default-image

সরকারি চাকরি থেকে ‘পদত্যাগ’ করলে চাকরি বাজেয়াপ্ত হবে (পেনশন সুবিধা না পাওয়াসংক্রান্ত)—বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসের (বিএসআর) এ–সংক্রান্ত বিধির অংশবিশেষ অসাংবিধানিক ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে আজ বৃহস্পতিবার এ রায় দেন। রিটকারী আইনজীবী বলছেন, এই রায়ের ফলে স্বেচ্ছায় কেউ পদত্যাগ করলে চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী পেনশনসহ চাকরির অন্যান্য সুবিধা পাবেন।

সরকারি চাকরির ১৯ বছরের মাথায় স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করার পর পেনশন সুবিধা না পেয়ে সার্ভিস রুলসের ৩০০ বিধির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করেন মো. মাহবুব মোরশেদ। তিনি অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত জেলা জজ। পাঁচ বছর আগে ওই রিট করেন তিনি। মাহবুব মোরশেদ বর্তমানে পেশায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী।
মাহবুব মোরশেদ প্রথম আলোকে বলেন, রায়ের ফলে প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মকর্তা–কমর্চারী যদি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন, তাহলে বিএসআরের ওই বিধি অনুসারে তাঁর চাকরি বাজেয়াপ্ত বলে গণ্য হবে না। স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে পদত্যাগ করলে পেনশন সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে ৩০০ বিধি অন্তরায় ছিল। বিধিতে থাকা ‘পদত্যাগের কারণে চাকরি বাজেয়াপ্ত’ বিষয়টি অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। ফলে স্বেচ্ছায় কেউ পদত্যাগ করলে চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী পেনশনসহ চাকরির অন্যান্য সুবিধা পাবেন।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, মাহবুব মোরশেদ সহকারী জজ হিসেবে ১৯৯১ সালের ১১ ডিসেম্বর চাকরিতে যোগ দেন। তিনি ২০১১ সালে স্বেচ্ছায় পদত্যাগপত্র জমা দেন। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে ওই বছরের ৩১ জানুয়ারি থেকে তাঁর ইস্তফাপত্রটি কার্যকর হয়।

বিজ্ঞাপন

পরে এককালীন পেনশন ও আনুতোষিক মঞ্জুরের জন্য মাহবুব মোরশেদ আইন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। ওই আবেদন মঞ্জুর হয়েছে জানিয়ে মাহবুব মোরশেদ যাতে স্বল্প সময়ের মধ্যে এককালীন আনুতোষিক পেতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ২০১৫ সালে প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা বরাবর চিঠি পাঠান। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ২৫ মার্চ প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে মাহবুব মোরশেদের পেনশন–সংক্রান্ত কেসটি ফেরত দিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে ওই বিষয়ে চিঠি পাঠানো হয়।

ওই চিঠিতে বলা হয়, সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করলে আগের চাকরিকাল বাজেয়াপ্ত (চাকরি নেই) হবে অর্থাৎ পেনশনের জন্য গণনাযোগ্য হবে না (বিএসআর প্রথম খণ্ডের বিধি–৩০০ সেকশন–৩)। আলোচ্য ক্ষেত্রে পেনশনারের (মাহবুব মোরশেদ) চাকরিকাল ২৫ বছর পূর্ণ হয়নি। তিনি ২৫ বছর পূর্তি সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট বিধানের আলোকে পেনশনের জন্য কোনো আবেদন করেননি বলে পেনশনপ্রাপ্ত নন (১৯৭৪ সালের গণ কর্মচারী অবসর আইনের ৯ ধারা)।

এ অবস্থায় বিধি–৩০০ ও ওই চিঠির বৈধতা চ্যালেঞ্জে করে মাহবুব মোরশেদ ২০১৬ সালে হাইকোর্টে রিট করেন। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০১৬ সালের ৮ মে হাইকোর্ট রুল দেন। রুলে বিএসআর প্রথম খণ্ডের ৩০০ বিধি কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না এবং ওই চিঠি (২০১৫ সালের ২৫ মার্চ) কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, রুলে তা জানতে চাওয়া হয়। এই রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে আজ রায় দেওয়া হয়।

আদালতে রিটের পক্ষে আবেদনকারী মো. মাহবুব মোরশেদ নিজেই শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ সাইফুজ্জামান, সঙ্গে ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল অবন্তী নূরুল।

রায়ের পর ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ সাইফুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে কেউ স্বেচ্ছায় অবসর নিলে বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসের ৩০০ বিধি অনুসারে চাকরি বাজেয়াপ্ত হওয়ায় কেউ পেনশন সুবিধা পেতেন না। পদত্যাগ করলে তাঁর চাকরি বাজেয়াপ্ত হবে—বিধির এই অংশটুকু হাইকোর্ট অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছেন। আলোচনা করে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

পদত্যাগ ও চাকরি থেকে বরখাস্তসংক্রান্ত বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসের বিধি–৩০০ (এ) বলছে, সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করলে অথবা অসদাচরণ, দেউলিয়া, বয়সের কারণ ব্যতীত অদক্ষতা অথবা নির্ধারিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারার কারণে চাকরি হতে বরখাস্ত বা অপসারণ করা হলে আগের চাকরি বাজেয়াপ্ত হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২০১৫ সালের এক প্রজ্ঞাপনে সরকারি কর্মচারীদের পেনশনযোগ্য চাকরিকাল ও পেনশনের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। এতে পেনশনযোগ্য চাকরিকাল প্রচলিত ১০–২৫ বছরের স্থলে ৫–২৫ বছর এবং পেনশনের হার উল্লেখ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন