default-image

করোনা শনাক্তের পরীক্ষার জন্য নমুনা দেওয়ার ৭ থেকে ৮ দিন পর ফল জানা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার ফল জানার আগেই করোনার উপসর্গ থাকা অবস্থায় রোগীর মৃত্যু হচ্ছে। ফল জানতে দেরি হওয়ায় সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে। আবার যেসব জেলায় করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা কেন্দ্র নেই, সেসব জেলায় পরীক্ষার ফল পেতে বেশি ভোগান্তি হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা পরীক্ষার ফল পেতে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টার বেশি বিলম্ব মানা যায় না। ফল পেতে দেরি হলে রোগী ও তাঁর স্বজনদের ওপর একধরনের মানসিক চাপও তৈরি হয়। আবার উপসর্গ থাকা ব্যক্তি নমুনা দেওয়ার পর ফল পাওয়ার আগ পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি না মানলে অন্যদের জন্য তা বিরাট ঝুঁকি তৈরি করবে।

করোনার উপসর্গ থাকায় গত ১৫ জুন নমুনা পরীক্ষা করতে দেন টাঙ্গাইল পৌর এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী কাদের তালুকদার। নমুনা দেওয়ার ১১ দিন পর ২৫ জুন জানানো হয় তিনি করোনা পজিটিভ। এরপর ২৭ জুন দ্বিতীয়বার নমুনা দেন। গতকাল শনিবার (৪ জুলাই) পর্যন্ত তিনি পরীক্ষার ফল জানতে পারেননি।

রাজধানীর যেসব বেসরকারি হাসপাতালে করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা নেওয়া হয় সেসব হাসপাতাল সাধারণত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পরীক্ষার ফল জানায়।

দেশে এখন ৭১টি কেন্দ্রে করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা হচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকায় ৩৭টি, ঢাকার বাইরে ৩৪টি কেন্দ্র। ঢাকাসহ দেশের ২২ জেলায় করোনা পরীক্ষা কেন্দ্র রয়েছে। বাকি ৪২ জেলা থেকে সংগ্রহ করা নমুনা কাছের কোনো জেলার পরীক্ষা কেন্দ্রে বা ঢাকার কোনো কেন্দ্রে পাঠানো হয়। গতকাল পর্যন্ত দেশে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৮ লাখ ৩২ হাজার ৭৪টি। এর মধ্যে গত শুক্রবার পর্যন্ত ঢাকা মহানগরীর কেন্দ্রগুলোতে পরীক্ষা হয়েছে ৫ লাখ ১২ হাজার ৬৭৫টি নমুনা। আর ঢাকার বাইরে পরীক্ষা হয়েছে ৩ লাখ ৪ হাজার ৬৭২টি নমুনা। অর্থাৎ মোট নমুনার ৬৩ শতাংশের পরীক্ষা হয়েছে ঢাকায়।

দেশের চারটি করোনা পরীক্ষা কেন্দ্র এবং চার জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার তুলনায় নমুনা সংগ্রহ হয় বেশি। প্রতিদিন নমুনা অপরীক্ষিত থাকায় জট তৈরি হচ্ছে। ঢাকার সরকারি পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোতে চাপ বেশি থাকায় ফল পেতে দেরি হচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানা যায়, পরীক্ষার চাপ কমাতে সন্দেহভাজন রোগীর জ্বর, কাশি, গলাব্যথা ও শ্বাসকষ্ট এই চার উপসর্গ না থাকলে অনেক ক্ষেত্রে নমুনা নেওয়া হচ্ছে না। এ বিষয়ে বিভাগীয় স্বাস্থ্য কার্যালয়ের মাধ্যমে সিভিল সার্জনদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। উপসর্গ দেখে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়ার পরেই রোগীর নমুনা নেওয়া হচ্ছে।

>

৭-৮ দিনেও মিলছে না পরীক্ষার ফলাফল
যেসব জেলায় পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই, সেখানে ফল পেতে বেশি ভোগান্তি
দেশে এখন ৭১টি কেন্দ্রে করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা হচ্ছে
পরীক্ষাকেন্দ্রের মধ্যে ঢাকায় ৩৭টি, ঢাকার বাইরে ৩৪টি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলার নমুনা পরীক্ষার ফল পেতে ৭ থেকে ৮ দিন সময় লাগছে। ২৫ জুন সর্বশেষ নমুনা পরীক্ষার ফল জানা গেছে। এরপর গতকাল পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষার ফল পাওয়া যায়নি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন মোহাম্মদ একরাম উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, দ্রুত করোনা পরীক্ষার ফল পাওয়া গেলে ভালো। রোগীর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হয়। ফল পেতে দেরি হওয়ায় নমুনা সংগ্রহের সময় রোগীকে বলে দেওয়া হচ্ছে, ফলাফল না পাওয়া পর্যন্ত যেন আইসোলেশনে (বিচ্ছিন্নকরণ) থাকতে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে।

যেসব জেলায় করোনা পরীক্ষা কেন্দ্র নেই, সেসব জেলায় সংগ্রহ করা নমুনার বেশির ভাগ আসে ঢাকার আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারে (এনআইএলএমআরসি)। একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গত শুক্রবার পর্যন্ত সর্বোচ্চ নমুনা পরীক্ষা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এনআইএলএমআরসি ১ লাখ ৯ হাজার ৫০৭টি নমুনা পরীক্ষা করেছে, যা দেশের মোট নমুনা পরীক্ষার ১৩ দশমিক ৪০ শতাংশ।

এনআইএলএমআরসির পরিচালক এ কে এম শামছুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, জুন মাসে ৭-৮ দিনের নমুনা জট তৈরি হয়েছিল। এখন আর তা নেই। জেলা থেকে নমুনা আসার ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে ফলাফল প্রস্তুত করে দেওয়া হয়।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জেলা থেকে আসা নমুনা পরীক্ষা শেষে সেগুলোর ফলাফল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণকক্ষে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ফলাফল রোগীদের কাছে পাঠানো হয়। ফল পেতে দেরি হওয়ায় রোগীদের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় থাকতে হচ্ছে। ফলাফল পাওয়ার আগেই অনেক ক্ষেত্রে রোগী সুস্থ হয়ে যাচ্ছেন। আবার রোগী সংকটাপন্ন অবস্থায়ও চলে যাচ্ছেন। ফলাফল পেতে দেরি হওয়ায় অনেকে স্বাভাবিক চলাফেরা করেন এবং তাঁদের কারও করোনা পজিটিভ হলে তাঁদের মাধ্যমে অন্যদের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ল্যাবরেটরিগুলোতে কয়েক দিন আগে সংগ্রহ করা নমুনাই বেশি পরীক্ষা করা হচ্ছে। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়মিত বুলেটিনে বলছে, সবশেষ ২৪ ঘণ্টার নমুনা পরীক্ষার ফল। বাস্তবে যে ফলাফল দেওয়া হচ্ছে, সেটি আসলে শেষ ২৪ ঘণ্টার চিত্র নয়। নমুনা জট কমিয়ে দ্রুত ফলাফল জানানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। ফল জানার অপেক্ষায় থাকা কোনো ব্যক্তি আইসোলেশনে না থাকলে তাঁর মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়াবে। 

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন