বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী সীমিত সম্পদের প্রেক্ষিতে, অধিক জনসংখ্যাকে দারিদ্র্য ও ক্ষুধার জন্য দায়ী বলে মত প্রকাশ করেছেন এবং উন্নয়নের প্রতিবন্ধক হিসেবেও উল্লেখ করেছেন । ‘অধিক জন–অধ্যুষিত’ বাংলাদেশ এ বিষয় বিবেচনায় নিয়ে শুরু থেকেই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে মূল লক্ষ্য রেখে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু করে। স্বাধীনতা–উত্তর প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায়ও (১৯৭৩-১৯৭৮) অধিক জনসংখ্যাকে উন্নয়নের প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমানোর জন্য দৃঢ় ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়। পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমসংক্রান্ত বিভিন্ন নীতি ও কৌশলপত্র সেই আলোকে প্রণীত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিকে ঢেলে সাজানোর জন্য বেশ কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৭৩ সালে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর গঠন; ম্যালেরিয়া দূরীকরণ কর্মসূচির মাঠকর্মীদের পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্তকরণ; বাড়ি পরিদর্শনভিত্তিক পরিবার পরিকল্পনাসেবা দেওয়ার লক্ষ্যে প্রতি ৬০০ দম্পতির জন্য একজন নারী পরিবারকল্যাণ সহকারী নিয়োগ; জাতীয় জনসংখ্যানীতি প্রণয়ন; গ্রামীণ অঞ্চলে ব্যাপক সেবা অবকাঠামো নির্মাণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্তকরণ উল্লেখযোগ্য।

ছেলে হোক মেয়ে হোক, দুটি সন্তানই যথেষ্ট —এ স্লোগানকে ধারণ করে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি বাংলাদেশে দুটি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে। প্রথমত, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির চাহিদা বৃদ্ধি করা এবং দ্বিতীয়ত দুই সন্তানবিশিষ্ট পরিবারকে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করা। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর নতুন স্লোগান তুলে ধরে—‘দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়’, যা এক সন্তানবিশিষ্ট পরিবার গঠনের ইঙ্গিত দেয়। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, সরকার হয়তো চীনের মতো এক সন্তান নীতির পথে হাঁটছে। কিন্তু ২০১৮ সালে সব অনুমানকে ভুল প্রতীয়মান করে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর তার পূর্ববর্তী দুই সন্তানের স্লোগানে ফিরে যায়। সমসাময়িক কালে চীন সরকারের এক সন্তান নীতি পরিত্যাগের বিষয়টি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে কোনো ভূমিকা রেখেছে কি না, তা জানা না গেলেও সিদ্ধান্ত দুটির সংযোগ রয়েছে, সেটা সহজেই অনুমেয়।

চীন ১৯৮০ সালে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ‘এক সন্তান নীতি’ বাস্তবায়ন শুরু করে এবং প্রায় তিন যুগ ধরে কঠোর জনসংখ্যা নীতি বাস্তবায়নের পর দেশের জনমিতিতে বেশ কিছু অসংগতি পর্যবেক্ষণ করে, যেমন নারী ও পুরুষের অস্বাভাবিক অনুপাত, ছেলেসন্তানের প্রত্যাশায় অতিমাত্রায় গর্ভপাত, মোট জনসংখ্যায় প্রবীণ জনগোষ্ঠীর আধিক্য এবং নির্ভরশীলতা সূচকের বৃদ্ধি। মোট জনসংখ্যায় প্রবীণ জনগোষ্ঠীর আধিক্য বিবেচনায় বিশেষজ্ঞদের অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে চীন প্রকৃত উন্নয়নের আগেই বুড়িয়ে যাবে। ‘এক সন্তান নীতি’ বাস্তবায়নের ফলে এসব আর্থসামাজিক সমস্যার উদ্ভব হয়েছে—এ বিষয় নিশ্চিত হওয়ার পর চীন সরকার ওই নীতি থেকে তাঁদের অবস্থান পরিবর্তন করে। ২০১৬ সালে ‘এক সন্তান নীতি’ বাতিল করে ‘দুই সন্তান নীতি’ এবং পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালে ‘তিন সন্তান নীতি’ বাস্তবায়ন শুরু করে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এক সন্তাননির্ভর পরিবার এবং সমাজব্যবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে পড়া চীনা জনগোষ্ঠী এখন অধিক সন্তান নেওয়ার স্বাধীনতা পেলেও দম্পতিদের গড় সন্তানের সংখ্যা বাড়ছে না–এ বিষয় চীন সরকারকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে এবং তারা একাধিক সন্তান গ্রহণে জনগণকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রণোদনাও ঘোষণা করেছে। চীনা সরকার নিয়মনীতির মারপ্যাঁচে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে—জনসংখ্যা যেন বৈদ্যুতিক পাখার রেগুলেটর, গতি কমালে সন্তানের সংখ্যা কমবে, গতি বাড়ালে সন্তানের সংখ্যা বাড়বে ! মানবাধিকার সংস্থাগুলো এক সন্তান নীতির মতো বর্তমান নীতিকেও মানবাধিকারবিরোধী বলে অভিযোগ তুলছে। তাদের মতে, নাগরিকেরা সন্তান নেবে নিজের ইচ্ছায়, রাষ্ট্রের ইচ্ছা বা প্রয়োজন বিবেচনায় নয়। বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে দম্পতিদের সন্তান নেওয়ার চাহিদা কমে গেছে, তাঁদের গড় সন্তানের চাহিদা ১ দশমিক ৭ জন। বিষয়টি নিয়ে আমাদেরও গভীরভাবে ভাবার অবকাশ রয়েছে। একটা সময় ছিল, যখন মানুষের অধিক সন্তানের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও সরকার কম সন্তানের বিষয়ে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ‘ছেলে হোক মেয়ে হোক, দুটি সন্তানই যথেষ্ট’ স্লোগানে নতুন করে ফিরে আসার অর্থ হলো জনগণ দুইয়ের নিচে সন্তান চাইলেও সরকার দুই সন্তানবিশিষ্ট পরিবারে আগ্রহী। পরিবারপ্রতি গড় সন্তানের সংখ্যা দুইয়ের নিচে নেমে গেলে জনমিতিক ভারসাম্যহীনতার আশঙ্কায় এবং দেশের সার্বিক কল্যাণের স্বার্থে সরকার পরিবারপ্রতি দুই সন্তানের বিষয়ে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে চায়।

দেশের যেকোনো উন্নয়ন কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য জনকল্যাণ। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে পরিচালিত ও বাস্তবায়িত পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির সফলতা বিবেচনায় নিয়ে জনসংখ্যা কর্মসূচির অনুষঙ্গ হিসেবে জনকল্যাণ যে নিশ্চিত হয়েছে—এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা কমবেশি একমত। পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বাস্তবায়িত সব কার্যক্রমের পরোক্ষ সুফল হলো মাতৃমৃত্যু হ্রাস। কম সন্তান-কম গর্ভধারণ-কম গর্ভ ও প্রসবকালীন জটিলতা-কম মাতৃমৃত্যু—এই চক্র বিবেচনায় পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির সঙ্গে জনকল্যাণের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই ভবিষ্যৎ কর্মকৌশল নির্ধারণে এবং কর্মসূচি বাস্তবায়নে জনকল্যাণের বিষয়টি চুলচেরা বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

দেশের উন্নয়নে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি পরোক্ষভাবে আরও যে ভূমিকা রাখে, তা হলো দারিদ্র্য হ্রাস, লিঙ্গসমতা, নারীর ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণ। টেকসই উন্নত জীবনমান নিশ্চিতকরণ এবং ব্যক্তির পেশাগত উন্নয়নেও পরিবার পরিকল্পনার অবদান উল্লেখযোগ্য। অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভ রোধ করতে পারলে নারীরা কর্মক্ষেত্রে অধিকতর অবদান রাখতে পারেন এবং শ্রমজীবী নারীদের উৎপাদনশীলতা এবং আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়। নারীর আয় বৃদ্ধির সুফল পরিবারের সব সদস্য ভোগ করে, যখন নারী উপার্জন করতে পারেন এবং পরিবারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণের সুযোগ পান, তখন তাঁরা পরিবারের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ভরণপোষণে পুরুষদের তুলনায় বেশি ব্যয় করেন, গবেষণায় বিষয়টি প্রমাণিত। আমরা যদি পরিবার ও সমাজের উন্নয়ন চাই, তাহলে নারীর উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধিতে আরও মনোযোগী হতে হবে। পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল হলেও নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারী স্বাস্থ্য উন্নয়নে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে এখনো অনেকটা পিছিয়ে, যার প্রতিফলন আমরা দেখি বাল্যবিবাহ, কিশোরী গর্ভধারণ ও অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের পরিসংখ্যানে। দেশে মেয়েদের গড় বিয়ের বয়স ১৬ দশমিক ৮ বছর, বিবাহিত কিশোরী গর্ভধারণের হার প্রতি হাজারে ১০৮ এবং শতকরা ৪০ ভাগ গর্ভধারণ অনিচ্ছাকৃত (বিডিএইচএস ২০১৭)। বিপুল এই অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভের একটি বড় অংশের পরিসমাপ্তি ঘটে গর্ভপাতে, যার সঙ্গে মাতৃমৃত্যু ও মাতৃস্বাস্থ্যের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। তথ্য–উপাত্ত বলছে, পরিবারে সন্তানের সংখ্যা নির্ধারণে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি যতটা সফল, অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভ রোধে নারীদের সহায়তায় ততটা এখনো নয়। পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিকে জনকল্যাণের বিষয়ে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হলে কর্মসূচির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে ব্যাপক পরিবর্তন করা প্রয়োজন। সমগ্র পৃথিবীতে পরিবার পরিকল্পনাকে বিবেচনা করা হয় জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক কল্যাণের দৃষ্টিকোণ থেকে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে নয়। প্রজননের অধিকার নিশ্চিতপূর্বক নারীর ক্ষমতায়নে এবং লিঙ্গবৈষম্য নিরসনেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি।

কেউ কেউ বলেন, জনসংখ্যার ভারে আমরা ন্যুব্জ, জনসংখ্যা ধারণ করার সামর্থ্য আমাদের নেই এবং অচিরেই আমাদের সব উন্নয়ন কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়বে । কিন্তু সব অনুমানকে ভুল প্রমাণ করে আমরা জাতি হিসেবে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছি। যদি জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করা যায়, তাহলে বাংলাদেশে আর্থসামাজিক উন্নয়ন আরও বেগবান হবে–বিষয়টি আমরা সবাই জানি। ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশন তত্ত্ব অনুযায়ী একটি দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে একপর্যায়ে কমতে শুরু করে। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে এবং জাতিসংঘসহ অন্য সংস্থাগুলোর পূর্বানুমান ভুল না হলে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ২০৩৫ সালে গিয়ে ২৪ থেকে ২৫ কোটিতে স্থির হবে এবং ১৯৫০ সাল থেকে কমতে থাকবে। এমন এক পরিস্থিতে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির ভবিষ্যৎ লক্ষ্য নির্ধারণে বাংলাদেশকে কৌশলী হতে হবে।

প্রকৃত পরিবারকল্যাণ তখনই নিশ্চিত হয়, যখন পরিবারের নারীরা সুস্থ থাকেন এবং নিজেদের অধিকার নিশ্চিত করতে পারেন। অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভরোধপূর্বক নারীর ক্ষমতায়ন এবং সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে না পারলে পরিবারকল্যাণের বিষয়টি অধরাই থেকে যাবে। নারী অধিকারের সঙ্গে যে বিষয়গুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তা হলো বিয়ে, সন্তান গ্রহণ এবং জন্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়ে নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে ভূমিকা। বাল্যবিবাহ রোধে আমাদের গত দুই যুগে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। বাল্যববিাহ রোধ করতে হবে এবং কিশোরীদের প্রজননের অধিকারসহ অন্যান্য অধিকার নিশ্চিত করে তাদের প্রত্যেককে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এ ছাড়া ইতিমধ্যে যেসব কিশোরী বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে, তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও সেবার আওতায় রাখতে হবে, যাতে তারা উপযুক্ত হওয়ার আগে অন্তঃসত্ত্বা না হয়। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য নয়, জনকল্যাণের জন্য পরিবার পরিকল্পনা—বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির লক্ষ্য ও কর্মপন্থা নির্ধারণ করা সময়ের দাবি। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচনা করলে পরবর্তী ধাপ হওয়া উচিত জনকল্যাণ।

মো. মাহবুব-উল-আলম : প্রকল্প পরিচালক, ইউএসএআইডি সুখী জীবন এবং

কান্ট্রি ডিরেক্টর, পাথফাইন্ডার ইন্টারন্যাশনাল

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন