default-image

বিগত বছরগুলোর চেয়ে এবার প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে ছিল ভিন্নতা। করোনার কারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কিছুটা ভার্চ্যুয়ালি, কিছুটা ঘরোয়াভাবে হয়েছে আয়োজন। প্রথমবারের মতো সারা দেশের কর্মীদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও জুম অ্যাপের মাধ্যমে অংশ নেন অনুষ্ঠানে। এবার প্রতিষ্ঠানের সব কর্মীকে মিলিতভাবে সেরা ঘোষণা করা হয়। জানানো হয়, সব সময়ের মতো সুখে-দুঃখে কর্মী ও তাঁদের পরিবারের পাশে থাকবে প্রথম আলো।

বুধবার ৪ নভেম্বর ছিল প্রথম আলোর ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এই উপলক্ষে অন্যান্য বছরের মতো সব কর্মী সশরীরে একত্র হননি। প্রথম আলোর সম্পাদকসহ জ্যেষ্ঠ কর্মীরা ভবনের প্রতি তলায় গিয়ে কেক কেটে, সহকর্মীদের সঙ্গে গল্প-হাসিতে মাতেন। সন্ধ্যায় জুম অ্যাপে আলোচনা আর রাতে অনলাইনে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিশেষ অনুষ্ঠান হয়।

সন্ধ্যায় আলোচনা অনুষ্ঠানের শুরুতেই প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ বলেন, কোভিড-১৯ নিয়ে শুরুতে ভয়, অনিশ্চয়তা ছিল। সবাই মিলে কঠিন সময় পার করে এসেছি। তাই প্রতিবছর সেরা কর্মীর পুরস্কার দেওয়া হলেও এবার প্রথম আলোর প্রত্যেক কর্মীই সেরা কর্মী।

গত ১ জুলাই ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান মারা যান। তিনি ছিলেন প্রথম আলোর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান মিডিয়াস্টার লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। অনুষ্ঠানে লতিফুর রহমানের ‘স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা’ জানিয়ে প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়।

বিজ্ঞাপন

ট্রান্সকম লিমিটেডের গ্রুপ সিইও সিমিন রহমান বলেন, ‘প্রতিবছর এই দিনে আমার প্রয়াত বাবা লতিফুর রহমান প্রথম আলো নিয়ে তাঁর আবেগ তুলে ধরতেন। তিনি গণতন্ত্র, বাক্‌স্বাধীনতা, উঁচু মানের সাংবাদিকতায় বিশ্বাসী ছিলেন। প্রথম আলো ছিল লতিফুর রহমানের স্বপ্ন।’

করোনা পরিস্থিতিতেও প্রথম আলোর কর্মীরা দুর্দান্ত কাজ করায় ধন্যবাদ জানিয়ে সিমিন রহমান বলেন, ‘পরিবারের সমর্থন ছাড়া করোনা পরিস্থিতিতে এমন কাজ অসম্ভব। করোনার সময় প্রত্যেক কর্মী এবং তাঁদের পরিবারের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। আগামীতেও চেষ্টা করব। সামনে প্রথম আলোর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখতে পাই।’

দেশে করোনা সংকট শুরুর দিকে মাত্র এক দিনের নোটিশে পুরোপুরি হোম অফিস চালু করে প্রথম আলো। কীভাবে সেই সময় কাজ করেছেন প্রথম আলোর কর্মীরা, তা নিয়ে ‘জেগে আছে, জেগে থাকবে প্রথম আলো’ শিরোনামে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়। প্রামাণ্যচিত্রটির নির্মাতা নিশান মাহমুদ।

default-image

প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘প্রতিদিন লতিফুর রহমানকে নিয়ে কথা বলি, এই দিনেও তাঁর কথা স্মরণ করি। করোনায় যুদ্ধক্ষেত্রের মতো পরিস্থিতি ছিল। সংবাদকর্মীরা সম্মুখ সারিতে থেকেই লড়েছেন। বৃহত্তর পরিবার হিসেবে সংকট কাটাতে পেরেছে প্রথম আলো। প্রত্যেক কর্মী ও তাঁদের পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা।’

প্রথম আলোর ২২ বছরের সাংবাদিকতার ইতিহাস সৎ, সুন্দর, দেশপ্রেমের সাংবাদিকতার ইতিহাস বলে মন্তব্য করেন ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্‌ফুজ আনাম। তিনি বলেন, প্রথম আলো রুচির পরিবর্তন ঘটিয়েছে, সাহসিকতা দেখিয়েছে, সমাজসেবার উদাহরণ তৈরি করেছে, দেশপ্রেমে উদ্বু্দ্ধ করেছে।
প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হক তাঁর বক্তব্যে প্রথম আলোর অগ্রযাত্রায় লতিফুর রহমানের অবদান শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।

ভার্চ্যুয়াল অনুষ্ঠানে ট্রান্সকম লিমিটেডের চেয়ারম্যান শাহনাজ রহমান, মিডিয়াস্টার লিমিটেডের পরিচালক রোকিয়া আফজাল রহমান, সাইফুর রহমান, আতিকুর রহমান এবং আরশাদ ওয়ালিউর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

করোনায় পাশে থাকার গল্প

কাজ করতে গিয়ে প্রথম আলোর ৫৮ জন কর্মী করোনায় আক্রান্ত হন। করোনা জয় করে আবার কাজেও ফিরেছেন। পুরোটা সময় কর্মীদের পাশে ছিল প্রথম আলো। বিভিন্ন স্তরের করোনাজয়ী কর্মী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যরা ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে তাঁদের অনুভূতি তুলে ধরেন।

প্রথম আলোর চট্টগ্রাম অফিসের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক প্রণব বল ও তাঁর স্ত্রী সুমি সরকার করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। তিনি বলেন, প্রথম আলো থেকে সহকর্মীরা নিয়মিত খোঁজ নিয়েছেন। বাসায় খাবার ও ওষুধ পাঠানো হয়েছে। অফিস সহকারী ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘ভয়, আতঙ্কের মধ্যেও কাজ করেছি। একসময় নিজে করোনায় আক্রান্ত হই। সম্পাদক নিজেও ফোন দিয়েছেন, ফলমূল পাঠিয়েছেন।’ রাজবাড়ী প্রতিনিধি রাশেদুল হকের পরিবারের চার সদস্যই করোনা থেকে সুস্থ হয়েছেন। তিনি বলেন, যাদের পরিবারে কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়নি, তারা এর কষ্ট বুঝবে না।

default-image

প্রথম আলোর কর্মীদের মধ্যে প্রথম করোনা ধরা পড়ে বিশেষ বার্তা সম্পাদক শওকত হোসেনের। তাঁর স্ত্রী শামছুন্নাহার বলেন, ‘যখন করোনা ধরা পড়ে, তখন আতঙ্কিত ছিলাম। কিন্তু প্রথম আলো পরিবার পাশে আছে, এটি ভেবেই নিশ্চিন্ত ছিলাম।’ শওকত হোসেনের মেয়ে প্রিয়ন্তী বলে, ‘প্রথম আলোর একজনের সঙ্গে আরেকজনের যে বন্ধন, সেটি সবচেয়ে ভালো লাগে।’

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক শেখ সাবিহা আলম বলেন, ‘করোনায় আক্রান্ত হলেও ভয় পাইনি। প্রতিষ্ঠান পাশে ছিল। প্রতিষ্ঠান পাশে থাকলে অনেক সাহস পাই।’ ফিচার বিভাগের সহসম্পাদক হাসান ইমামের স্ত্রী হুর এ জান্নাত করোনায় আক্রান্ত স্বামীর সঙ্গে হাসপাতালেই ছিলেন। তিনি বলেন, ‘দুজন মিলে করোনার চ্যালেঞ্জিং সময় জয় করেছি, পাশে ছিল প্রথম আলো।’

বিজ্ঞাপন

সুখে-দুঃখের সঙ্গী
প্রথম আলোর পটুয়াখালীর বাউফল প্রতিনিধি এ বি এম মিজানুর রহমানকে সংবাদ প্রকাশের দায়ে মামলা-হামলার শিকার হতে হয়েছে। মিজানুরের স্ত্রী শারমিন সুলতানা বলেন, ভবিষ্যতেও মামলা, নির্যাতনের শিকার হলেও ভয় পাই না। দুঃসময়ে পাশে ছিল প্রথম আলো।

প্রথম আলোর হেড অব কালচার অ্যান্ড এন্টারটেইনমেন্ট মাসুম আলীর স্ত্রী ডেইজি রহমান দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। ডেইজি বলেন, মাসুমের মাথার ওপর প্রথম আলো ছিল বলেই এই দীর্ঘ চিকিৎসা সম্ভব হয়েছে।

অফিস সহকারী আনোয়ার মৃধার মেয়ে আফরিনা আনোয়ার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। আফরিনা বলেন, প্রতিনিয়ত আধুনিক মনোভাব ও সৃজনশীলতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে প্রথম আলো।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর ফিচার সম্পাদক সুমনা শারমীন। তিনি বলেন, পরিবারের সমর্থন না পেলে সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানে কাজ করা সম্ভব নয়।

default-image

বিশেষ অনুষ্ঠান ‘আস্থা রাখি আলোয়’
রাত নয়টায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ফেসবুক, ইউটিউবে (https://youtu.be/Hi1XuSf6T7Y) আয়োজন করা হয় বিশেষ অনুষ্ঠান ‘আস্থা রাখি আলোয়’। অনুষ্ঠানে ট্রান্সকম লিমিটেডের গ্রুপ সিইও সিমিন রহমান বলেন, ‘প্রথম আলো এখন একটি ইনস্টিটিউশন। লতিফুর রহমান বলতেন, “প্রথম আলো ১০০ বছর টিকে থাকবে।” আমরা তাঁর ধারাবাহিকতা ধরে রাখব।’

অনুষ্ঠানে দেখানো হয় প্রামাণ্যচিত্র সাহসিকতার নাম নাঈমা। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কর্মকর্তা নাঈমা সিফাতকে নিয়ে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে এটি বানিয়েছেন রেদওয়ান রনি। এর মাধ্যমে করোনা মোকাবিলার সম্মুখ সারির যোদ্ধাদের সম্মান জানানো হয়। লতিফুর রহমানের স্মরণে স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং জেগে আছে, জেগে থাকবে প্রথম আলো প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়।

প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে ‘আলো আমার আলো’ গান পরিবেশন করেন তুহিন, শোয়েব চৌধুরী, ইমরান, কনা, অবন্তী সিঁথি ও সায়ন্তনী ত্বিষা। সংগীতায়োজন করেন ইমন চৌধুরী। পূজা সেনগুপ্তের পরিচালনায় নৃত্য পরিবেশন করে তুরঙ্গমী।

সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমাদের কথা, “আস্থা রাখি আলোয়”। এই আলো তথ্যের আলো, সত্যের আলো, মানবিকতার ও প্রগতির আলো।’

উপহারের চমক, কেক কেটে উদ্‌যাপন

এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সহকর্মীদের জন্য ছিল নতুন একটি চমক। প্রথম আলোর সব কর্মীর বাসায় পৌঁছে যায় প্রথম আলোর পক্ষ থেকে পাঠানো বিশেষ উপহার। তাতে ছিল ‘সহযাত্রী’ লেখা স্মারক, কৃতজ্ঞতার চিঠি, টি-শার্ট, খাবারদাবার, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্কসহ নানা কিছু।

প্রথম আলোর কর্মীরা সকালে কারওয়ান বাজারে কর্মস্থলে চলে আসেন। পুরুষ সহকর্মীরা পরেন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর টি-শার্ট আর নারী সহকর্মীরা পরে আসেন লাল পাড়ের মেরুন শাড়ি। দিনটি শুরু হয় কেক কাটার মধ্য দিয়ে।
প্রথম আলোর সম্পাদক পর্যায়ক্রমে কারওয়ান বাজারের প্রগতি ইনস্যুরেন্স ভবনে প্রথম আলো কার্যালয় ও পাশের প্রথম আলোর নিজস্ব ভবনের প্রতিটি তলায় যান। সম্পাদক মতিউর রহমানের সঙ্গে ছিলেন বিভিন্ন বিভাগের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিরা। তাঁরা সহকর্মীদের সঙ্গে গল্প করেন, খোঁজখবর নেন, করোনা পরিস্থিতিতে কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান এবং ভবিষ্যতে আরও ভালো কাজ করার অনুপ্রেরণা দেন।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রথম আলোর কর্মীদের জন্য আয়োজন করা হয় ‘প্রথম আলোকে জানুন’ কুইজ প্রতিযোগিতার। এতে ৩৫৫ জন কর্মী অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ২৭ জনকে পুরস্কার দেওয়া হয়।

করোনায় দায়িত্ব পালনে ধন্যবাদ
রাজধানীর বাইরে ৬৩টি জেলার স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায় প্রথম আলো বন্ধুসভা। পাশাপাশি করোনার সময়ে দায়িত্ব পালনের জন্য এসব কর্তৃপক্ষকে প্রথম আলোর সম্পাদকের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়।

দিনভর শুভাকাঙ্ক্ষীদের শুভেচ্ছা
প্রথম আলোর ২২ বছর পূর্তিতে শুভেচ্ছা জানাতে এসেছিল এক্সিম ব্যাংক লিমিটেড, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, এনসিসি ব্যাংক লিমিটেড, ঢাকা ব্যাংক লিমিটেড, প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেড, পদ্মা ব্যাংক লিমিটেড, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড, আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেড, লংকাবাংলা ফাইন্যান্স লিমিটেড, প্রগতি ইনস্যুরেন্স লিমিটেড, প্রাণ–আরএফএল, বিকাশ, টোটাল ক্লাস লিমিটেড, এডিসন গ্রুপ, স্নোটেক্স গ্রুপ, ক্রাউন সিমেন্ট, অপো বাংলাদেশ, জিপিএইচ ইস্পাত, দীপ্ত টিভি, চ্যানেল আই, বাংলাভিশন, নাগরিক টিভি, এনেক্স কমিউনিকেশন, কনসিটো পিআর, প্রচিত, ফোরথট পিআর, ইনফো পাওয়ার পিআর এজেন্সি, বন্ধুসভা, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন এবং ঢাকা সংবাদপত্র হকার্স বহুমুখী সমবায় সমিতি।

মন্তব্য পড়ুন 0