default-image

রাজধানীর হাতিরঝিল ছিল নিতান্তই দূষণ-দখলে আবৃত একটি দুর্গন্ধময় ডোবা। সেই ডোবা ও এর আশপাশের এলাকাকে সুন্দর ও পরিবেশবান্ধব করার কার্যকর উদ্যোগের শুরুটা ২০০৯ সালে। তবে স্থানটি মনোরম করে তোলা এবং আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতার সমস্যা কমলেও ছয় বছরেও তা পরিবেশবান্ধব হয়ে ওঠেনি। হাতিরঝিল প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা নিয়ে এই আয়োজন

হাতিরঝিল বর্তমানে রাজধানীর সৌন্দর্য্যপ্রেমীদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় হলেও তা এখনো পরিবেশবান্ধব হয়নি। দূষণরোধে সাত বছরেও গড়ে ওঠেনি পয়োশোধনাগার, আলাদা করা হয়নি বর্জ্য ও বৃষ্টির পানি প্রবাহের পথ। রয়েছে ছিনতাইকারী ও অবাঞ্ছিতদের ভিড়।

এ ছাড়া পরিবেশ উন্নয়ন ও যানজট কমিয়ে আনা হাতিরঝিল প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বালু নদের কাছে দাসেরকান্দি পয়োশোধনাগার গড়ে না তোলা, বর্জ্য ও বৃষ্টির পানির প্রবাহ আলাদা না করা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা, প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ ও মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া বিষয়গুলো প্রকল্পের পুরো কাজ শেষ না করার জন্য বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা খরচ করে গড়ে তোলা এই প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণে এখন পর্যন্ত কোনো কর্তৃপক্ষ বা বিভাগ সৃষ্টি হয়নি। বর্তমানে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধান থাকায় রক্ষণাবেক্ষণের কাজ কিছুটা বজায় আছে। কিন্তু তারা চলে যাওয়ার পর কে বা কারা তত্ত্বাবধান করবে, তা এখন পর্যন্ত নির্ধারিত হয়নি।
রাজউকের চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়া অবশ্য বলেন, বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে।

default-image

প্রকল্পের মূল পরিকল্পনাকারী ও সর্বোচ্চ তদারককারী বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, খুবই দুর্ভাগ্য যে চারপাশের পয়োবর্জ্য, গৃহস্থালি ও শিল্প-বাণিজ্যের বারোয়ারি বর্জ্য হাতিরঝিলের পরিবেশকে নষ্ট করে তুলছে। এখন বছরের পাঁচ মাসই নাকে রুমালচাপা দিয়ে দর্শনার্থীদের এই প্রকল্পের সৌন্দর্য উপভোগ করতে হবে। কারণ বছরে অন্তত পাঁচ মাস বর্ষা মৌসুম থাকে। এ সময় বৃষ্টির পানির সঙ্গে বারোয়ারি বর্জ্য ভেতরে ঢুকে পড়ে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকল্পে থাকলেও প্রায় সাত বছরে ঢাকা ওয়াসা পয়ো পরিশোধনাগার তৈরি করতে পারেনি। আলাদা পথ থাকার কথা হলেও বৃষ্টির পানি ও পয়োবর্জ্য একই পাইপলাইন ধরে যাচ্ছে ঝিলের পানিতে। এটা বন্ধে ঢাকা ওয়াসা, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় নেই।
দাসেরকান্দি পয়োশোধনাগার কবে হবে?: মনোরম ও দৃষ্টিনন্দন এলাকা হিসেবে গড়ে উঠলেও হাতিরঝিল ‘প্রকল্পের কলঙ্ক’ দুর্গন্ধময় পরিবেশ। এর জন্য প্রধানত দায়ী বালু নদের কাছে ঢাকা ওয়াসার দাসেরকান্দি পয়োশোধনাগার নির্মাণ না হওয়া। প্রায় সাত বছর আগে মূল নকশায় ওই শোধনাগারের কথা থাকলেও এর জন্য জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া মাত্র শুরু হয়েছে।
জানা যায়, ২০০৮ সালে হাতিরঝিলের কাজ শুরুর সময়ই শোধনাগারটির নির্মাণকাজ শুরু করার কথা ছিল। তবে এর আগে নারায়ণগঞ্জের পাগলা পয়োশোধনাগারের মতো দাসেরকান্দি পয়োশোধনাগার তৈরির উদ্যোগ নেয় ঢাকা ওয়াসা। এ জন্য তারা সোইকো ইন্টারন্যাশনাল নামের এক সুইডিশ কোম্পানির মাধ্যমে এর সম্ভাব্যতা যাচাইও করেছিল।

default-image

গত সপ্তাহে সরজমিন ঘুরে দেখা যায়, হাতিরঝিলের দুপাশের নর্দমা দিয়ে পয়োবর্জ্য রামপুরা সেতুর কাছে জমা হচ্ছে। পরে তা বনশ্রীর পাশ দিয়ে বেগুনবাড়ী ও নড়াই খাল দিয়ে আশপাশের লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। দূষণ আগে যেভাবে হতো, সেভাবেই হচ্ছে। বিশেষ করে দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে বনশ্রী আফতাবনগর এলাকায়। বর্ষাকালে বর্জ্যের প্রবাহ আরও বেড়ে যায়।
ওয়াসা সূত্র জানায়, ২০০৭ সালে তিন হাজার কোটি টাকায় দাসেরকান্দি প্রকল্প হবে বলে ঠিক করে ওয়াসা। ওই সময় বুয়েটের পক্ষ থেকে দেশি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ৫০০ কোটি টাকায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব বলে জানানো হয়। দেশি প্রযুক্তিতে এই শোধনাগার নির্মাণের সিদ্ধান্ত হলেও তা সময়মতো না হওয়ায় খরচ বেড়ে দেড় হাজার কোটির টাকায় দাঁড়িয়েছে। শুরুতে কথা ছিল ১০০ একর জমিতে শোধনাগার হবে। এখন ৬০ একরে নামিয়ে আনা হয়েছে।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, হাতিরঝিলের বর্জ্য দুপাশের নর্দমাপথে দাসেরকান্দিতে নিয়ে পরিশোধন করতে হবে, এটাই কথা ছিল। আফতাবনগর দিয়ে এই বর্জ্য যাওয়ার বিষয় নির্ধারণও আছে। কিন্তু যেভাবে বাড়িঘর নির্মাণ করা হচ্ছে, তাতে যত দিন যাবে বিষয়টি কঠিন হয়ে পড়বে। রাস্তাও সংকুচিত হয়ে যাবে। খালের পাশ দিয়ে এই লাইন যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
নকশায় বলা হয়েছে, বর্জ্য রামপুরা সেতুর সামনে লিফট পাম্পিং স্টেশনে জমা হবে। পরে তা পাইপলাইনের মাধ্যমে আফতাবনগর হয়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরে দাসেরকান্দিতে গিয়ে মিশবে। সেখানে পয়োবর্জ্য পরিশোধন হয়ে বালু নদে চলে যাবে।

default-image

জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এ ডি এম কামরুল আলম চৌধুরী বলেন, দাসেরকান্দির জমি অধিগ্রহণের জন্য এ পর্যন্ত তিন দফায় নোটিশ দিয়েও ব্যর্থ হতে হয়। এ ছাড়া আর্থিক সমস্যাও রয়েছে। ঠিক কবে নাগাদ বাস্তব কাজ শুরু করা যাবে, তা তিনি বলতে পারেননি।
অবশ্য হাতিরঝিল প্রকল্পে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কাজের অংশের পরামর্শক ভিত্তি স্থপতিবৃন্দ লিমিটেডের স্থপতি ইকবাল হাবিব বিকল্প উপায়ে বর্জ্য পরিশোধনের কথা জানিয়েছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, প্রথাগত ড্রেনেজ বা পয়োলাইনের পরিবর্তে হাতিরঝিলের দূষণ দূর করতে সূর্যের আলো ব্যবহার করা যেতে পারে। এর জন্য ‘সোলার ইকুইটি ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট’ দরকার। বিদেশে এর ব্যবহার রয়েছে।
বর্জ্য ও বৃষ্টির পানির প্রবাহের আলাদা পথ নেই: পান্থপথ, মহাখালী বক্স কালভার্ট ছাড়াও টঙ্গী ডাইভারশন রোড, তেজগাঁও, বেইলী রোড, মগবাজার, রামপুরাসহ মোট ১১টি পথ ধরে হাতিরঝিলে বৃষ্টির পানি ও আবর্জনা যায়।
প্রকল্পের পশ্চিমাংশে ঝিলে কঠিন বর্জ্য যাতে না পড়ে, সে জন্য সোনারগাঁও হোটেলের পেছনে বৈদ্যুতিক ছাঁকনি (মেকানিক্যাল স্ক্রিন) বসানো হয়। সেই ছাঁকনিতে বর্ষার সময় দেখা যায় মরা মুরগি, গরু-ছাগলের নাড়িভুঁড়ি, বিভিন্ন খাবারের প্যাকেট, লেপ-তোশক-বালিশের অংশবিশেষ।
কারওয়ান বাজারের ময়লা-আবর্জনা ও পান্থপথ বক্স কালভার্ট হাতিরঝিলের পানি নষ্ট করার ক্ষেত্রে প্রধানত দায়ী বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সেনাবাহিনীর প্রকল্প কর্মকর্তা কাজী শাকিল হোসেনের মতে, টঙ্গী ডাইভারসন রোডের নিচ দিয়ে হাতিরঝিল পূর্ব ও পশ্চিম অংশ যোগ হয়েছে, যার জন্য পশ্চিম অংশের পানির দূষণ পূর্ব অংশেও ছড়িয়ে পড়ে।
বুয়েটের অধ্যাপক ও পানি বিশেষজ্ঞ মুজিবুর রহমান বলেন, বৃষ্টির পানি যাওয়ার পথ থেকে পয়োবর্জ্য ও গৃহস্থালির বর্জ্য আলাদা করা খুব জরুরি। প্রথমেই পান্থপথ কালভার্টে বৃষ্টির পানি যাওয়ার লাইন থেকে পয়োবর্জ্যের লাইন সরিয়ে আনতে হবে।
বিদেশি কোনো কোম্পানির সঙ্গে বুয়েট যৌথভাবে সমীক্ষা ও নকশা করে দিতে পারে। গ্লাস রিএনফোর্স পাইপের (জিআরপি) মাধ্যমে আলাদা লাইন করা যায়। এর জন্য রাস্তা কাটতে হবে না। বিভিন্ন দেশে এখন এই পাইপের ব্যবহার হয়। চীনে এটা তৈরিও হয়। তাদের কারিগরি সহযোগিতাও নেওয়া যায়। সব মিলিয়ে খরচও কম পড়বে। তবে এখানে ওয়াসার তত্ত্বাবধানে নির্মাণকাজ হওয়া জরুরি।
স্থপতি ইকবাল হাবিবের মতে, বিশেষ করে পান্থপথ বক্স কালভার্ট থেকে বৃষ্টির পানির লাইন ও পয়োলাইন আলাদা করা খুবই জটিল এবং সময়সাপেক্ষ।
এ বিষয়ে ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এ ডি এম কামরুল আলম চৌধুরী বলেন, পয়োলাইনের বিষয়ে ওয়াসার যে মহাপরিকল্পনা (মাস্টারপ্ল্যান) রয়েছে, তাতে পান্থপথও রয়েছে। সে মতো কাজ হবে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১২ সালে পয়ো মহাপরিকল্পনা হলেও বাস্তব অগ্রগতি একেবারেই নেই।
ছিনতাইকারী, অবাঞ্ছিতদের ভিড়: ২০১৩ সালে নববর্ষের উপহার হিসেবে উদ্বোধন হওয়ার পর এটি মহানগরের মনোরম সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। শুরুর দিকে অনেকেই বলেছেন, ‘বিদেশের কোনো পর্যটন স্থান।’ কিন্তু পরে ধীরে ধীরে দর্শনার্থীদের আগ্রহ কমে যায়, ভিড় কমে আসে।
প্রকল্প এলাকায় কয়েক দফা ঘুরে দেখেছেন এই প্রতিবেদক। গত ২৭ ডিসেম্বর গিয়ে দেখা যায়, প্রকল্পের সেতুগুলোর দুই পাশের রেলিংয়ে বসে আছে লুঙ্গি, গামছা পরা লোকজন। তাদের কেউ কেউ সিগারেট ফুঁকছে। কেউ কেউ নারী দর্শনার্থীদের উদ্দেশ করে এটা-ওটা মন্তব্য করছে। ফুটপাতেও বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারছে না দর্শনার্থীরা। সেতুতে, রাস্তায় সর্বত্র বেয়াড়া তরুণদের বিপজ্জনক মোটরসাইকেল চালানোর মহড়া। এক চাকায় ভর করে চারপাশে চক্কর দেওয়া, রাস্তায় চলন্ত মোটরসাইকেলের চাকা ঘষে প্রচণ্ড শব্দ তৈরি করে উল্লাস করা—সবই চলছিল।
এখানে মাঝেমধ্যেই বেড়াতে আসেন কাঁঠালবাগান এলাকার বাসিন্দা মহিম চৌধুরী। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা নিয়মিতই ঘটে। এদের বাধা দিতে কোনো কর্তৃপক্ষকে দেখা যায় না।
অবশ্য এমন উপদ্রব কমাতে প্রকল্প এলাকায় আট ফুট উঁচু প্রায় সাড়ে আট কিলোমিটার সীমানা দেয়াল দেওয়া হয়েছে। এতে কিছুটা ঠিক হচ্ছে।
অবরোধ-হরতালে হাতিরঝিলে দর্শনার্থীদের ভিড় কিছু কমেছে। এর মধ্যেই গত মঙ্গলবার পাওয়া গেল অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী রাজীব আহমেদের পরিবারকে। রাজীব বললেন, দশ বছর আগে সোনারগাঁও হোটেলের পেছনের এলাকা যেমন দেখেছিলেন, তার সঙ্গে বর্তমানের পার্থক্য অনেক। সহজেই বোঝা যায়, হাতিরঝিলকে মনোরম করতে অনেক টাকা খরচ করা হয়েছে। কিন্তু বখাটেদের কারণে এখানে নির্বিঘ্নে দাঁড়িয়ে ঝিলের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় না।
শুরুতে প্রকল্প এলাকায় রিকশা চলাচল বন্ধ ছিল। এখন মাঝেমধ্যে রিকশা চলছে। কেউ কেউ আইন ভেঙে উল্টো দিক দিয়ে গাড়ি, মোটরসাইকেল বা রিকশা চালান। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও আছে।
রাজউকের মতে, হাতিরঝিলে যানবাহন চলাচলের সংখ্যা দুই মাস আগেও দৈনিক লক্ষাধিক ছিল। এখন কমে এসেছে। তার পরও গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ও সন্ধ্যায় যানজট দেখা যায়, রামপুরা দিয়ে বেরোনোর পথে এবং টঙ্গী ডাইভারসন রোড অংশে ঢুকতে ও বেরোতে। মগবাজার প্রান্তে টঙ্গী ডাইভারসন রোডে আসার জন্য হাতিরঝিল প্রথম সেতুর কাছে গাড়ির দীর্ঘ সারিও দেখা যায়। একই অবস্থা এফডিসি-সংলগ্ন হাতিরঝিল এলাকায়।
স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, যানজটের চিন্তা করেই দুটি সেমি ফ্লাইওভার (ইউলুপ) করা হচ্ছে। এতে গাড়ি বাঁ দিকের পথে চলবে।
ক্ষতিগ্রস্তদের ফ্ল্যাট: হাতিরঝিল প্রকল্প এলাকায় ৩৯টি পাকা ভবন ভাঙতে হয়েছিল। জায়গা নেওয়া হয়েছিল আরও অনেক বাসিন্দার। ক্ষতিগ্রস্ত এই বাসিন্দাদের পুনর্বাসন করতে ১৫ তলা দুটি ভবন নির্মাণ করছে রাজউক। ভবন দুটিতে মোট ১১২টি ফ্ল্যাট থাকবে। একটি ভবনের ৫৬টি ফ্ল্যাট থাকবে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য। টঙ্গী ডাইভারশন রোডের পূর্ব পাশে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) বিদ্যুৎ ভবনের পেছনে বেগুনবাড়ী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভবন দুটি নির্মাণের কাজ চলছে।
হাতিরঝিল প্রকল্পের রাজউক অংশের পরিচালক জামাল আক্তার ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, দুটি ভবনের একটির ৫৬টি ফ্ল্যাট দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রি করা হবে। ফ্ল্যাট বিক্রির টাকা দিয়ে দুটি ভবন নির্মাণের খরচ ওঠানো হবে।
হাতিরঝিলে অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত প্রয়াত সাংবাদিক আবদুস শহীদ। তাঁর ৬ শতাংশ জায়গার ৫ শতাংশই চলে গেছে। আবদুস শহীদের মেয়ে জয়া শহীদ জানান, রাজউক ও সংশ্লিষ্টরা আনুষ্ঠানিকভাবে বলেছিল, তাঁদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৭০ লাখ টাকা, একটি প্লট ও একটি ফ্ল্যাট দেওয়া হবে। হাতিরঝিলের নির্মাণাধীন ভবনের ফ্ল্যাট তালিকায় তাঁদের নাম নেই। পূর্বাচলে তিন কাঠার একটি প্লট সরকারি মূল্যে কিনে নেওয়ার জন্য রাজউক থেকে প্রস্তাব করা হয়েছে।


এক নজরে প্রকল্প

ব্যয়
২০০৯ সালে প্রকল্প ব্যয় ছিল ১ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা। ২০১৩ সালের ২ জানুয়ারি উদ্বোধনের সময় পর্যন্ত খরচ হয় ১ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা। সর্বশেষ খরচ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা।


বাস্তবায়ন

 বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে একটি দল প্রকল্পের সর্বোচ্চ তদারককারীর কাজে নিয়োজিত
 প্রকল্প বাস্তবায়নে রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
 মাটি খনন, ময়লা-আবর্জনা অপসারণ, প্রকল্প এলাকা রক্ষার কাজে যুক্ত রাজউক
 রাস্তা ও সেতু নির্মাণের কাজে যুক্ত এলজিইডি
 প্রধান ডাইভারশন নর্দমা, স্থানীয় ডাইভারশন নর্দমা করেছে ঢাকা ওয়াসা

default-image

হাতিরঝিল প্রকল্পের ইতিবৃত্ত
হাতিরঝিল নামটি ছিল ভাওয়াল রাজার সময় থেকে। সে সময় বুয়েটের পক্ষ থেকে বলা হলো, ঢাকাকে বন্যার হাত থেকে বাঁচাতে হলে হাতিরঝিলকে আর ভরাট করা যাবে না। ১৯৯৮ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজউকের একটি পরিকল্পনা ছিল হাতিরঝিল প্রকল্প এলাকা উন্নয়ন করা। সে সময় মাঝে একটি সরু খাল রেখে হাতিরঝিলের বাকি অংশ ভরাট করে আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প প্লট, রাস্তাঘাট ইত্যাদি করার পরিকল্পনা ছিল। এটা যদি করা হতো সর্বনাশ হয়ে যেত। তাই ওই সময়ে বুয়েটের পক্ষ থেকে বলা হলো, ঢাকাকে বন্যার হাত থেকে বাঁচাতে হলে হাতিরঝিলকে আর ভরাট করা যাবে না। কারণ ওই বছরই ঢাকাসহ দেশে বড় ধরনের এবং দীর্ঘমেয়াদি বন্যা হয়েছিল।
প্রথমে সোনারগাঁও হোটেলের পেছনে রাজউকের জায়গার উন্নয়নের কথা ওঠে। সে সময়ে বেগুনবাড়ীসহ টঙ্গী ডাইভাসরন রোডের উত্তর দিকের জায়গা নিয়ে সমীক্ষা করার কথা ওঠে।
২০০৪ সালের আগস্টে ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা কী হবে, এ বিষয়ে এক আন্তমন্ত্রণালয়ের বৈঠক হয়। বৈঠকে তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী (আবদুল মান্নান ভূঁইয়া) ও ঢাকার সব সাংসদ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। দুঃখজনক যে এর আগেই ঢাকা সিটি করপোরেশন হাতিরঝিলের মাঝ দিয়ে একটি বড় রাস্তা করার পরিকল্পনা ও নকশা তৈরি করে ফেলে। বৈঠকে বিষয়টি তোলা হলে বুয়েট রাস্তার পরিবর্তে উড়ালসড়ক এবং নিচে চারপাশ ঘুরিয়ে বিকল্প সড়ক তৈরির প্রস্তাব দেয়। কারণ এতে উড়ালসড়কের নিচে পানি প্রবাহ ঠিক থাকবে। সভায় নীতিগতভাবে তা মেনে নেওয়া হয়। কিন্তু প্রায় ৬০০ কোটি টাকা খরচ হবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় প্রকল্পের ছাড় দেয়নি। থেমে যায় বিষয়টি। পরে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা প্রয়াত আনোয়ারুল ইকবাল আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক ডেকে হাতিরঝিল প্রকল্প নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২০০৭ সালে হাতিরঝিল প্রকল্পের কাজ কাগজে-কলমে শুরু হলেও কার্যত শুরু হয় ২০০৯ সালে। ১১ ফেব্রুয়ারি এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দেন। প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে হাত দিয়েই সরকারকে ৭২টি মামলা মোকাবিলা করতে হয়েছে। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে এবং আরও কিছু জমি অধিগ্রহণে অনেক সময় চলে যায়।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)
বেগুনবাড়ী-হাতিরঝিল উন্নয়ন প্রকল্পের মূল পরিকল্পনাকারী

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন