মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার: সোয়া বছর আগে করা সেলের কার্যক্রম নেই
পলাতকদের গ্রেপ্তারে তদারকি সেল গঠনের নির্দেশ
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের খুঁজে বের করে সাজা কার্যকরের উদ্যোগ নেই। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর আসামি গ্রেপ্তার করতে পারছে না পুলিশ। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বুধবার পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য একটি তদারকি সেল বা কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
অবশ্য প্রায় সোয়া এক বছর আগে সরকার এ রকম একটি সেল গঠন করলেও তার কোনো কার্যক্রম নেই। গতকাল ট্রাইব্যুনালের আদেশের পর মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্ত সংস্থা আশা করছে, এর ফলে সরকার পলাতকদের খুঁজে বের করার বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেবে।
বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ গতকাল এক আদেশে বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক ও বিচারাধীন আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য আগামী ১৫ দিনের মধ্যে একটি তদারকি সেল গঠন করতে হবে। স্বরাষ্ট্রসচিব ও পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) এ সেল গঠনের নির্দেশ দিয়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, ৪০ দিন পরপর ওই সেলকে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
জানতে চাইলে তদন্ত সংস্থার জ্যেষ্ঠ সদস্য এম সানাউল হক প্রথম আলোকে বলেন, এক বছর আগেই এ ধরনের একটি সেল গঠন করা হয়। কিন্তু ওই সেলের কোনো কাজ নেই, নিয়মিত সভাও হয় না। ট্রাইব্যুনালের আদেশের পর এ বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে।
তদন্ত সংস্থা জানায়, তাঁদের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনালে দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের সাজা কার্যকরের বিষয়টি দেখভালের জন্য একটি তদারকি সেল গঠন করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক) কামাল উদ্দিন আহমেদকে প্রধান করে গঠিত আট সদস্যের ওই সেলে পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা পরিদপ্তর (এনএসআই), প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই), ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলির কার্যালয় ও তদন্ত সংস্থার প্রতিনিধি রয়েছেন। গঠনের ছয় মাসেও কোনো বৈঠক না হওয়ায় ৫ আগস্ট তদারকি সেলের প্রধানকে পাঠানো এক চিঠিতে সভা আহ্বানের তাগাদা দেয় তদন্ত সংস্থা। ১০ সেপ্টেম্বর প্রথম বৈঠকে বসে তদারকি সেল। এরপর কোনো বৈঠক হয়নি।
অথচ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন আসামির সংখ্যা বাড়ছে। দুই ট্রাইব্যুনালে এ পর্যন্ত পাঁচজন পলাতক আসামির বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁরা হলেন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সদস্য (রুকন) আবুল কালাম আযাদ, একাত্তরের আলবদর নেতা চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান, ফরিদপুরের নগরকান্দার পৌরসভার সাবেক মেয়র বিএনপি নেতা জাহিদ হোসেন এবং জাতীয় পার্টির সাবেক সাংসদ আবদুল জব্বার। তদন্ত সংস্থা জানায়, এঁদের মধ্যে মুঈনুদ্দীন যুক্তরাজ্যে, আশরাফুজ্জামান ও জব্বার যুক্তরাষ্ট্রে এবং জাহিদ হোসেন সুইডেনে পলাতক। আযাদ কোথায় আছেন তা কারও জানা নেই।
গত ২০ এপ্রিল ট্রাইব্যুনাল-১-এ শেষ হয় কিশোরগঞ্জের সৈয়দ হাসান আলীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার কার্যক্রম। হাসান আলী পলাতক থাকায় তাঁর অনুপস্থিতিতেই বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়। একই ট্রাইব্যুনাল কিশোরগঞ্জের দুই ভাইসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলেও এ পর্যন্ত একজনকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ নিয়ে গত রোববার উষ্মা প্রকাশ করে ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘আমরা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেই, অথচ পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পারে না।’
মুক্তিযুদ্ধকালে জামালপুরে আলবদর বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা আশরাফ হোসাইনসহ আটজনের বিরুদ্ধে গত মার্চে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল-২। তাঁদের মধ্যে এ পর্যন্ত দুজনকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছে পুলিশ। আশরাফসহ বাকি ছয়জন পলাতক।
তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আবদুল হান্নান খান আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে কোনো আসামিকে কাঠগড়ায় রেখে বিচার করা যাবে না। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আসামি গ্রেপ্তারের ক্ষমতা তদন্ত সংস্থার নেই। এ জন্য তদন্ত সংস্থাকে পুলিশের ওপর নির্ভর করতে হয়। তদন্ত সংস্থার যদি আসামি গ্রেপ্তারের ক্ষমতা থাকত, তাহলে এ সমস্যার সমাধান হতো।