>
default-image
ছাত্র ২৪০০, শিক্ষকের পদ ২১, নামে বিজ্ঞান হলেও ফলে নয় , নেই কোনো যানবাহন, বিএসসি কোর্স থাকলেও ছাত্র মাত্র একজন, প্রায় সব ছাত্রকে কোচিং-প্রাইভেট পড়তে হয়

নামে বিজ্ঞান কলেজ হলেও পরীক্ষার ফল, শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক, আবাসিক সুবিধাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে সরকারি বিজ্ঞান কলেজ। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফল ঢাকার অন্য নামী সরকারি-বেসরকারি কলেজের তুলনায় বেশ খারাপ।

রাজধানীর ফার্মগেটের কাছে অবস্থিত এই কলেজের বেশির ভাগ শ্রেণিকক্ষ মান্ধাতা আমলে তৈরি সেমিপাকা টিনের ঘরে, তা-ও ছাত্রসংখ্যার তুলনায় পর্যাপ্ত নয়, পরিসরে ছোট। এসব শ্রেণিকক্ষে জেএসসি, এসএসসি পরীক্ষা হওয়ায় বছরের একটা বড় সময় ধরে কলেজে ক্লাস হয় না। ছাত্র বাড়লেও বাড়েনি শিক্ষকের পদ। বড় সরকারি কলেজগুলোর অধিকাংশ শ্রেণিকক্ষে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু নামে বিজ্ঞান কলেজ হলেও এই কলেজে মাত্র একটি মাল্টিমিডিয়ার ব্যবস্থা আছে।
কারিগরি উচ্চবিদ্যালয় হিসেবে ১৯৫৪ সালে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু। ১৯৮৫ সালে বিএসসি কোর্স চালুর মধ্য দিয়ে নামকরণ হয় ‘সরকারি বিজ্ঞান কলেজ’। তবে ডিগ্রি কোর্স আছে নামেই। চলতি শিক্ষাবর্ষে বিএসসিতে মাত্র একজন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন। কলেজটি এখন মূলত উচ্চমাধ্যমিক স্তরে বিজ্ঞান শাখায় সীমাবদ্ধ। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৪০০ শিক্ষার্থী পড়ছে। দুই বর্ষে ৮টি করে ১৬টি শাখা আছে। প্রতিটি শাখায় গড়ে ১৫০ জন শিক্ষার্থী পড়ে।
কলেজে ভর্তি হওয়া সব ছাত্রই এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া। কিন্তু এইচএসসির ফলাফলে এর ধারাবাহিকতা থাকে না। গত বছর ১ হাজার ২০০ জন এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ-৫ পান মাত্র ২৮৩ জন। কলেজের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার ফলও প্রত্যাশিত নয়। গত মাসে একাদশ শ্রেণির প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় ১ হাজার ২০০ ছাত্রের মধ্যে পাস করে ৫৩৮ জন।
এইচএসসির ফল তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিজ্ঞান শাখায় ঢাকা কলেজ, নটর ডেম, উত্তরা রাজউক মডেল কলেজসহ নামীদামি অন্য কলেজের চেয়ে পিছিয়ে আছে বিজ্ঞান কলেজ। যেমন গত বছর বিজ্ঞান কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পান প্রায় ২৪ শতাংশ ছাত্র। একই বছর নটর ডেম কলেজে বিজ্ঞান শাখায় তা ছিল প্রায় ৯১ শতাংশ।
চলতি বছরের তুলনায়ও বিজ্ঞান কলেজ পিছিয়ে আছে। এ বছর এই কলেজ থেকে ৬৭ শতাংশ ছাত্র জিপিএ-৫ পেয়েছেন। অথচ এ বছর ঢাকা কলেজের বিজ্ঞান শাখায় তা ছিল ৯৭ শতাংশের বেশি। ঢাকার আরেকটি নামী কলেজ রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ। এ বছর এ কলেজের বিজ্ঞান শাখায় ৯৭ শতাংশ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন।
গত ২৪ নভেম্বর সরকারি বিজ্ঞান কলেজে বেশ কয়েকজন শিক্ষক-ছাত্রের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁরা বলেছেন, নানা সমস্যার কারণে বিজ্ঞান শিক্ষার অন্যতম এই কলেজে এখন আর প্রত্যাশিত ফল হচ্ছে না। অথচ প্রায় ৯ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত কলেজটিতে সরকার একটু নজর দিলে বিজ্ঞান শিক্ষার বিশেষায়িত কলেজ হিসেবে এটি দেশের সেরা কলেজ হতে পারত।
কলেজের অধ্যক্ষ বনমালী মোহন ভট্টাচার্য বলেন, বিজ্ঞান কলেজ হলেও এই কলেজ পরিচালনার জন্য আলাদা কোনো নীতিমালাও নেই। অন্যান্য সরকারি কলেজের মতোই এটি চলে। বিশেষত্ব শুধু এখানে বিজ্ঞানের ছাত্ররা পড়ে।
পদার্থ, গণিত ও বাংলা বিভাগের কয়েকজন শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, জিমনেসিয়ামসহ টেনেটুনে ১৬টি শ্রেণিকক্ষ বানানো হলেও এর মধ্যে কয়েকটি দিনেও অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে। কলেজের অধিকাংশ শ্রেণিকক্ষই কলেজ প্রতিষ্ঠার সময় তৈরি সেমিপাকা ভবনে। এগুলোতে গরমের সময় ক্লাস নেওয়া খুবই কষ্টকর। ১৫০ জন শিক্ষার্থীকে একত্র করে পড়ানোর মতো শ্রেণিকক্ষ কলেজে নেই। অনেক সময় মিলনায়তনেও ক্লাস নেওয়া হয়।
পদার্থবিজ্ঞানের একজন শিক্ষক বলেন, কলেজের শ্রেণিকক্ষগুলোতে ৯০ থেকে ১০০ জন করে বসানো সম্ভব। এর মধ্যে একমাত্র তিনতলা ভবনের তিনটি শ্রেণিকক্ষে বড়জোর ৬০ জন করে বসানো সম্ভব। তাহলে ১৫০ জন শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে কীভাবে ক্লাস করান? জবাবে ওই শিক্ষক বলেন, ‘আসলে ভাগ্য ভালো, সব ছাত্র প্রতিদিন আসে না।’
শিক্ষক আছেন, শিক্ষক নেই: কলেজটিতে বর্তমানে শিক্ষকের পদ আছে ২১টি। এর মধ্যে ২টি শূন্য। এই পদগুলো সৃষ্টি হয়েছিল যখন কলেজে শিক্ষার্থী ছিল ৩০০ থেকে ৪০০ জন। এখন প্রায় আড়াই হাজার ছাত্র। বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ে মাত্র দুটি করে পদ আছে। বাকি বিষয়গুলোতে তিনটি করে। কয়েকজন শিক্ষক বলেন, বর্তমানে শিক্ষার্থীর তুলনায় এই পদ কম। আশির দশকে করা প্রশাসনিক সংস্কারসংক্রান্ত এনাম কমিটির সুপারিশ বিবেচনায় নিলে আরও নয়টি পদ দরকার।
কয়েকজন শিক্ষক বলেন, এই সমস্যা মেটাতে ২২ জন শিক্ষককে সংযুক্ত (অন্য জায়গায় পদায়ন করা হলেও এখানে ক্লাস নেন) হিসেবে আনা হলেও এটা অস্থায়ী ব্যবস্থা।
পরীক্ষার চাপে ক্লাস হয় কম: কলেজের ভেতরে আছে বিজ্ঞান কলেজ সংযুক্ত সরকারি উচ্চবিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের জায়গা ছাড়াও কলেজের একাধিক ব্লকে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষা হয়। জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার সময় সমস্যাটা প্রকট হয়ে ওঠে। স্বতন্ত্র পরীক্ষার হল না থাকায় শ্রেণিকক্ষগুলোতেই পরীক্ষা হয়। পাবলিক পরীক্ষা হওয়ায় কলেজ এলাকায় তখন ১৪৪ ধারা জারি থাকে। এই দুই পরীক্ষার সঙ্গে এইচএসসি মিলে বছরে প্রায় চার মাস ক্লাস হয় না।
কলেজের অধ্যক্ষ বলেন, শ্রেণিকক্ষসহ অবকাঠামোগত সমস্যাই এই কলেজের বড় সমস্যা। এটি সমাধানের পাশাপাশি শিক্ষকের পদ বাড়াতে হবে। একসঙ্গে থাকা কলেজ ও বিদ্যালয়ের বিভাজন খুব দ্রুত করতে হবে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছে।
প্রাইভেট-কোচিং অনিবার্য: কলেজের কয়েকজন ছাত্র ও অভিভাবক প্রথম আলোকে বলেন, এই কলেজের প্রায় সব শিক্ষার্থীকেই প্রাইভেট-কোচিং নিতে হয়।
কলেজের ভেতরে কথা হয় এক ছাত্রের মায়ের সঙ্গে। তাঁর বাসা বনশ্রীতে। ছাত্রটির মা বললেন, তাঁর ছেলেকে পদার্থ, রসায়ন, গণিত বিষয়ে প্রাইভেট পড়তে হয়। এর মধ্যে পদার্থ ও রসায়নের জন্য গৃহশিক্ষকও আছেন। আবার বাইরে ব্যাচেও পড়ে। সব মিলিয়ে তাঁর সন্তানের পড়াশোনা বাবদ মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়।
যাত্রাবাড়ীর তৌহিদুল ইসলাম একাদশ শ্রেণিতে পড়ে। সে বলল, পদার্থ, রসায়ন ও গণিত বিষয়ে তাকে প্রাইভেট পড়তে হয়। আরেকজন মা বললেন, কলেজের রসায়নের এক শিক্ষকের কাছে তাঁর সন্তান পড়ে। ওই শিক্ষক পার্শ্ববর্তী একটি কোচিং সেন্টারে পড়ান।
আবাসন ও যানবাহনের সংকট: কলেজ ক্যাম্পাসে দুটি ছোট ছাত্রাবাস থাকলেও আসন (সিট) চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। এর মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম ছাত্রাবাসে ১৫০ জন ও কুদরাত-এ-খুদা ছাত্রাবাসে ১৩০ জন ছাত্রের থাকার ব্যবস্থা আছে। কাজী নজরুল ছাত্রাবাসটি জরাজীর্ণ হতে চলেছে।
এ দুটি ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়ক আবু বকর মিয়া বলেন, বেশির ভাগ ছাত্র মফস্বলের হওয়ায় ছাত্রাবাসে থাকার প্রচুর চাহিদা আছে, কিন্তু সুবিধা না থাকায় তা পূরণ করা সম্ভব নয়।
ছাত্রদের যাতায়াতের জন্য কোনো বাস নেই। যাত্রাবাড়ী ও বনশ্রী থেকে আসা দুজন ছাত্রের অভিভাবক বলেন, পাবলিক বাসে করে তাঁদের সন্তানদের যাতায়াত করতে হয়। এতে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। কলেজের ভেতরে একটি ক্যানটিন থাকার প্রয়োজনীয়তার কথাও বললেন কেউ কেউ।
বিজ্ঞান কলেজ হিসেবে বাড়তি নজরের বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এস এম ওয়াহিদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, নজর নেই, তা ঠিক নয়, বিশেষায়িত কলেজ হিসেবে এটিকে আরও কীভাবে ভালো করা যায়, তার চেষ্টা চলছে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন