এর মধ্যে ৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ পদ্মা সেতু চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। এরপর গত বৃহস্পতিবার সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রত্যাশা করে আছি, এ বছরের শেষ নাগাদ এটি চালু করতে পারব। আমাদের অর্থবছর শেষ হবে জুন মাসে। আমরা বিশ্বাস করি, এর মধ্যে এটি চালু করতে পারব।’

এরপরই সেতুটি জুনে নাকি আরও পরে চালু হবে—এ নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

গতকাল শুক্রবার সেতু বিভাগের সচিব মো. মনজুর হোসেন ও পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালক মো. শফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা দুজনই জানিয়েছেন, পদ্মা সেতু চালুর বিষয়টি ঠিক করবেন সরকারের নীতনির্ধারকেরা। তাঁরা উচ্চপর্যায়ে কথা বলছেন। তবে কাজ চলছে পরিকল্পনামতোই।

পদ্মা সেতুর কাজ মোটাদাগে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে মূল সেতু, নদীশাসন, সংযোগ সড়ক ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ, ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন। এর মধ্যে মূল সেতু ও নদীশাসন ছাড়া সব কাজ আগেই শেষ হয়েছে।

প্রকল্পের অগ্রগতিসংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুসারে, ৩১ মার্চ পর্যন্ত মূল সেতুর কাজ শেষ হয়েছে ৯৭ শতাংশ। নদীশাসনের কাজের অগ্রগতি ৯০ দশমিক ৫০ শতাংশ। সব মিলিয়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে ৯২ শতাংশ।

default-image

পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজের মেয়াদ আছে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। তবে ঠিকাদারের দেনা-পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া এবং সেতুতে কোনো সমস্যা হলে ঠিকাদার যাতে ঠিক করে দিতে পারেন, এ জন্য শেষ এক বছর রাখা হয়েছে। মূলত আগামী জুনের মধ্যেই মূল সেতু ও নদীশাসনের কাজ শেষ করার বিষয়ে ঠিকাদারদের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

সেতু বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, নদীশাসনের কাজ শেষ করতে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত লেগে যাবে। তবে এর আগে সেতু চালু করা নিয়ে কারিগরি কোনো জটিলতা নেই।

পিচঢালাই শেষ হবে ২৯ মে। মূল সেতুতে বাতি বসানোর কাজ শেষ হবে ২৪ জুন। সব কাজ ৩০ জুনের মধ্যে শেষ করার কথা রয়েছে। ঠিকাদারকেও জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

২০ ধরনের কাজ চলমান

২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর সর্বশেষ স্টিলের স্প্যান জোড়া দেওয়ার পর পদ্মা সেতুতে ভারী কাজ খুব একটা বাকি ছিল না। এরপর সেতুতে ছোট-বড় ২০ ধরনের কাজ ছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল সেতুর প্রান্তে দেয়াল ও মাঝখানে বিভাজক বসানো এবং গ্যাসের পাইপ স্থাপন। এসব কাজ শেষ হয়ে গেছে ফেব্রুয়ারি মাসেই। এরপর বাতি লাগানোর জন্য স্টিলের খুঁটি (ল্যাম্পপোস্ট) বসানো এবং মেরামতকাজের জন্য মনোরেল বসানো—এ দুটি কাজও শেষ হয়েছে। এখন বাকি আছে আরও ১৪ ধরনের কাজ।

সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, ১৪ ধরনের কাজ আবার বড় ও ছোট—এ দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে বড় কাজ বাকি আছে চারটি। বাকি ১০টি ছোট কাজ।

প্রকল্পের নথি থেকে জানা গেছে, চারটি বড় কাজের মধ্যে রয়েছে সেতুর উপরিভাগে পানিনিরোধক স্তর বসানো, মূল সেতু ও ভায়াডাক্টে পিচঢালাই এবং ৪০০ কেভি বিদ্যুতের লাইন নির্মাণ। ৭ এপ্রিল পর্যন্ত পানিনিরোধক স্তর বসানোর কাজ শেষ হয়েছে প্রায় ৮৯ শতাংশ। ১৮ মের মধ্যে এ কাজ শেষ করার কথা। মূল সেতু (নদীর অংশ) ও ভায়াডাক্টে (স্থলভাগ) পিচঢালাইয়ের কাজ চলছে। এখন পর্যন্ত মূল সেতুতে পিচঢালাই হয়েছে ৭৪ শতাংশ এবং ভায়াডাক্টে ৫৬ শতাংশ। আগামী ২৯ মে পিচঢালাইয়ের কাজ শেষ করার কথা।

জুন মাসের মধ্যে মূল সেতুর কাজ শেষ হওয়ার কথা। সেটা শেষ করতে পারা উচিতও। কিছু কিছু ঝামেলা আছে। তবে দেখা যাক, কী হয়।
অধ্যাপক শামীম জেড, পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান

৪০০ কেভি বিদ্যুতের লাইনের কাজটি মূল সেতুর অংশ হলেও এটি সেতু থেকে অনেক দূরে। এর সঙ্গে সেতু চালুর কোনো সম্পর্ক নেই। বরং দক্ষিণাঞ্চল থেকে ঢাকার পথে বিদ্যুৎ সঞ্চালন নিশ্চিত করতে এ লাইন। এ কাজ এগিয়েছে ৮০ শতাংশ। ২২ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা।

default-image

বাকি থাকা ছোট কাজগুলোর মধ্যে কয়েকটি আবার পিচঢালাইয়ের ওপর নির্ভরশীল। যেমন সেতু ও ভায়াডাক্টে সাইন-সংকেত ও মার্কিং বসানো এবং পানিনিষ্কাশনের পাইপ বসানো। এ ছাড়া সেতুর প্রান্তে স্টিলের রেলিং স্থাপন, রেললাইনের পাশে হাঁটার রাস্তা নির্মাণ এবং আর্কিটেকচারাল লাইটিং স্থাপনের কাজ বাকি আছে। এসব কাজের অনেকগুলো এগিয়েছে, কিছু কাজ শুরুই হয়নি। তবে সবগুলোই ৩০ জুনের মধ্যে শেষ করার কথা রয়েছে।

সেতু বিভাগের সূত্র জানায়, এসব কাজের মধ্যে আর্কিটেকচারাল লাইটিংয়ের কাজটি নির্ধারিত সময়ে শেষ করার সম্ভাবনা কম। এটি মূলত দুবাইয়ের বুর্জ আল খলিফা টাওয়ারের মতো করে বিশেষ দিনে সেতুকে আলোকসজ্জিত করার কাজ। এটি করা নিয়ে কিছু কারিগরি জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে এ কাজ না হলেও যানবাহন চালুতে কোনো বাধা নেই।

প্রকল্পের কাজের সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র বলছে, সেতুর প্রান্তে রেলিংয়ে ব্যবহারের জন্য যুক্তরাজ্য থেকে স্টিল আসার কথা। এর জন্য সেতুর কাজ আটকে থাকার কথা নয়। কারণ, চলতি মাস বা আগামী মাসে এলেও রেলিং লাগাতে এক মাসের বেশি সময় লাগবে না। ঠিকাদারকে এর আগে জুন পর্যন্ত সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এখন ঠিকাদারও আর সময় বাড়ানোর পক্ষে নয়। এতে তাদের বাড়তি খরচের বিষয় আছে।

২০০৭ সালে একনেকে পাস হওয়া পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যয় ছিল ১০ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। ২০১১ সালে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে দ্বিতীয় দফা সংশোধনের পর ব্যয় দাঁড়ায় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। বর্তমানে কয়েক দফা সময় বৃদ্ধির পর এখন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। প্রকল্প শেষ হওয়ার আগে আরেক দফা প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন করতে হবে।

সমীক্ষায় এসেছে, পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ হারে জিডিপি বৃদ্ধি পাবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপি বাড়বে ২ দশমিক ৩ শতাংশ। মোংলা বন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে রাজধানী এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের ১৯টি জেলাকে সারা দেশের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করবে এ সেতু। সব মিলিয়ে পদ্মা সেতু অর্থনীতিতে যেমন প্রভাব ফেলবে, তেমনি সহজ হবে মানুষের চলাচলও।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান অধ্যাপক শামীম জেড বসুনিয়া প্রথম আলোকে বলেন, জুন মাসের মধ্যে মূল সেতুর কাজ শেষ হওয়ার কথা। সেটা শেষ করতে পারা উচিতও। কিছু কিছু ঝামেলা আছে। তবে দেখা যাক, কী হয়।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন