করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে দুই দেশের নিয়মিত অনেক বৈঠক গত দুই বছরে অনুষ্ঠিত হয়নি। গত ডিসেম্বরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র‌্যাবের সাবেক ও বর্তমান ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কে কিছুটা হলেও অস্বস্তি তৈরি করেছিল।

ঢাকার কর্মকর্তারা বলছেন, গত ২০ মার্চ অংশীদারত্ব সংলাপের মধ্য দিয়ে দুই দেশের নিয়মিত বৈঠকগুলো আবার শুরু হয়েছে। নিরাপত্তা সংলাপের দুই দিন আগে অর্থাৎ আজ সোমবার ওয়াশিংটনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন আলোচনায় বসছেন। এ দিন দুই দেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর উদ্‌যাপন করছে। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁদের আলোচনায় সম্পর্ককে পরের ৫০ বছরে কোথায় নিয়ে যেতে আগ্রহী, তা নিয়ে আলোচনা করবেন।

অবশ্য কয়েকটি বিষয়ে চ্যালেঞ্জ দেখছেন বাংলাদেশের কর্মকর্তারা। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইউক্রেন ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা এবং আইপিএসে বাংলাদেশের যুক্ততা।

দুই দেশের নিরাপত্তা সংলাপের আলোচ্যসূচিতে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার অনেকগুলো বিষয় রয়েছে। এই আলোচনায় যথারীতি র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি বাংলাদেশ তুলে ধরবে।
মাসুদ বিন মোমেন, পররাষ্ট্রসচিব

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোথায় গড়াবে, তা স্পষ্ট নয়। ইতিমধ্যে জাতিসংঘ দুটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। যদিও এ ধরনের প্রস্তাব আরও আসতে থাকবে। ফলে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিজের অবস্থান ঠিক করবে। বাংলাদেশের এই অবস্থানে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা অগ্রাধিকার পাবে। কোনো ধরনের মেরুকরণে যাওয়ার পক্ষপাতী নয় বাংলাদেশ।

মার্কিন রাজনীতিবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড ঢাকায় ২০ মার্চ অংশীদারত্ব সংলাপ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, আইপিএসে অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত উপাদান রয়েছে। এই উদ্যোগের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যুক্ত হলে যুক্তরাষ্ট্র খুশি হবে।

আইপিএসের মাধ্যমে সমুদ্রপথে অবাধে ও নিরাপদে পণ্যের সরবরাহের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্রসচিব বলেন, বাংলাদেশ আইপিএসে অর্থনৈতিক উপাদানে বেশি জোর দিচ্ছে। এটি যেন কোনো পক্ষকে প্রতিহত করার জন্য না হয়, সে প্রসঙ্গটি বাংলাদেশ সামনে এনেছে।

প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সময় প্রয়োজন

সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে গৃহীত ফোর্সেস গোল অনুযায়ী উন্নত সমরাস্ত্র সংগ্রহে বিভিন্ন উৎসে মনোযোগ দিচ্ছে বাংলাদেশ। এরই অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আধুনিক প্রযুক্তির সমরাস্ত্র কিনতে দেশটির সঙ্গে দুটি বিশেষায়িত প্রতিরক্ষা চুক্তি—জিসোমিয়া (জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন অ্যাগ্রিমেন্ট) এবং আকসা (অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং অ্যাগ্রিমেন্ট) নিয়ে আলোচনা করছে বাংলাদেশ। ঢাকায় অংশীদারত্ব সংলাপের সময় জিসোমিয়ার হালনাগাদ খসড়া বাংলাদেশকে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, জিসোমিয়ার সবশেষ যে খসড়াটি যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে, তা নিয়ে নিরাপত্তা সংলাপে আলোচনা হবে। তবে বৈঠকে এটি চূড়ান্ত হবে না। এটি চূড়ান্ত করার আগে আরও আলোচনার কথা রয়েছে। তবে আকসার বিষয়ে এ মুহূর্তে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ূন কবীর গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, নানা ক্ষেত্রে দুই দেশের কাঠামোগত যে সহযোগিতা, তা এগিয়ে যাচ্ছে। তবে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঘাটতিটা হচ্ছে মূল্যবোধের বোঝাপড়ায়। দুই দেশের কাছেই এই সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ এই সম্পর্ককে দ্বিপক্ষীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখে। আর যুক্তরাষ্ট্র দেখে বৈশ্বিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে। এ ক্ষেত্রে গভীরভাবে বিশ্লেষণের মাধ্যমে সম্পর্ক জোরদারে বাংলাদেশের মনোযোগী হওয়া জরুরি।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন