যমান। বুকের দিকের পাখনা পুরোপুরি স্বচ্ছ। দুই ঠোটের অগ্রভাগে প্যাপিলা (ছোট ছোট শুঁড়) বিদ্যমান।

খরগোশ মাছ (Siganus sutor): এ মাছের তুণ্ড মাথার দৈর্ঘ্যের তুলনায় ছোট। দেহের ওপরের অংশ সবুজ ও বাদামি ছোপযুক্ত। পৃষ্ঠীয় ও পুচ্ছ পাখনায় শক্ত কাঁটা রয়েছে। পেটের অংশে আবার সাদাটে ছোপ আছে।

থুতনি কাঁটা চান্দা (Deveximentum megalolepis): মাছটির বুকের অংশ থেকে তলপেটের অংশ পর্যন্ত ১১ সারি আইশ দ্বারা আবৃত। রং সাদাটে। পিটের দিকে সাত থেকে আটটি বাদামি দাগ রয়েছে।

উড়ুক্কু মাছ (Cheilopogon spilonotopterus): দেহ সরু ও অগভীর। বক্ষীয় পাখনা লম্বাকৃতি এবং পুচ্ছ পাখনার উৎপত্তিস্থল পর্যন্ত বিস্তৃত। পুচ্ছ পাখনার নিচের অংশ ফলার মতো বিস্তৃত। পার্শ্বীয় রেখা দেহের অঙ্কীয় অংশে বিদ্যমান। তুণ্ড থেকে পৃষ্ঠীয় পাখনা পর্যন্ত ২৮-৩৫টি আইশ বিদ্যমান। ১ম বক্ষীয় পাখনা দ্বিখণ্ডিত।

এ ছয় প্রজাতির মাছ বাদে বাকিগুলোর বৈজ্ঞানিক নাম রয়েছে। এগুলো হলো Bathygobius curacao (ব্যাথিগোবিয়াস কোরাকাও): এ মাছের তুণ্ড খাট ও তীক্ষ্ণ। পৃষ্ঠীয় পাখনার মাঝে কালো ছোপ বিদ্যমান। দেহ সরু।

Callogobius hasseltii (ক্যাল্লোগোবিয়াস হাসেলটি): মাছের দেহ লম্বা ও সরু। প্রথম ও ২য় পৃষ্ঠীয় পাখনার মাঝে বড় ফাঁকা। পুরো দেহে ছোপ আকৃতির ঘন বাদামি দাগ বিদ্যমান। পুচ্ছ পাখনার দৈর্ঘ্য মাথার দৈর্ঘ্যর তুলনায় বড়।

Halichoeres nigrescens (হ্যালিচরিস নাইগ্রিসেন্স): মাছটির মুখ সম্মুখদিকে অগ্রসরমাণ। মুখের দুই চোয়ালে সুচালো দাঁত বিদ্যমান। তুণ্ড তুলনামূলক লম্বা। দেহের অধিকাংশ অংশ কাটাবিহীন আইশ দ্বারা আবৃত। পৃষ্ঠীয় পাখনায় নীলাভ ছোপ বিদ্যমান। পুচ্ছ পাখনার শেষ অংশ কিছুটা চতুর্ভুজাকৃতি।

Istigobius decorates (ইস্টিগোবিয়াস ডেকোরেটাস): মাছটি হলুদাভ। দেহের মাঝ বরাবর চার থেকে পাঁচটি ছোপ বিদ্যমান। বুকের পাখনা স্বচ্ছ। লেজে ডোরাকাটা দাগ আছে। দেহ কাটাবিহীন। তবে লেজের উৎপত্তি অংশে কাঁটাযুক্ত আইশ আছে। তুণ্ড অবনমিত। অঙ্কীয় পাখনা দ্বয় মাংসল পর্দা দ্বারা আবৃত।

Istigobius ornatus (ইস্টিগোবিয়াস অরনেটাস): দেহের সম্মুখভাগ সরু। পশ্চাৎ ভাগ আড়াআড়ি সরু। দেহ কন্টকবিহীন আইশযুক্ত। তুণ্ড অবনমিত এবং চোখের দৈর্ঘ্যের তুলনায় সামান্য বড়। অঙ্কীয় পাখনা দ্বয় মাংসল পর্দা দ্বারা আবৃত। দেহের মাঝ বরাবর ৫টি দাগ আছে।

Ostorhinchus cookii (অস্টোরিংকাস কুকি): দেহ তুলনামূলক গভীর এবং গোলাকার। চোখ তুণ্ডের দৈর্ঘ্যের তুলনায় বড়। গালের ত্বক আইশযুক্ত। দেহের অগ্রভাগ হালকা হলুদাভ। পার্শ্বীয় অংশে ৬ টি লম্বা বাদামি দাগ রয়েছে।

Yongenichthys nebulosus (ইয়াংগিনিকথিস নেবুলোসাস): তুণ্ড খাট এবং গোলাকার। গালে আংশিক মাংসল পর্দা বিদ্যমান। জিহ্বা তীক্ষ্ণ ও সরু । পার্শ্বীয় রেখা বরাবর ২৮ টি আইশ বিদ্যমান। বক্ষীয় পাখনা স্বচ্ছ।

Aurigequula longispina (অ্যাউরিগইকুইলা লনগিস্পাইনা), মুখ অবনমিত, দৈর্ঘ্যর তুলনায় শরীরের গভীরতা বেশি। দ্বিতীয় পৃষ্ঠীয় ও পায়ু পাখনা উল্লেখযোগ্যভাবে দীর্ঘায়িত এবং পুচ্ছ-পাখনার উৎপত্তিস্থল পর্যন্ত বিস্তৃত।

Equulites leuciscus (ইকুইলিটিস লিউসিসকাস): পার্শ্বীয় মধ্যমা বরাবর ৩ থেকে ৪টি হলুদাভ ছোপ বিদ্যমান। মাছটি পাওয়া যায় লোহিত ও আরব সাগরের জলসীমায়।

Eubleekeria rapsoni (ইউব্লেকিরিয়া রাপসনি): এ প্রজাতির মাছ ইন্দোনেশিয়া ও আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে পাওয়া যায়। মাছটির মুখ অবনমিত। গালের অংশ আঁইশযুক্ত। এদের পৃষ্ঠীয় পাখনার ২য় থেকে ৪র্থ কাটার সংযোগকারী পর্দায় হালকা কালো ছোপ রয়েছে।

Gazza rhombea (গাজা রহম্বিয়া): এটি সর্বপ্রথম জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপে আবিষ্কৃত হয়। মাছটির মুখ সম্মুখ দিকে অগ্রগামী। দুই চোয়ালে সুচালো দাঁত বিদ্যমান। এ মাছের আরেকটি প্রজাতি দেশে পাওয়া যায়। যার শরীরের মাঝ বরাবর কালো ছোপ রয়েছে। কিন্তু গাজা রহম্বিয়ায় এ ছোপ নেই।

Karalla daura(কারাল্লা ডাউরা): এ মাছটি ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, ওমান, থাইল্যান্ডসহ আরও কয়েকটি দেশে পাওয়া যায়। কিন্তু দেশীয় জলসীমায় এ মাছ নতুন শনাক্ত করা হলো। মাছটির মুখ অবনমিত ও গালে অংশ আইশবিহীন। এদের পৃষ্ঠীয় পাখনার ২য় থেকে ষষ্ঠ কাটার সংযোগকারী পর্দায় গাঢ় কালো ছোপ বিদ্যমান।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন