বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সম্ভাবনাময় এই শিল্পের আরও প্রসার ঘটাতে সরকার জামালপুরে একটি নকশিপল্লি গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এতে উদ্যোক্তাদের মধ্যে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আরও গতি আসবে বলে মনে করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে দূর হবে হস্তশিল্পকর্মীদের পণ্য বাজারজাত সমস্যা। শিল্পের প্রসারে জামালপুরের প্রস্তাবিত নকশিপল্লিটি দ্রুত বাস্তবায়ন হওয়ার দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সম্প্রতি সরেজমিনে শহরের ঢাকাইপট্টি থেকে দেওয়ানপাড়া পর্যন্ত প্রধান সড়কের দুই পাশে নারীদের পরিচালিত হস্তশিল্পের পণ্য তৈরির কারখানা ও দোকান চোখে পড়ে। শহরের বিভিন্ন মহল্লায় সারি সারি হস্তশিল্পের দোকান। বাসাবাড়িতেও তৈরি হয়েছে শোরুম। এসব শোরুমে নারী বিক্রেতাদের হস্তশিল্প পণ্য বিক্রি করতে দেখা যায়। আমলাপাড়া, বসাকপাড়া, কলেজ রোড়, বকুলতলা, জিগাতলা, মুন্সিপাড়া, মিয়াপাগা, বেলটিয়া, পাথালিয়া, পাঁচরাস্তা মোড়, কাঁচারিপাড়াসহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় হস্তশিল্প পণ্যের শোরুম চোখে পড়ে।

নারী উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, জেলায় বেকারত্ব ঘোচাতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে এই শিল্প। এই অঞ্চলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এনে দিয়েছে গতি। বহু নারী এই হস্তশিল্পের কাজ করে সংসার চালান ও ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার খরচ জোগান। জামালপুরের হস্তশিল্পের পণ্য ঢাকাসহ সারা দেশের খ্যাতি অর্জন করে বিদেশেও পরিচিতি লাভ করেছে। ফলে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। সৃষ্টি হয়েছে অনেক নারীর কর্মসংস্থান। লাভজনক এই কাজে নারীদের পাশাপাশি পুরুষেরাও সম্পৃক্ত হচ্ছেন।

সংসারের কাজের ফাঁকে শখের বশে ব্লক–বাটিকের কাজ করতেন শহরের বকুলতলা এলাকার মাদ্রাসা রোডের দেলোয়ারা বেগম। তিনি নিজ বাড়িতেই ব্লক–বাটিক শেখার প্রশিক্ষণ দেন আশপাশের নারীদের। শৈল্পিক এ কাজের নেশা কখন যে পেশায় পরিণত হয়েছে, তা তিনি বুঝতেই পারেননি। ব্লক–বাটিকের সঙ্গে যোগ হয় হস্তশিল্প। বর্তমানে তিনি হস্তশিল্পের সফল উদ্যোক্তা। মিলেছে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ নারী উদ্যোক্তার স্বীকৃতি। উদ্যমী দেলোয়ারা বেগম বলেন, ৫ হাজার টাকা পুঁজি আর পুরোনো একটি সেলাই মেশিন দিয়ে যাত্রা শুরু করেন তিনি। জীবনের লক্ষ্য ও পরিশ্রমকে কাজে লাগিয়ে তিনি এখন দাঁড় করিয়েছেন কোটি টাকার হস্তশিল্পের ব্যবসা।

জামালপুর জেলা হস্তশিল্প অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, আশির দশকের শুরুর দিকে জেলায় এই শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। একসময় সম্ভাবনাময় এই শিল্প প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল। গ্রামাঞ্চলের নারীদের নিপুণ হাতে সুই-সুতায় আবার এই শিল্পের বাণিজ্যিক প্রসার ঘটেছে। বর্তমানে এই শিল্প দেশ-বিদেশে খ্যাতি ছড়াচ্ছে। এখন এই পেশার সঙ্গে প্রায় দুই লক্ষাধিক নারী-পুরুষ জড়িত। এর ৮০ শতাংশই গ্রামাঞ্চলের নারী। এতে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন শত শত দরিদ্র নারী। বাড়তি আয়ের জন্য অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহিণীরাও এই কাজে যুক্ত হয়েছেন। তবে বিপণন সমস্যা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও পুঁজির অভাবে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অনেক নারী কর্মী।

কাঁচারিপাড়া এলাকার রোজিনা আক্তার। তিনি একজন উদ্যোক্তা। সংসারের কাজের পাশাপাশি তিনি হস্তশিল্প নিয়ে কাজ করেন। তিনি বলেন, মাসে তাঁর ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় হয়। গ্রামের অন্য নারীরাও মাসে অন্তত ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘরে বসেই আয় করছেন। এতে সবার সংসারে খরচ করতে পারেন এবং ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া খরচ জোগান দেন। এসব সম্ভব হয়েছে এই শিল্পের কারণেই। তাঁর মতো বহু নারী এখন হস্তশিল্পের কাজ করে স্বাবলম্বী।

শহরের মুকুন্দবাড়ি এলাকার শিক্ষার্থী মলি আক্তার। তিনি লেখাপড়ার পাশাপাশি হস্তশিল্পের কাজ করেন। তাঁর ভাষ্য, নবম শ্রেণিতে থাকা অবস্থায় তিনি এই কাজ শিখেছেন। আশপাশে অনেক নারী ও ছাত্ররা এই কাজ করতেন। তাঁদের কাছ থেকে শিখে তিনি এই কাজে যুক্ত হন। বর্তমানে তিনি উচ্চমাধ্যমিকে পড়েন। এই কাজের আয় দিয়েই লেখাপড়ার খরচ চালাচ্ছেন। তাঁর মাসে আয় পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা।

জামালপুরের নারীদের তৈরি হস্তশিল্প পণ্যের সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে বলে মন্তব্য করেন জাতীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সমিতি (নাসিব) জামালপুর জেলা শাখার সভাপতি মো. শাহিনুর আলম। তিনি বলেন, হস্তশিল্প পণ্যের তৈরি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে পরিণত হয়েছে। এসব পণ্য এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এসব পণ্য তৈরি করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন শত শত নারী। হস্তশিল্প পণ্যের নিজস্ব বাজার গড়ে উঠলে হতদরিদ্র নারী শ্রমিকেরা একদিকে যেমন ন্যায্যমূল্য পাবেন, অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র পুরো বদলে যাবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন