নোয়াখালীতে ধর্ষণ বাড়ছেই, স্কুলছাত্রীরা বেশি শিকার

বিজ্ঞাপন

এখনো সব সময় তাঁর হাত-পায়ের মাংস ও হাড়ে ব্যথা করে। যন্ত্রণায় রাতে ঘুমাতে পারেন না। ডাক্তার দেখিয়েছেন, কিন্তু ওষুধে তেমন কাজ হচ্ছে না। তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন ৩০ ডিসেম্বর রাতে গণধর্ষণের শিকার হন। নোয়াখালীর সুবর্ণচরের এই নারী সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, সেই রাতে তাঁর ওপর যে নির্যাতন হয়েছে, তার যন্ত্রণা এখনো বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গত ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) নোয়াখালীতে ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যার ৬৩টি ঘটনায় মামলা হয়েছে থানায়। এর বাইরে যৌন নিপীড়নের মামলা হয়েছে আরও ৪৯টি। ধর্ষণের অন্তত তিনটি ঘটনায় রাজনৈতিকসংশ্লিষ্টতা ছিল। যার দুটি ঘটে সুবর্ণচর উপজেলায়, একটি কবিরহাটে।নির্যাতিতাদের বেশির ভাগই নিম্নমধ্যবিত্ত ও গরিব পরিবারের সদস্য।

 পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের মামলা হয়েছে জুনে। এ মাসে ১৮টি মামলা হয়েছে। এর আগের মাসে ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যা হয় ১১টি। এ ছাড়া এপ্রিলে ১৬, মার্চে ৯, ফেব্রুয়ারিতে ৫টি ও জানুয়ারিতে ৩টি মামলা হয়।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সারা দেশে ৬৩০ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর পুলিশের যে হিসাব পাওয়া যাচ্ছে, তাতে দেখা যাচ্ছে সারা দেশের মোট ধর্ষণের ১০ শতাংশই ঘটেছে নোয়াখালীতে।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা যায়, ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের বেশির ভাগ ঘটনার শিকার হয়েছে শিশু-কিশোরীরা, যারা স্কুল-মাদ্রাসার ছাত্রী। এসব ঘটনায় অর্ধশতাধিক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

ধর্ষণ বাড়ার কারণ জানতে চাইলে জেলা পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, নোয়াখালী তাঁর নতুন কর্মস্থল। এরপরও কিছু কিছু ঘটনার খোঁজ নিতে গিয়ে যেটা মনে হয়েছে, সামাজিক অবক্ষয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যথেচ্ছ ব্যবহার ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এ নিয়ে তিনি শিগগির সচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নেবেন।

জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক বকশিও এ ধরনের অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে সামাজিক অবক্ষয়ের কথা বলেছেন।

রাজনীতিসংশ্লিষ্ট তিন ঘটনা

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটে গত ৩০ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে সুবর্ণচরে। সেখানে স্বামী ও সন্তানদের বেঁধে রেখে চার সন্তানের জননীকে (৪০) ধর্ষণ করে দুর্বৃত্তরা। ওই নারীর অভিযোগ, ৩০ ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচনে তাঁর পছন্দের প্রতীকে ভোট দেওয়ায় উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক (পরে বহিষ্কৃত) রুহুল আমিনের ইন্ধনে তাঁর লোকেরা এই নির্যাতন চালিয়েছেন। পরে ওই ঘটনায় রুহুল আমিনসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ।

এই ঘটনার রেশ না কাটতেই ১৮ জানুয়ারি কবিরহাট উপজেলায় বিএনপি-সমর্থক স্বামী কারাগারে থাকার সুযোগে তিন সন্তানের জননী (২৯) গণধর্ষণের শিকার হন। এ ঘটনায় পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। প্রধান আসামি ওয়ার্ড যুবলীগের নেতা জাকের হোসেন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

নির্যাতনের শিকার নারীর অভিযোগ, ঘটনার পর তিনি থানায় পাঁচজনের নাম বললেও পুলিশ এজাহারে শুধু একজনের (জাকের) নাম উল্লেখ করে মামলা নথিভুক্ত করেছে। বাকি চারজনকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তিনি আদালতে আবেদন জানান। এখনো তাঁরা গ্রেপ্তার হয়নি। উল্টো আসামিদের স্বজনদের হুমকির মুখে ওই নারী বাড়ি ছেড়ে শহরে আশ্রয় নিয়েছেন।

সুবর্ণচরে ধর্ষণের আরেকটি ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া হয় বিভিন্ন মহলে। সেখানে ৩১ মার্চ রাতে স্বামীকে আটকে রেখে ছয় সন্তানের জননীকে (৩৫) গণধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। ওই দিন অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদের ভোটে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করায় প্রতিপক্ষ প্রার্থীর সমর্থকেরা ওই ঘটনা ঘটায় বলে অভিযোগ করেন নির্যাতিত নারী। পরে এ ঘটনায় এজাহারভুক্ত আট আসামিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এক আসামি পরে জামিনে ছাড়া পান।

মামলাটির বাদী ও নির্যাতিত নারীর স্বামী প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ এখনো অভিযোগপত্রও দেয়নি, আসামিরা জামিনে ছাড়া পেয়ে যাচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে পরিবার নিয়ে এলাকায় থাকাও ঝুঁকিপূর্ণ হবে।

শিশু ও ছাত্রী বেশি

গত ৪ মে কোম্পানীগঞ্জে ঝড়ের মধ্যে আম কুড়াতে যাওয়া এক স্কুলছাত্রীকে (১২) ধর্ষণের পর খালের পানিতে চুবিয়ে হত্যার ঘটনা এলাকায় নাড়া দেয়। এর আগে ৩১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় সুবর্ণচরের পূর্ব চরবাটা ইউনিয়নে ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রী (১৩), ১০ মার্চ কোম্পানীগঞ্জের চর কাঁকড়া ইউনিয়নে নবম শ্রেণির ছাত্রী (১৬), ২৭ মার্চ সেনবাগে একটি কমিউনিটি সেন্টারে এক কিশোরী, ৬ এপ্রিল সেনবাগে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী (৯), ১৭ এপ্রিল সেনবাগে স্কুলছাত্রী (১০), ১৮ এপ্রিল একই উপজেলায় সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রী (১৪), ২৭ এপ্রিল সদর উপজেলায় মাদ্রাসার ছাত্রী (১৪), সুবর্ণচরে অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রী (১৪) ধর্ষণের শিকার হয়। বেগমগঞ্জে সাত বছরের এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয় ৩০ মে।

ধর্ষণের কোনো কোনো ঘটনা গ্রাম্য সালিসে মীমাংসার অভিযোগও আছে। গত ১ মার্চ রাতে সুবর্ণচর উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নে এক গৃহবধূকে (২২) ঘরে ঢুকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন স্থানীয় এক ব্যক্তি। ওই রাতেই গ্রাম্য সালিসে অভিযুক্ত আলাউদ্দিনকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করে বিষয়টি চাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়। পরদিন ওই গৃহবধূ বিষপানে আত্মহত্যা করেন।

নোয়াখালী নারী অধিকার জোটের সভাপতি লায়লা পারভিন প্রথম আলোকে বলেন, একটা ঘটনার রেশ না কাটতেই আরেকটা ঘটনা ঘটছে। বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনায় এলাকায় সালিস বন্ধ করা খুব জরুরি।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন