দ্রুত সমাধানে সরকারের পদক্ষেপ দরকার

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগ চেয়ে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন নিয়ে কথা বলেছেন পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক মো. কবির হোসেন। গতকাল সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর সিলেটের নিজস্ব প্রতিবেদক সুমনকুমার দাশ।

কবির হোসেন
প্রশ্ন:

প্রথম আলো: সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ তুলে তাঁর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন হলের কয়েক শ ছাত্রী। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের হামলার ঘটনা ঘটে। উপাচার্যের ব্যর্থতায় ছোট একটা ঘটনা বড় আকার ধারণ করেছে, এমনটাই অনেকে বলছেন। আপনি কীভাবে দেখছেন?

কবির হোসেন: হলের প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগ চেয়ে ঘটনাটা শুরু। যেদিন মূল ঘটনাটা (পুলিশের হামলা) ঘটল, এর আগপর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আলোচনা চলছিল। পুলিশ আসার পরও আইসিটি ভবনের সামনে অনেক শিক্ষক এসেছেন। তখন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে কোষাধ্যক্ষ একটা সম্ভাব্য প্রস্তাব নিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন। প্রস্তাবটা হচ্ছে, আগের প্রাধ্যক্ষকে সরিয়ে নতুন প্রাধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়া হবে। আমিও তখন সেখানে ছিলাম। ছাত্ররা সেখানে উত্তেজিত ছিল। তবে একটা সময়ে ফটক খুলে দিয়ে উপাচার্যের কাছে যাওয়ারও সুযোগ তৈরি করে দেয় ছাত্রীরা। গেটে যাওয়ার পরে পেছন দিকে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। এরপরই পুলিশের লাঠিপেটা শুরু হয়ে গেল। ঘটনাটা যখন শেষ মুহূর্তে, অর্থাৎ আর পাঁচ মিনিট হলেই বিষয়টা সমাধান হয়ে যেত, সেখানে একটা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে।

প্রশ্ন:

প্রথম আলো: কেন এমন ঘটনা ঘটল?

কবির হোসেন: আমার স্পষ্ট কথা হচ্ছে, এটা ভালো করে তদন্ত করে দেখা উচিত। দরকার হলে সরকারও তদন্ত কমিটি করতে পারে। আমার মনে হয়, এর পেছনে ইন্ধন আছে। তা না হলে যখন সমস্যার সমাধান ঠিক দ্বারপ্রান্তে, তখন কেন পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিপেটা করবে, ধাক্কাধাক্কি হবে! ছাত্ররা আবার ইটপাটকেল মারল, পরে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ল। এই যে একটা রণক্ষেত্র হলো, এতে হয়তো কোনো ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। তৃতীয় পক্ষের ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করার জন্য কেউ এটা করতে পারে।

প্রশ্ন:

প্রথম আলো: শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশে বিনা উসকানিতে পুলিশ তাঁদের ওপর হামলা চালিয়েছে...

কবির হোসেন: আমরা ইতিমধ্যে অনেকবার এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছি। আমাদের কাছে তেমন কোনো তথ্য নেই, পুলিশকে লাঠিপেটা করতে প্রশাসন থেকে কে বলেছে? আইসিটি ভবনটা সিসি ক্যামেরা দিয়ে সুরক্ষিত। যদি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তদন্ত করেন, তবে হয়তো বেরিয়ে আসবে আসল ঘটনা। অথবা পুলিশও ভালো জানতে পারে।

প্রশ্ন:

প্রথম আলো: লাঠিপেটার পাশাপাশি পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়েছে। পুলিশের এমন আচরণ সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখনো কিছু খোলাসা করেনি। এ বিষয়ে কী বলবেন?

কবির হোসেন: এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম ৩১ বছর ধরে চলছে। আজ পর্যন্ত পুলিশের লাঠিপেটায় কিছুই সমাধান হয়নি, আলোচনার মাধ্যমেই সব সমাধান হয়েছে। সাধারণত ছাত্ররা যখন নিজেদের মধ্যে মারামারি করত, তখন পুলিশ আসত, সেটা দমাত। এই আন্দোলনটা কিন্তু ছাত্রদের সঙ্গে উপাচার্যের, এখানে পুলিশ এসে যে ভূমিকা নিয়েছে, সেটা আমরা কখনোই মেনে নিতে পারি না। কারণ, শিক্ষার্থীদের ওপর এভাবে পুলিশের নির্বিচার লাঠিপেটা করা এবং পরবর্তী পর্যায়ে ছাত্রদেরও ইটপাটকেল মারা, পুলিশও আহত হয়েছে, ছাত্ররাও আহত হয়েছে, শিক্ষকেরাও আহত হয়েছেন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটা আমরা চাইনি। আমার মনে হয়, এটা বের করা উচিতÑ কারা এটা করেছে এবং কীভাবে করেছে।

প্রশ্ন:

প্রথম আলো: কী এমন ঘটল, যাতে শিক্ষকদের সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের মনে এত অবিশ্বাস ও সন্দেহ জন্মেছে?

কবির হোসেন: আসলে এ কারণটা আমরাও খুঁজে পাচ্ছি না। বিগত সময়ে যত বড় আন্দোলনই হোক, সেটা সমাধানের জন্য এগিয়ে গিয়েছি। এবারও পুলিশের লাঠিপেটায় যখন শিক্ষার্থীরা আহত হয়, আমি নিজে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে গিয়ে সবাইকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠিয়েছি। আমরা শিক্ষকেরাও কিন্তু সেদিন আহত হয়েছি, তবে আমরা ছাত্রদের ওপর কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া বা অসন্তোষ দেখাইনি। আমরা প্রায় আড়াই শ শিক্ষক তাদের কাছে গিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানিয়েছিলাম। কিন্তু শিক্ষার্থীরা আমাদের কোনো কথাই শুনল না। ওদের কথা হচ্ছে, ওদের দাবির প্রতি একাত্মতা ঘোষণা, তবেই আলোচনা করবে। ছয়বার আমরা তাদের কাছে গিয়েছি। তিন থেকে চার ঘণ্টা জ্যেষ্ঠ শিক্ষকেরা তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে।

শিক্ষার্থীদের বলব, তাদের প্রতি আমাদের কোনো রাগ-বিরাগ নেই। আমরা সহানুভূতিশীল, মর্মাহত, দিনরাত তারা অভুক্ত অবস্থায় রাস্তায় আছে, আমরাও ঘুমাতে পারছি না, ওরা আমাদের সন্তান। আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত তারা ক্লাসে ফিরে যাক, বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়া হোক। শিক্ষামন্ত্রী এরই মধ্যে উদ্যোগ নিয়েছেন, শিক্ষার্থীরা তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে আলোচনায় বসেছে। বিষয়টা দ্রুত সমাধান হোক।

প্রশ্ন:

প্রথম আলো: শুরুতেই সমাধানযোগ্য একটা বিষয় সমাধান করতে না পারার দায় কার?

কবির হোসেন: আমার মনে হয়, এ বিষয়ে আরেকটু তদারকি করলে ভালো হতো। তাহলে কিন্তু আজকের এই পর্যন্ত আসত না। ভবিষ্যতে এদিকে লক্ষ রাখতে হবে।

প্রশ্ন:

প্রথম আলো: আপনি একসময় শাবিপ্রবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি ছিলেন। গতকাল রোববার সমিতি বলেছে, উপাচার্যের পদত্যাগের বিষয়টি সরকারের এখতিয়ারভুক্ত। এ ক্ষেত্রে অতি দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য তাঁরা অনুরোধ করেছেন।

কবির হোসেন: আসলে উপাচার্যের নিয়োগের বিষয়টি সরকারের সিদ্ধান্তে হয়। তাই শিক্ষার্থীরা যে দাবিতে আন্দোলন করছেন, তা দ্রুত সমাধানে সরকারের পদক্ষেপ দরকার। উপাচার্য পদত্যাগ করবেন নাকি থাকবেন, এটা সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়। আমরা কেবল পরিস্থিতির উত্তরণে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আলোচনাই একমাত্র সমাধান। শিক্ষামন্ত্রী যেহেতু শিক্ষার্থীদের গুরুত্ব দিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন। তাই আমরা আশাবাদী, দ্রুতই এর সমাধান হবে। আর শিক্ষকদেরও তাদের আশ্বস্ত করতে হবে, আন্দোলনের ঘটনায় কোনো শিক্ষার্থীকেই দোষারোপ করা হবে না। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাটাও তুলে নেওয়া হোক। তাহলেই সমাধান আসবে।