default-image

বাংলাদেশের সব থেকে বড় পাইকারি পাঞ্জাবির বাজার সদরঘাটের শরীফ মার্কেট। আটতলা ভবনের পুরোটা জুড়ে আছে পাঞ্জাবির দোকান। দোকানের সংখ্যা ৩৭০। গত বছরের লকডাউনে ঈদের আগেও ব্যবসায়ীদের দোকানপাট বন্ধ ছিল। ব্যবসা-বাণিজ্য কিছুই করতে পারেননি তাঁরা। গত বছরের ব্যবসার ক্ষত মেটাতে ধারদেনা করে আবার ব্যবসা গুছিয়ে আনার চেষ্টায় ছিলেন। ঈদের আগে প্রত্যেক দোকানি বাহারি সব পাঞ্জাবি তুলে কেবল বিক্রি শুরু করেছিলেন। এর মধ্যেই আবার করোনার প্রকোপ বেড়ে গেলে বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার।


এখন মার্কেট খোলা, তবে ক্রেতা নেই। কারণ, দূরপাল্লার যান চলাচল বন্ধ। সারা দেশের খুচরা বিক্রেতারা কেউই আসতে পারছেন না। অথচ পাঞ্জাবি ব্যবসায়ীরা সারা বছরজুড়ে রমজান মাসের অপেক্ষায় থাকেন। তাঁদের মূল বেচাকেনা হয় শবে বরাতের পর থেকে ঈদের আগের (চাঁদরাত) রাত পর্যন্ত। এই বিক্রির টাকা হাতে পেয়ে পাঞ্জাবি ব্যবসায়ীরা পাওনাদারের টাকা দেন। আগামীকাল বুধবার থেকে বিধিনিষেধ আরও কঠোর হচ্ছে, মার্কেট বন্ধ রাখতে হবে। এই খবর পাওয়ার পর থেকে পাঞ্জাবি ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত। কীভাবে ব্যাংকের ঋণ শোধ দেবেন, কীভাবে কর্মচারীদের বেতন দেবেন, যাঁদের কাছ থেকে পাঞ্জাবি কিনেছেন, তাঁদের বিল কীভাবে শোধ দেবেন—এসব নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁদের। এই পাঞ্জাবি উৎপাদনের সঙ্গেও যুক্ত কয়েক হাজার মানুষ। বিষণ্ন সময় কাটছে তাঁদের সবার।

বিজ্ঞাপন

শরীফ মার্কেটের পাঞ্জাবি ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এল বি গার্মেন্টসের মালিক লুৎফর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা চরম বিপদে। গত বছরে ঈদের আগে একটা টাকার ব্যবসা করতে পারিনি। যাদের কাছ থেকে আমরা পাঞ্জাবি কিনেছিলাম, তাদের বিলও ঠিকমতো শোধ দিতে পারিনি। ব্যাংক লোন তো বেড়েই চলেছে। তাই আমরা ভেবেছিলাম, এবারের ঈদে পাঞ্জাবি বিক্রি করে গত বছরের ক্ষতিটা পুষিয়ে নেব। তাই আবার ধারদেনা করে পাঞ্জাবি তুলেছি দোকানে। তখনই শুরু হলো লকডাউন। দূরপাল্লার গাড়ি চলে না। ঢাকার বাইরে থেকে কোনো ক্রেতা আসতে পারছেন না। আবার ১৪ এপ্রিল দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় আমরা কীভাবে চলব, কীভাবে কী করব, তা ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছি না।’

default-image

বাড়ি বন্ধক রেখে...

ব্যবসায় লাভ-ক্ষতি আছে, এটা জেনে ব্যবসায় নামেন উদ্যোক্তারা। কিন্তু দেশে করোনার প্রকোপ শুরুর পর টানা ৬৬ দিনের লকডাউনে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ ছিল। এত দীর্ঘ সময় দোকানপাট বন্ধ থাকায় চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন ব্যবসায়ীরা।
রুহুল আমিন ৩০ বছর ধরে পাঞ্জাবির পাইকারির ব্যবসা করে সংসার চালিয়ে আসছেন। করোনায় লকডাউনে গত বছরের ঈদে কোনো ব্যবসা করতে পারেননি।

এতে করে আর্থিক চাপে পড়েন তিনি। তবে একজন পেশাদার ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি মনে করেছিলেন, এ বছরে ভালো বেচাকেনা করে গত বছরের ক্ষতিটা পুষিয়ে নেবেন।

তাই নিজের বাড়ি বন্ধক রেখে দুই কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন। ঈদ সামনে রেখে বিপুল পরিমাণ পাঞ্জাবি দোকানে তুলেছেন। সরকারি বিধিনিষেধ শুরুর আগে আগে বেচাকেনা কেবল জমে উঠেছিল। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের খুচরা ব্যবসায়ীরা কেবল আসতে শুরু করেছিলেন। অর্ডারও পাচ্ছিলেন বেশ। এর মধ্যেই সরকারি বিধিনিষেধে দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। এখন ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছেন না, কীভাবে ব্যাংক লোন শোধ দেবেন, কীভাবে অন্যদের পাওনা মেটাবেন।

নিজের দোকানে বসে ব্যবসায়ী রুহুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত বছরের লকডাউনে ব্যবসা ছিল না, মার খেলাম। আবার ব্যাংকঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করি।

default-image

বাড়িটা পর্যন্ত বন্ধক দিলাম। অনেক আশা করেছিলাম, এবারের ঈদে ব্যবসা করে গত বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নেব। কিন্তু পাঞ্জাবি উঠিয়ে কেবল বিক্রি শুরু করছি, তখনই এল লকডাউন। আমাদের এ সেক্টরের সঙ্গে এমন লোক জড়িত আছে, যারা দুই বেলা ভাত জোটাতে হিমশিম খায়। ছারপোকার কামড় খায়। আমরা তো পাঞ্জাবি বিক্রি করতে পারছি না। তাদের কীভাবে পয়সা দেব? আমরা কোথায় যাব? আমি দিশেহারা। ব্যাংক লোন শোধ না দিতে পারলে আমার বাড়িটাও তো ব্যাংক নিয়ে নেবে। ব্যাংক তো আমাকে ছাড় দেবে না।’

কয়েকটি পর্যায় পার হয়ে একটি বাহারি পাঞ্জাবি উৎপাদন হয়। পাঞ্জাবি ব্যবসায়ীদের ভাষায়, হাতে করে যারা পাঞ্জাবির নকশা করেন, তাকে ডাকা হয় ফুলওয়ালা। আবার কম্পিউটারেও পাঞ্জাবির নকশা হয়। পাঞ্জাবি তৈরির দরজিদের বলা হয় ‘কারিগর’।

ছোট ছোট স্থানীয় গার্মেন্টস কারখানা থেকে পাঞ্জাবি কেনেন পাঞ্জাবি ব্যবসায়ীরা। ঈদের আগে বেচাকেনা শেষ করে ব্যবসায়ীরা এই গার্মেন্টস কারখানার পাওনা মেটান।

ছোট গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে কয়েক হাজার মানুষ যুক্ত। গত বছরেও তাঁদের কোনো ব্যবসা ছিল না। এ বছর অনেক কষ্টে পাঞ্জাবি তৈরি করে তা বিক্রি করেছেন পাইকারি পাঞ্জাবি ব্যবসায়ীদের কাছে। লকডাউনে বেচাকেনা না থাকায় কারখানার পাওনা টাকা দিতে পারছেন না পাঞ্জাবি ব্যবসায়ীরা। এতে করে ছোট কারখানার পাঞ্জাবি উৎপাদনকারীরাও আছেন চরম উদ্বেগে। তাঁদেরও হতাশা ঘিরে ধরেছে।

বিজ্ঞাপন

পাঞ্জাবি উৎপাদনকারী শান গার্মেন্টসের মালিক আবু তাহের প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার কারখানায় কর্মচারী আছেন ১৪ জন। পাঞ্জাবি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আমরা চুক্তিতে কাজ করি। সারা বছর আমরা পাঞ্জাবি বানাই। ঈদের আগে পাঞ্জাবি ব্যবসায়ীরা পুরো টাকা শোধ করেন। লকডাউনে গত বছরে আমার স্টাফদের পুরো বেতন দিতে পারিনি। এবারও স্টাফদের দিয়ে কাজ করিয়েছি। কিন্তু তাঁদের বেতন দিতে পারিনি।

আবার লকডাউন শুরু হয়েছে। পাঞ্জাবির শোরুমের মালিকেরা যদি পাঞ্জাবি বিক্রি করতে না পারেন, তাহলে আমরা কীভাবে তাঁদের কাছ থেকে টাকা চাব। তাঁরা গতবারের টাকা আটকিয়ে রেখেছে। এবারও আশা দেখছি না। আমাদের পথে বসা ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই।’

পাঞ্জাবি ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকার যেন ঈদের আগে কিছুদিনের জন্য হলেও তাঁদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকান খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন