নেচে-গেয়ে, কেক কেটে দিনভর উদযাপন

Tanvir Ahammed

করোনা মহামারির দুঃসময়, মৃত্যুর শোক, নানামুখী বাধা, চাপ অতিক্রম করে আলো, প্রগতির ও সত্যের পথে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার দৃঢ় প্রত্যয়ের ভেতর দিয়ে ২৩ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর আনন্দ উদ্‌যাপন করছে প্রথম আলো।

আজ ৪ নভেম্বর বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই কারওয়ান বাজারে প্রগতি ভবনে প্রথম আলোর কার্যালয়ে ছিল আনন্দঘন পরিবেশ। বরাবরই প্রথম আলো সহকর্মী,সহযোগী, শুভানুধ্যায়ী, বিজ্ঞাপন দাতা, পাঠক সবাইকে নিয়ে ঢাকাসহ সারা দেশে বৈচিত্র্যময় আয়োজনের ভেতর দিয়ে বর্ষপূর্তি উদ্‌যাপন করে থাকে। করোনা মহামারির কারণে গত বছর সেই অনুষ্ঠান ভার্চ্যুয়ালি হয়েছে। করোনা কাল পেরিয়ে দেশে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসতে থাকায় এবার প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর আয়োজন করা হয়েছে। তবে বরাবরের চেয়ে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে।

স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা করে বড় জনসমাবেশ এড়াতে এবার প্রথম আলোর প্রতিটি বিভাগ আলাদা করে অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেছিল। প্রগতি ভবনের সাতটি তলা জুড়ে প্রথম আলোর বিভিন্ন বিভাগ। মূল পরিকল্পনা ছিল সম্পাদক মতিউর রহমান জ্যেষ্ঠ কর্মীদের নিয়ে প্রতিটি বিভাগে গিয়ে প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর কেক কাটবেন। জন্মদিনের বক্তব্য দেবেন। বিভাগের কর্মীরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে এবং তা হবে প্রতিযোগিতা ভিত্তিক। এ জন্য তিন সদস্যের বিচারকমণ্ডলীও গঠন করা হয়েছিল প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও বিজ্ঞান চিন্তার সম্পাদক আবদুল কাইয়ুম, হেড অব কনটেন্ট (ইংরেজি ওয়েভ) আয়েশা কবির ও বিজ্ঞাপন (সেলস) বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক ওমানা ইসলামকে নিয়ে। তবে অনুষ্ঠান শুরু হলে ছিল চমকের পর চমক। সম্পাদক নিজেই বিস্মিত যে প্রথম আলোয় সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি, সঞ্চালনার এত এত প্রতিভার সমাবেশ ঘটেছে!

মান নয়, অবস্থানের উচ্চক্রম থেকে শুরু হয়েছিল আনুষ্ঠানিকতা সূচনা। সম্পাদক মতিউর রহমান ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হক, উপসম্পাদক লাজ্জাত এনাব মহসি ও বিচারকমণ্ডলী সমভিব্যাহারে ১৩ তালায় প্রবেশ করে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন। এখানে প্রথম আলোর গ্রাফিকস, কম্পোজ, প্রুফ, আলোকচিত্র ও ফিচার বিভাগ। ফিচার সম্পাদক সুমনা শারমিন স্বাগত জানিয়ে তাদের আয়োজন শুরু করেন।

কর্মীদের নিয়ে কেক কেটে সম্পাদক বলেন, মাত্র ১২০ জন কর্মীকে নিয়ে প্রথম আলোর যাত্রা শুরু হয়েছিল এখন কর্মী সংখ্যা নয় শতাধিক। ছাপা পত্রিকার পাশাপাশি অনলাইন, কিশোর আলো, বিজ্ঞান চিন্তা, প্রতিচিন্তা, প্রথমা প্রকাশন, প্রথম আলো ডিজিটাল,এবিসি রেডিও, চরকিসহ এটি এখন একটি অনেক বড় মিডিয়া হাউস। প্রতিষ্ঠান বড় হয়েছে, দায়িত্বও বেড়েছে। চাপ, বাধা, প্রতিবন্ধকতা এসবও। তাই আরও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে, দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে কাজ করতে হবে। প্রথম আলো তার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলায় অবিচল থাকবে।

করোনা মহামারির উল্লেখ করে মতিউর রহমান বলেন, একটা কঠিন সময় পার হলো। করোনা মহামারির ভেতরেও সবার সমন্বিত চেষ্টায় ২০২০ সাল এবং চলতি বছরটি অতিক্রম করা গেল। প্রথম আলোর অনেক কর্মীও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমান খান ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক অরুণ বসুকে হারানোর ক্ষতি অপূরণীয়। শোক ও বেদনা গভীর। এ ছাড়া ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন সম্পাদনা সহকারী আবুল কালাম আজাদ। তাদের পরিবারের সঙ্গে প্রথম আলো আছে। আগামী দিনগুলোতে প্রথম আলোর কর্মী ও তাদের পরিবারে সদস্যদের নিয়ে সুস্থ, সুন্দর, আনন্দময় সময় কাটাবে তিনি এই প্রত্যাশা করেন।

এরপরে আলোকচিত্রী কবির হোসেন তার তোলা সম্পাদকের একটি ছবি তাকে উপহার দেন। যেটি সঞ্চালক সুমনা শারমিনের ভাষ্যে ছিল ‘বিশাল এক বোতল তৈল’। তার পর তিনি জানালেন এবার আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের সমন্বয়ে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা পর্ব। ‘প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে’ গানের পর আবৃত্তি অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো’। আবার দোতারা বাজিয়ে গান ‘গ্রামের নওজোয়ান’। পরিবেশনায় ছিলেন ফারজানা লিয়াকত, আশীষ বৈষ্য, জাবেদ হুসেন ও রশিদুজ্জামান।

রিপোর্টিং, ক্রীড়া, বিনোদন, বিশাল বাংলা, নিউজ, অনলাইন নিয়ে ১২ তালায় কার্যক্রম। সম্পাদক ও বিচারক দলকে অভ্যর্থনা করলেন অনলাইন প্রধান শওকত হোসেন মাসুম। যথারীতি কেক কাটার পর্ব। সম্পাদক অনুপ্রাণিত করলেন, সম্প্রতি জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামের নেদারল্যান্ডসের ফ্রি প্রেস আনলিমিটেডের সেরা অদম্য সাংবাদিক হিসেবে পুরস্কার দৃষ্টান্ত তুলে ধরে। বললেন সত্যানুসন্ধানে প্রথম আলো অতীতের মতেই বাধায় সামনে নমনীয় না হয়ে সাহসী ভূমিকা পালন করে যাবে। কর্মীরও তাঁর কথায় জানালেন তাদের দৃঢ় সম্মতি। সে কথাই ক্রীড়া প্রতিযোগিতার এক জনপ্রিয় ধারাভাষ্যকারের অনুসরণে তুলে ধরলেন শরীফ নাসরুল্লাহ। নজরুল সংগীত ‘আমার আপনার চেয়ে আপন ’পরিবেশন করলেন নিশাত আহমেদ, ‘সকাতর ওই কাঁদিছে সকলে’ গাইলেন শেখ সাবিহা আলম।’

এরপর আরেক ধাপ নিচে ১১ তালায় আসতেই রীতিমতো বিস্ময়ের ধাক্কা। বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে স্বাগত জানালেন যুবকর্মসূচীর সমন্বয়ক মুনির হাসান। কাচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই সমবেত ধ্রুপদি নৃত্য। পরিবেশন করলেন নাদিয়া ইসলাম, বাবরী ইসলাম,বন্যা সাহা ও খন্দকার হাবিবা রহমান। টেবিলে টেবিলে রঙিন বেলুন। কর্মীরা সবাই ঝুমঝুমি আর নলখাগড়ার বাঁশি বাজিয়ে রীতিমতো গ্রামীর মেলার আবহ সৃষ্টি করলেন। এরপর একটি ছোট্ট ভিডিও প্রদর্শনী বিভাগের কার্যক্রম নিয়ে। এখানে আইটি, এবিসি রেডিও, যুব কার্যক্রম ও চরকির। কেক কাটা হলো। এবিসি রেডিও প্রথম আলোর সঙ্গে থাকবে কি না সম্পাদকের এমন প্রশ্নে বিপুল ভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলো। সম্পাদকের বক্তব্য। কিন্তু শেষ নয়। দোতারা বাজিয়ে ‘গ্রামের নওজোয়ান’ গেয়ে জমিয়ে তুললেন রেহান রাসুল।

পাঠাগার ও ভিডিও বিভাগ হলো ১০ তলায়। এখানে কেক কাটা ও সম্পাদকের বক্তব্যের পর সাংস্কৃতিক পর্বে ছিল গিটার বাজিয়ে গান ‘ওরে নীল দরিয়া’, আবৃত্তি ‘এই ভ্রমণ আর কিছু নয় তোমার কাছে যাওয়া’ পরে আবার গান ‘এই মন তোমাকে দিলাম’। অংশ নিয়েছেন সারাহ ফ্যাইরুজ যাইমা, সাইফুল করিম, নাজিয়া আফরিন, নাসির হাসান ও ইফতেখার আহমেদ।

রীতিমতো সামরিক কায়দায় স্যালুট অষ্টম তলায় প্রবেশের মুখে। বিভাগের সবাইকে নিয়ে এর নেতৃত্ব দিলেন হেড অব সিকিউরিটি অবসর প্রাপ্ত মেজর সাজ্জাদুল কবির। এই তলায় প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগ। তাদের তরফ থেকে ছিল ‘আলো আমার আলো ওগো’ গানের মাঝে মাঝে প্রথম আলোকে নিয়ে লেখা কবিতার সমন্বয়ে বিশেষ পরিবেশনা। এতে অংশ নেন উৎপল চক্রবর্তী, এ বি এম খায়রুল,কবির, মাহাবুর কায়সার ও শামিম খান।

সপ্তম তলায় সম্পাদকীয়, ট্রাস্ট, বিজ্ঞান চিন্তা, কিশোর আলো,প্রথমা আনিসুল হক অভ্যর্থনা জানালেন। স্মরণর করলেন এই তলারাই তাদের পাশে বসা সহকর্মী মিজানুর রহমান খান ও অরুণ বসুকে। আনন্দের দিনেও একটু বিষণ্নতার স্পর্শ থেকে গেল তাদের আয়োজনে। প্রয়াতদের কথা স্মরণ করে আখতার হুসেন গাইলেন, ‘আজ তোমারে দেখতে এলেম অনেক দিনের পরে’। মাহবুবা সুলতানা গাইলেন,‘আজ আবার সেই পথে দেখা হয়ে গেল।’

শেষে দোতলায় ডিজিটাল বিজনেস ও সম্পাদকের দপ্তর। ডিজিটাল বিজনেস বিবর্ধন রায়ের সঞ্চালনায় নতুন কর্মী হোসাইন আল ফারাবি আবৃত্তি করলেন আর এই ভবনের আয়োজন শেষ হলো সবাই মিলে ‘আমরা করব জয়’ গানটি গেয়ে।

প্রথম আলো ভবনে
প্রগতি ভবনের অনুষ্ঠান শেষে হলে পাশেই প্রথম আলোর নিজস্ব ভবনের যান সম্পাদকসহ জ্যেষ্ঠ কর্মীরা। এখানে তৃতীয় তলায় হিসাব বিভাগের কর্মীরা তাদের স্বাগত জানান। হিসাব বিভাগের ব্যবস্থাপক পলাশ রঞ্জন ভৌমিকের উপস্থাপনায় ‘বন্ধু, তিন দিন তোর বাড়িতে গেলাম, দেখা পাইলাম না’ গানটি গেয়ে শোনান সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ফিরোজ শাহরিয়ার। আরেক সিনিয়র এক্সিকিউটিভ শাকিল আহমদ গেয়ে শোনান ‘অলির কথা শুনে বকুল হাসে’। এরপর হিসাব বিভাগের কর্মীদের নিয়ে কেক কাটেন সম্পাদক।

বিজ্ঞাপন, সার্কুলেশন, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ বিভাগ দ্বিতীয় তলায় । এই বিভাগের আয়োজন ছিল একটু অন্যরকম। দ্বিতীয় তলার সম্পাদকসহ জ্যেষ্ঠ কর্মীরা প্রবেশ করতেই তাদের ফুল আর মুহুর্মুহু তালি দিয়ে বরণ করা হয়। চন্দ্রিমা পোদ্দারের কণ্ঠে ‘ আলো আমার আলো’ গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করেন মাধবী লতা।
এ সময় প্রথম আলো সম্পাদক বলেন, বিজ্ঞাপন, সার্কুলেশন, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ বিভাগের সহকর্মীরা পত্রিকার পেছনে থেকে অনেক পরিশ্রম করেন। তারা করোনাকালে অনেক পরিশ্রম করেছে। তিনি প্রথম আলোর ২৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রতিটি বিভাগের ভিন্ন ভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রশংসা করেন।

এখানে বন্ধুসভার কক্ষে কেক নিয়ে অপেক্ষা করছিল প্রথম আলো বন্ধুসভার বন্ধুরা। সম্পাদকসহ জ্যেষ্ঠ কর্মীরা সেখানে গেলে বন্ধুসভার বন্ধুরা গেয়ে শোনান, ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’ গানটি। এ সময় প্রথম আলো বন্ধুসভার সাধারণ সম্পাদক কামরুন্নাহার মৌসুমি বলেন, প্রথম আলোর স্লোগান হলো, ‘যা কিছু ভালো, তার সঙ্গে প্রথম আলো’আর বন্ধুসভার স্লোগান হলো, যা কিছু মন্দ অথবা কালো, তা দূর করবে বন্ধুসভা প্রথম আলো।

প্রথম আলো সম্পাদক বলেন, সারা দেশে বন্ধুসভা খুব ভালো কাজ করছে। তাঁরা করোনাকালে নিজেরা অর্থ সংগ্রহ করে অসহায় মানুষের মধ্যে বিতরণ করেছে। এটা দৃষ্টান্তমূলক।

অনুষ্ঠান শেষ হয় নিচ তলায় কাস্টমার কেয়ার, সাপোর্ট টিম, বিজ্ঞাপন গ্রাফিকস ও নিরাপত্তা বিভাগের কর্মীদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে। বিজ্ঞাপন গ্রাফিকস বিভাগের গ্রাফিকস ডিজাইনার মাহবুব রহমান প্রথম আলো ও সহকর্মীদের নিয়ে স্বরচিত একটি কবিতা শোনান। সেখানে সম্মিলিত কণ্ঠে ‘মা গো ভাবনা কেন’ গানটি গেয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।