বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আইসিডিডিআরবিতে সব মিলে ৩৬৪ জন বিজ্ঞানী কাজ করেন; এদের ৬১ শতাংশ পুরুষ, ৩৯ শতাংশ নারী। তাঁদের সহায়তা করেন আরও ৩ হাজার ৯৪০ জন কর্মচারী ও কর্মকর্তা। বিজ্ঞানীরা বর্তমানে চার শতাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন। ঢাকা ও মতলবে প্রতিবছর কয়েক লাখ মানুষ বিনা মূল্যে ডায়রিয়াজনিত রোগের চিকিৎসা পায়।

প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক তাহমিদ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওআরএস উদ্ভাবনের ৮০ শতাংশ কাজ হয়েছিল আইসিডিডিআরবিতে। উদ্ভাবন, গবেষণার বাইরে আইসিডিডিআরবির একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ বিজ্ঞানী ও গবেষক তৈরি করা। দেশি–বিদেশি অনেক তরুণ মেডিকেল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট শেষ করে আইসিডিডিআরবিতে কর্মজীবন শুরু করেন। বিশ্বমানের পরিবেশে তাঁরা কাজ করার সুযোগ পান। এরপর সারা দুনিয়ায় কাজের দরজা তাঁদের জন্য খুলে যায়।’

জনস্বাস্থ্যবিদ আব্বাস ভূইয়া তাঁর আইসিডিডিআরবি: আ স্টার ইন দ্য সাউথ বইয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে নক্ষত্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

জীবনদায়ী উদ্ভাবন

আইসিডিডিআরবির যুগান্তকারী কাজ হচ্ছে খাওয়ার স্যালাইন বা ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন (ওআরএস) উদ্ভাবন। ডায়রিয়াজনিত রোগ চিকিৎসায় বিশ্বব্যাপী ওআরএসের ব্যবহার আছে। এ নিয়ে গত শতকের ষাটের দশকে গবেষণা শুরু হয়েছিল। দীর্ঘ সময়ের গবেষণার পর পানি, লবণ ও চিনি/গুড়ের মাধ্যমে তৈরি দ্রবণের কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়। ডায়রিয়া চিকিৎসায় ওআরএসের ব্যবহার বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পেয়েছে। উদ্ভাবনের পর থেকে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে কয়েক লাখ মানুষের জীবন রক্ষা করেছে ওআরএস। মূলত ওআরএসের উদ্ভাবনই আইসিডিডিআরবিকে সারা বিশ্বে পরিচিতি এনে দেয়।

ডায়রিয়া চিকিৎসায় জিংক বা দস্তার ব্যবহারের মূল গবেষণাও করেছেন আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানীরা। তাঁরা প্রমাণ করেছিলেন যে জিংক ডায়রিয়ার‍ স্থায়িত্ব হ্রাস করে এবং ভবিষ্যতে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমায়। আইসিডিডিআরবির গবেষণালব্ধ প্রমাণের ভিত্তিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডায়রিয়া চিকিৎসায় ওআরএসের পাশাপাশি জিংক ব্যবহারে সুপারিশ করে।

দেশি-বিদেশি অনেক তরুণ মেডিকেল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট শেষ করে আইসিডিডিআরবিতে কর্মজীবন শুরু করেন। বিশ্বমানের পরিবেশে তাঁরা কাজ করার সুযোগ পান। এরপর সারা দুনিয়ায় কাজের দরজা তাঁদের জন্য খুলে যায়।
অধ্যাপক তাহমিদ আহমেদ, নির্বাহী পরিচালক, আইসিডিডিআরবি

আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানীদের মধ্যে সব সময় সহজ প্রযুক্তি উদ্ভাবনের চেষ্টা করতে দেখা গেছে। তাঁরা চেষ্টা করেছেন, এসব প্রযুক্তির জন্য যেন খরচ কম হয়, মানুষ যেন সহজে ব্যবহার করতে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলো কোন ধরনের স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে—তা মাথায় রেখেই তাঁরা নতুন উদ্ভাবনের কথা চিন্তা করেন।

প্রসবের সময় মায়েদের রক্তক্ষরণ পরিমাপের প্রযুক্তি এমনই সহজ উদ্ভাবন। বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর অন্যতম প্রধাণ কারণ প্রসবের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ। প্রসবকালে বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত ‘কাইয়ুম ম্যাট’ ব্যবহার করে রক্তের পরিমাণ বিপজ্জনক কি না, তা বোঝা যায়। প্রসূতিকে চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে কি না, তা ম্যাট দেখেই বুঝতে পারেন পরিবারের সদস্যরা। এটি এখন নিরাপদ প্রসবসামগ্রী হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সহজ ব্যবহারযোগ্য ও স্বল্পমূল্যের অক্সিজেন সরবরাহ প্রযুক্তির উদ্ভাবন গত কয়েক বছরে বেশ সাড়া জাগিয়েছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর নিউমোনিয়ায় অনেক শিশু মারা যায়। তীব্র নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুর অক্সিজেন থেরাপির দরকার হয়। প্রচলিত অক্সিজেন থেরাপি দেওয়ার যন্ত্রগুলো অনেক দামি। অনেক হাসপাতালে তা পর্যাপ্ত সংখ্যায় নেই। এমন প্রেক্ষাপটে আইসিডিডিআরবির গবেষকেরা ‘বাবেল সিপ্যাপ’ উদ্ভাবন করেন। আইসিডিডিআরবির ঢাকা হাসপাতালে এই নতুন প্রযুক্তির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হয়েছিল। তাতে তীব্র ইউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুর মৃত্যু কম হতে দেখা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিউমোনিয়া চিকিৎসায় এই প্রযুক্তির ব্যবহারের সুপারিশ করেছে।

মতলব থেকে সারা দেশে

গত শতকের সত্তরের দশকে মতলবে পরিবার পরিকল্পনা সেবার জন্য মাঠকর্মী নিয়োগ দেয় আইসিডিডিআরবি। এর ফলে জন্মনিয়ন্ত্রণ–সামগ্রীর ব্যবহার বেড়ে যায় এবং প্রজনন হার কমতে দেখা যায়। এই ফলাফলের প্রভাব পড়ে জাতীয় পর্যায়ে। পরবর্তী সময়ে সরকার দেশব্যাপী কর্মসূচি হাতে নেয় এবং পরিবার পরিকল্পনা সেবা দেওয়ার জন্য সারা দেশে ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট (এফডব্লিউএ) নিয়োগ দেয়। বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবার পরিকল্পনা সেবা দেওয়ার সূত্রপাত করেছিল আইসিডিডিআরবি।

গর্ভধারণের আগে নারীদের ধনুষ্টংকারের টিকা দেওয়ার ফলে শিশুরা ধনুষ্টংকার মুক্ত থাকে—এই গবেষণা আইসিডিডিআরবি মতলবে করেছিল। এই গবেষণা ফলাফল বৈশ্বিক স্বীকৃতি পায়। বাংলাদেশও সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে এটি অন্তর্ভুক্ত করে।

টিকা বিষয়ে এখন অনেক কথা হচ্ছে। আইসিডিডিআরবি বহু বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের টিকার কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখেছে। অধিকাংশ হয়েছে মতলবে। এসব টিকার মধ্যে আছে রোটা ভাইরাস, নিউমোনিয়া ও কলেরার টিকা। টিকা নিয়ে পরীক্ষা–নিরীক্ষার ফলাফল সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি সাজাতে সহায়তা করেছে।

পুষ্টি নিয়েও একই ধরনের কাজ আছে আইসিডিডিআরবির। পারিবারিক নির্যাতন নিয়ে আইসিডিডিআরবির গবেষণাকাজ সরকারের নীতি পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে অর্জনের মধ্যে আছে গড় আয়ু বৃদ্ধি, মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হ্রাস, শিশুপুষ্টির উন্নতি, জন্মনিয়ন্ত্রণ–সামগ্রীর
ব্যবহার বৃদ্ধি, মোট প্রজনন হার হ্রাসসহ আরও কিছু বিষয়। এসবের প্রতিটি ক্ষেত্রে আইসিডিডিআরবির অবদান আছে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন