default-image

নিউমোনিয়া বা করোনায় আক্রান্ত রোগীর সেবা নিশ্চিতে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত পালস অক্সিমিটার (রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা মাপার যন্ত্র) এবং অক্সিজেনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। রোগীকে সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে হবে। এসব নিশ্চিত হলেই নিউমোনিয়ার মতো রোগে শিশুমৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।

বিশ্ব নিউমোনিয়া দিবস উপলক্ষে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সেভ দ্য চিলড্রেন, ইউনিসেফ ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘বিশ্ব নিউমোনিয়া দিবস: বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত’ শীর্ষক ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিলে বক্তারা এসব কথা বলেন। এতে চিকিৎসক এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবজাতক বিভাগের চেয়ারম্যান এবং কোভিড-১৯ নিয়ে জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ সহিদুল্লা বলেন, ২০১৮ সালে দেশে প্রায় ১২ হাজার শিশু নিউমোনিয়ায় মারা গেছে। নিউমোনিয়ার বিষয়ে এখনো গুরুত্বের অভাব রয়েছে বলে উল্লেখ করে এই চিকিৎসক বলেন, একটি শিশুও যেন করোনা বা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত না হয়, হলেও যেন মারা না যায়। শিশুদের অসুস্থতার সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা (আইএমসিআই), টিকাদান কর্মসূচি ইত্যাদি ঠিকমতো ধরে রাখতে পারলে নিউমোনিয়ায় মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা যাবে।

মোহাম্মদ সহিদুল্লা আরও বলেন, হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখতে হবে, যাতে নিউমোনিয়া বা করোনা রোগী গেলেই চিকিৎসা পায়। পালস অক্সিমিটার এবং অক্সিজেনের প্রাপ্যতা উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত থাকতে হবে। বড় হাসপাতালে তরল অক্সিজেন ট্যাংকের ব্যবস্থা থাকা দরকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন স্থানীয় পর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে নিউমোনিয়া প্রতিরোধ সম্ভব বলেও উল্লেখ করেন এই চিকিৎসক।

বিজ্ঞাপন

পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ ও অক্সিমিটারের ব্যবহারের ওপর জোর দেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান মায়া ভেনডেনেন্ট। তিনি বলেন, করোনাভাইরাস একটি বৈশ্বিক সংকট। তবে এই সংকটকালে অক্সিজেন ব্যবস্থাপনাকে উন্নত করার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। করোনা পরিস্থিতি ও নিউমোনিয়া—দুটোর জন্যই অক্সিজেন সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকতে হবে। তিনি অক্সিমিটারের ব্যবহার স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। অক্সিজেন প্রসঙ্গে মায়া ভেনডেনেন্ট আরও বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অন্তত সিলিন্ডারের মাধ্যমে অক্সিজেনের ব্যবস্থা করতে হবে। জেলা পর্যায়ের হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে আরও বড় পরিসরে অক্সিজেনের ব্যবস্থা থাকা দরকার। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ইউনিসেফ এ বিষয়ে কাজ করছে বলে জানান তিনি।

সেভ দ্য চিলড্রেনের গ্লোবাল প্রজেক্ট লিড (পিসিসি) অ্যালিসা ওম’ইনিবোসও পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, নিউমোনিয়া শিশু মৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ। নিউমোনিয়া প্রতিরোধে সরকারের নীতিসহায়তা ও অর্থ বরাদ্দ জরুরি। এ ক্ষেত্রে একটি দেশ অন্য কোনো দেশের সফলতার অভিজ্ঞতাও জানতে পারে। নিউমোনিয়া প্রতিরোধে সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশকে সহযোগিতা করে যাবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ইউনিসেফের প্রধান কার্যালয়ের চাইল্ড অ্যান্ড কমিউনিটি হেলথ ইউনিটের বিশেষজ্ঞ অ্যান ডি’জেন বলেন, ‘করোনাভাইরাস নিউমোনিয়ার ভয়াবহতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। আমরা সবাই চেষ্টা করছি, সব শিশু যেন প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা পায়।’

প্রত্যেকের দোরগোড়ায় শুধু স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছালেই হবে না, মানসম্মত সেবা দেওয়ার তাগিদ দেন অ্যান ডি’জেন। তিনি নিউমোনিয়া প্রতিরোধে পরিবেশ ও পুষ্টির দিকে নজর দেওয়ার কথা বলেন। নিউমোনিয়া প্রতিরোধে বাংলাদেশ উন্নতি করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সেভ দ্য চিলড্রেনের শিশু স্বাস্থ্য পরিচালক সেলিম সদরুদ্দিন বলেন, নিউমোনিয়া নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইনের পাঁচ বছর পর বাংলাদেশ তা গ্রহণ করেছে। যদিও তা থেকে শিশুরা তেমন লাভবান হচ্ছে না। এর প্রয়োগও সীমিত। গাইডলাইনটি যদি সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ করা হতো, তাহলে অনেক শিশু উপকৃত হতো।

শিশুদের অসুস্থতার সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা বা আইএমসিআই নিশ্চিতে জেলা পর্যায়ে এখনো ঘাটতি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন সেলিম সদরুদ্দিন। তিনি এর জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ, প্রশিক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাপনা উন্নত করার ওপর জোর দেন।

আইসিডিডিআরবির জ্যেষ্ঠ পরিচালক শামস আল আরেফিন বলেন, নিউমোনিয়া হলে এখনো অনেক শিশুকে হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে নেওয়া হয় না। অনেকে হাসপাতালে যাওয়ার আগেই মারা যায়। তিনি এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের আস্থার অভাবকে একটি সমস্যা বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, করোনাকালে এ সমস্যা আরও বেশি দেখা দিয়েছে। হাসপাতালে যাওয়ার প্রবণতা কমে গিয়েছিল।

বাংলাদেশে প্রায় ৫ শতাংশ চিকিৎসাকেন্দ্রে শিশুদের চিকিৎসার জন্য যথাযথ প্রস্তুতি আছে বলে উল্লেখ করে শামস আল আরেফিন বলেন, অক্সিজেন সরবরাহের পাশাপাশি রোগীর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সেবার সুবিধা থাকতে হবে। সময়মতো সুচিকিৎসা দিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

করোনা মহামারির শুরুর দিকে বাংলাদেশে শিশুস্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (এমএন-সিএএইচ) মো. শামসুল হক। তিনি বলেন, বেশি বাজে অবস্থা ছিল এপ্রিল ও মে মাসে। সে সময় প্রায় ৯ শতাংশ স্থায়ী টিকাদান কেন্দ্র এবং ৩৮ শতাংশ অস্থায়ী টিকাদান কেন্দ্রে টিকা দেওয়ার কাজ বন্ধ ছিল। তিনি সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে বলেন, এর ফলে ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি হতে থাকে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) বাড়তে থাকে। বছর শেষে টিকাদান কার্যক্রম সফল হবে বলে তিনি দাবি করেন।

সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর রিসাল বন্দনা বলেন, নিউমোনিয়ায় শিশুমৃত্যু ধীরে ধীরে কমে আসছে। তবে এ ক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনে আরও কাজ করতে হবে। আইএমসিআই, ইপিআর ও পুষ্টি বিষয়ে কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। নিউমোনিয়ায় শিশুমৃত্যু কমিয়ে আনার জন্য সেভ দ্য চিলড্রেনের বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরেন রিসাল বন্দনা। তিনি বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপর জোর দেন।

সূচনা বক্তব্যে প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, নিউমোনিয়ায় মৃত্যুহার অনেকটাই কমিয়ে আনা যাবে। এর জন্য টিকাদান কর্মসূচি ও সচেতনতা তৈরিতে জোর দেওয়া প্রয়োজন। টিকাদান কর্মসূচিতে সেভ দ্য চিলড্রেন ও ইউনিসেফের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

মন্তব্য পড়ুন 0