পথশিশুদের 'আলোর ঠিকানা'

বগুড়া শহরের এডওয়ার্ড পার্কে পথশিশুদের পাঠদান করাচ্ছেন আহসান হাবিব ও তাঁর বন্ধুরা। সম্প্রতি তোলা ছবি l প্রথম আলো
বগুড়া শহরের এডওয়ার্ড পার্কে পথশিশুদের পাঠদান করাচ্ছেন আহসান হাবিব ও তাঁর বন্ধুরা। সম্প্রতি তোলা ছবি l প্রথম আলো

সাতসকালেই বিনোদন পার্কে ভিক্ষায় নামত একদল পথশিশু। দর্শনার্থী দেখলেই ভিক্ষার জন্য পা জড়িয়ে ধরত। আরেক দল পার্কে-ফুটপাতে দিনভর পলিথিন কুড়াত। পার্ক-সংলগ্ন ওয়ার্কশপ, গ্যারেজ ও দোকানে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করত কেউ কেউ। কেউ কেউ আবার মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়েছিল।
বস্তির সুবিধাবঞ্চিত এই পথশিশুর দল এখনো পার্কে আসে। তবে ভিক্ষা, পলিথিন কুড়ানো বা বাদাম-চকলেট ফেরির জন্য নয়; তারা আসে বই-খাতা-কলম নিয়ে। আসে পার্কের ভাসমান পাঠশালায় পড়াশোনা করতে। বগুড়া শহরের অ্যাডওয়ার্ড পার্কের (পৌর পার্ক) এই ভাসমান পাঠশালা এখন পাশের রেলবস্তির ছিন্নমূল অর্ধশত পথশিশুর ‘আলোর ঠিকানা’।
আলোর ঠিকানার উদ্যোক্তা বগুড়ার একটি বেসরকারি পলিটেকনিক কলেজের শিক্ষার্থী আহসান হাবিব। তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন আরও ১৫ জন কলেজশিক্ষার্থী। তাঁরা বস্তির শিশুদের পাঠদানের পাশাপাশি বিনা মূল্যে দিচ্ছেন বই-খাতা, কলম-পেনসিল। পড়াশোনায় উৎসাহিত করতে শিশুদের প্রতিদিন দিচ্ছেন চকলেট-নাশতা। তাঁদের উদ্যোগে সাড়া দিয়ে ইতিমধ্যে ১২ জন ঝরে পড়া শিশু নিজ নিজ বিদ্যালয়ে ফিরেছে। মাদক ছেড়েছে দুজন। ভিক্ষা ছেড়েছে পাঁচজন।
শুরু যেভাবে: বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার নান্দুরা গ্রামের এক কৃষকের সন্তান আহসান হাবিব। পড়াশোনা করেছেন আটমূল উচ্চবিদ্যালয়ে। স্কুলজীবন থেকেই শীতবস্ত্র সংগ্রহ, রক্তদানের মতো মানবিক কাজে সামনের সারিতে ছিলেন। এসএসসি পাসের পর ভর্তি হন বগুড়ার বেসরকারি একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিষয়ে। সারা দিন মেসে থাকতে ভালো লাগত না। বিকেলে শহরের অ্যাডওয়ার্ড পার্কে ঘুরতে আসতেন। দেখতেন, পার্কে ছোট ছোট শিশুরা ভিক্ষা করছে। এসব শিশুর সঙ্গে কথা বলতেন আহসান।
আহসান বলেন, ‘পার্কে ঘুরতে এসে আমি ভিক্ষুক শিশুদের সঙ্গে কথা বলতাম। প্রত্যেকের সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতাম। শিশুদের কষ্টের কথা শুনে মনটা খারাপ হতো। ওদের জন্য কিছু একটা করার কথা ভাবলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম, এদের আলোর পথে ফেরাতে পার্কে ভাসমান পাঠশালা খুলব। বন্ধুদের সঙ্গে কথা বললাম। সবাই উৎসাহ দিল। এ উদ্যোগে সঙ্গে থাকার কথা জানালেন সরকারি আজিজুল হক কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের ছাত্র ওমর ফারুক। কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ছাত্র নাজমুল সোহাগের সঙ্গে পরিচয় হলো ফেসবুকে। পাঠশালা চালুর আগে তিনজন মিলে বস্তি ঘুরে ঘুরে পথশিশুদের নানা তথ্য নিলাম। ৫০ জন শিশু নিয়ে গত জুনে পাঠশালা চালু করলাম। পার্কে দর্শনার্থীদের বিশ্রাম ছাউনিতে শিশুদের পাঠদান শুরু করলাম।’
শুরুতেই সমস্যা অর্থ: পথশিশুদের ভাসমান পাঠশালার অন্যতম উদ্যোক্তা ওমর ফারুক বলেন, তিনজনই ছাত্র। পাঠশালা চালানোর অভিজ্ঞতা নেই কারও। পাঠশালা চালাতে নানা উপকরণ দরকার। নিজেরা কিছু টাকা তুললেও ৫০ জন শিক্ষার্থীর উপকরণ কেনার জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। সমস্যার সমাধান দিল ফেসবুক। আহসান তাঁর ফেসবুকে পাঠশালার সমস্যা নিয়ে লেখা পোস্ট করলেন। সহযোগিতার হাত বাড়ালেন অনেকে। তাঁরা সবাই মিলে লেগে পড়েন পথশিশুদের আলোকিত করার কাজে।
আনন্দঘন পাঠশালা: সম্প্রতি পথশিশুদের ভাসমান পাঠশালায় গিয়ে দেখা গেছে, পার্কের বিশ্রাম ছাউনির ভেতরে গোল হয়ে বসেছে ৪৩ জন পথশিশু। একপাশে হোয়াইটবোর্ডে মার্কার কলমে ছবি এঁকে পাঠদান করাচ্ছেন আহসান। তাঁকে সহযোগিতা করছেন অন্যরা। পাঠশালার পাঠদান কৌশলও বেশ বৈচিত্র্যময়। শিশুদের বর্ণমালার সঙ্গে পরিচয় করানো হচ্ছে গল্প বলে, ছবি এঁকে এবং অভিনয় করে।
আহসান হাবিব জানান, পাঠশালায় শিক্ষার্থী ৫০ জন হলেও নিয়মিত উপস্থিত থাকে গড়ে ৪০-৪৫ জন। সপ্তাহে বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার পালা করে তাঁরা ছয়জন পাঠদান করান। অন্যরা শিশুদের নিয়ন্ত্রণসহ নাশতা বিতরণে সহযোগিতা করে।
ভিক্ষা ছেড়ে পাঠশালায়: পার্কে সারা দিন ভিক্ষা করত রেলবস্তির বিপ্লব, আরজিনা, আলম, বৃষ্টির মতো অনেক শিশু। এসব শিশুকে ভিক্ষাবৃত্তি থেকে ফিরিয়েছেন পাঠশালার উদ্যোক্তারা।
উদ্যোক্তারা জানান, শহরের কলোনি এলাকার মাতৃ-পিতৃহীন বস্তির শিশু নুরুন্নবী বিদ্যালয় ছেড়েছে অনেক আগে। দিনভর পার্কে বাদাম ফেরি করে ছোট বোনের পড়াশোনার খরচ চালায় সে। সেই নুরুন্নবী এখন বিকেল হলেই পাঠশালায় আসে।
বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ সামস-উল-আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মানুষ যদি মানুষের কল্যাণেই না আসতে পারে, তবে জীবনের সার্থকতা কোথায়? একদল শিক্ষার্থী নিজেরা পড়াশোনা করতে এসে বস্তির পথশিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করছে। এভাবে সবাই ভালো কাজে এগিয়ে এলে দেশ সামনে এগিয়ে যাবে, গোটা জাতি আলোকিত হবে।’