সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, টোল আদায়ের প্রস্তুতি নিতে এ মাসের শুরুর দিকে কেইসি ও এমবিইসিকে চিঠি দিয়েছে সেতু বিভাগ। সরকারি সংস্থাটি বলেছে, ৩০ জুনের মধ্যে পদ্মা সেতু চালু করার সিদ্ধান্ত রয়েছে সরকারের। ১ জুলাই থেকে টোল আদায় শুরু হতে পারে। সেভাবেই তাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। এই চিঠি পেয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টোল আদায়সংক্রান্ত সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার কিনতে দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন কোম্পানিকে ইতিমধ্যে ফরমাশ দিয়েছে।

সেতু বিভাগের যুগ্ম সচিব রাহিমা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, পদ্মা সেতুর টোলহার নিয়ে একটা প্রস্তাব তাঁরা তৈরি করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য এ মাসে অথবা আগামী মাসে সারসংক্ষেপ পাঠানো হবে।

সেতু বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, মাস ছয়েক আগে পদ্মা সেতুর জন্য টোলহারের ওই প্রস্তাব তৈরি করেছে সেতু বিভাগের একটি কমিটি। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেলেই প্রজ্ঞাপন দেবে সেতু বিভাগ। খসড়া যে টোল নির্ধারণ করা হয়েছে, তা কমানোর সম্ভাবনা কম। প্রধানমন্ত্রী তা অনুমোদন দেবেন বলে সরকারের নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন।

প্রস্তাবিত টোলহার

পদ্মা সেতুর (মূল সেতু) দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। ভায়াডাক্ট (দুই প্রান্তের উড়ালপথ) ৩ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার। সব মিলিয়ে সেতুর দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু সেতুর দৈর্ঘ্য প্রায় ৫ কিলোমিটার। বঙ্গবন্ধু সেতুতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। ১৯৯৮ সালে বঙ্গবন্ধু সেতু চালুর সময় টোলের হার ছিল বেশ কম। ২০১১ সালে এবং সর্বশেষ গত বছর টোল বাড়ানো হয়েছে। পদ্মা সেতুর প্রস্তাবিত টোলহার বঙ্গবন্ধু সেতুর প্রায় দ্বিগুণ।

বর্তমানে পদ্মা নদী পার হতে ফেরিতে যানবাহনভেদে ভাড়া দিতে হয় ৭০ থেকে ৩ হাজার ৯৪০ টাকা। প্রস্তাব অনুসারে পদ্মা সেতুতে যানবাহনভেদে টোল দিতে হবে ১০০ থেকে ৬ হাজার টাকার বেশি। এর মধ্যে কার ও জিপের টোল ৭৫০ টাকা (ফেরিতে ৫০০ টাকা), বড় বাসে ২ হাজার ৪০০ টাকা (ফেরিতে ১ হাজার ৫৮০ টাকা), মাঝারি ট্রাকে ২ হাজার ৮০০ টাকা (ফেরিতে ১ হাজার ৮৫০ টাকা)।

মালবাহী ট্রেইলারের (চার এক্সেল) ভাড়া ফেরিতে নির্ধারণ করা নেই। বঙ্গবন্ধু সেতুতে এই শ্রেণির ট্রেইলারের টোল তিন হাজার টাকা। পদ্মা সেতুতে তা ৬ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।

সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত টোলহার সেতু চালুর ১৫ বছরের জন্য প্রযোজ্য হবে। প্রতি ১৫ বছর পরপর টোলের হার ১০ শতাংশ করে বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

পদ্মা সেতু দিয়ে কত যানবাহন চলাচল করবে—এর পূর্বাভাস আগেই ঠিক করা হয়েছে। ওই পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২১ সালে সেতু চালুর হিসেবে দিনে প্রায় ৮ হাজার যানবাহন চলাচল করার কথা ছিল। ৩৫ বছর পর যানবাহনের সংখ্যা দিনে ৭১ হাজার ছাড়িয়ে যাবে।

আয় থেকে ঋণের টাকা পরিশোধ

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হলেও এর ব্যয়ের টাকা ঋণ হিসেবে সেতু কর্তৃপক্ষকে দিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়। পদ্মা সেতুর নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা সেতু কর্তৃপক্ষ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ নিজেদের আয়ে চলবে প্রতিষ্ঠানটি। পদ্মা সেতুর জন্য নেওয়া ঋণ ১ শতাংশ সুদসহ ৩৫ বছরে ফেরত দিতে হবে সেতু কর্তৃপক্ষকে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু করার উল্লেখ রয়েছে।

সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এই চুক্তি কিছুটা সংশোধন করা লাগবে। ২০২০ সালে সেতু চালু হবে ধরে নিয়ে চুক্তি হয়েছিল। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া সব ঋণ ফেরত দিতে হবে না—এমন একটা সিদ্ধান্ত আছে সরকারের। পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রেও এমনটা চাইছে সেতু বিভাগ। এ ছাড়া প্রকল্পের টাকায় কেনা জমি সেনাবাহিনীসহ অন্য সংস্থাকে দেওয়া হয়েছে। এই ব্যয়ও বাদ দেওয়ার পক্ষে সেতু বিভাগ।

এখন পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাপান সরকারের ঋণ মওকুফ তহবিলের অর্থ ৩০০ কোটি টাকা। এই অর্থ পরিশোধ করতে হবে না। ফলে প্রায় ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা অর্থ মন্ত্রণালয়কে ফেরত দিতে হবে। এর সঙ্গে বাড়তি ১ শতাংশ হারে সুদ ধরলে মোট পরিশোধ করতে হবে ৩৬ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের টাকায় সেতুতে রেল চলাচলের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সেতুর পাশে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন বসানোর জন্য যে ভিত্তি তৈরি হয়েছে, তা–ও পদ্মা সেতু প্রকল্পের টাকায়। রেল চলাচলের জন্য বছরে টোল ধার্য করা হবে। তবে এখনো টোলের পরিমাণ ঠিক হয়নি। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের লাইনের জন্য কত টোল পাওয়া যাবে, সেটাও চূড়ান্ত করা হয়নি।

বঙ্গবন্ধু সেতুতে রেল চলাচলের জন্য বছরে ১ কোটি টাকা টোল পায় সেতু বিভাগ। এর বাইরে অন্যান্য সেবা সংস্থা থেকেও টোল আদায় করা হয়।

টোলের টাকা কীভাবে ব্যয় হবে

সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, চুক্তি অনুসারে প্রথম বছরই সেতু বিভাগকে ৬০০ কোটি টাকা কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। এই সময়ে টোল থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। আয় থেকে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে। টোল আদায়ের জন্য ঠিকাদারের পেছনে বছরে ব্যয় হবে ১০০ কোটি টাকার বেশি। ফলে শুরুতে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হবে।

বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মিত হয়েছিল বিশ্বব্যাংকসহ বহুজাতিক ঋণদান সংস্থার অর্থায়নে। সেতু চালুর ১০ বছর পর্যন্ত ঋণের কিস্তি দিতে হয়নি। এ সময়টা ছিল গ্রেস পিরিয়ড। ১৯৯৮ সালে সেতুটি চালুর পরবর্তী ১০ বছরে যানবাহনের সংখ্যা ধারণার চেয়েও বেড়ে যায়। ফলে আয় বৃদ্ধি পায়। ঋণের কিস্তি পরিশোধে কোনো সমস্যা হয়নি।

সেতু বিভাগ সূত্র বলছে, পূর্বাভাস অনুযায়ী পদ্মা সেতুতে যানবাহন চলাচল বাড়বে। সে ক্ষেত্রে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করে এই সেতু থেকে মুনাফা করা সম্ভব।

৭ এপ্রিল সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের বলেছিলেন, পদ্মা সেতু থেকে পূর্ণমাত্রায় টোল আদায় করা হবে। শুধু টোল আদায় হবে না, এ সেতু থেকে মুনাফাও হবে। এ প্রকল্পের জন্য যে পরিমাণ খরচ হয়েছে, তার চেয়ে বেশি অর্জন করা হবে। সারা বিশ্ব তা–ই করে।

সড়কেও টোল লাগবে

পদ্মা সেতুর বাইরে ঢাকার পোস্তগোলা বা বাবুবাজার থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে (ছয় লেনের দ্রুতগতির সড়ক) ব্যবহারের জন্যও টোল দিতে হবে। আগামী জুলাই থেকে টোল চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই সড়কের নিয়ন্ত্রক সংস্থা সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর।

সওজ সূত্র জানায়, পরিকল্পনা অনুযায়ী এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহারের জন্য একটি বাসে প্রতি কিলোমিটারে ৯ টাকা হারে টোল দিতে হবে। মাঝারি একটি ট্রাকের টোল হবে প্রতি কিলোমিটারে ১০ টাকা। এ ক্ষেত্রে পোস্তগোলা, কেরানীগঞ্জে ধলেশ্বরী নদীতে দুটি সেতুসহ বাকি সেতুতে আলাদা টোল নেওয়া হবে না। বর্তমানে এই পথে তিনটি সেতুর জন্য একটি বড় বাসে গড়ে ২০০ টাকা টোল দিতে হয়।

ঢাকা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ের দূরত্ব ৫৫ কিলোমিটার। সে হিসাবে প্রতিটি বাসে ৪৯৫ এবং ট্রাকে সাড়ে ৫০০ টাকা টোল দিতে হবে। তবে এই টোলহার আরও বাড়ানোর চিন্তা রয়েছে সওজের। এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে খরচ হয়েছে ১১ হাজার ৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

পদ্মা সেতু চালু হলে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৯টি জেলা সরাসরি সারা দেশের সঙ্গে যুক্ত হবে। ঢাকা-ভাঙ্গা যাতায়াতের সময় কমে এক ঘণ্টায় নেমে আসবে বলে সওজের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান প্রথম আলোকে বলেন, পদ্মা সেতু চালু হলে ওই পথে যাতায়াতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। কম সময়ে যাতায়াত করার কারণে যানবাহনের জ্বালানি খরচ কমে যাবে। জাতীয় অর্থনীতিতে গতি আসবে। ব্যবসায়ী হিসেবে এই দিকগুলোকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন। তবে সেতু ও সড়কের টোল যতটা সম্ভব সরকার কম রাখবে বলে আশা করছেন তিনি। কারণ, এই সড়ক ও সেতু সব শ্রেণির মানুষই ব্যবহার করবে।