২০১৮ সালে যেদিন তোমার স্নাতক ডিগ্রি পাওয়ার কথা, আমরা সবাই সেদিকেই তাকিয়ে ছিলাম। এমনকি তুমি উপস্থিত থাকতে না পারলেও ইমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের গোইজুয়েটা বিজনেস স্কুল গ্র্যাজুয়েট হিসেবে তোমাকে ঠিকই স্বীকৃতি দিয়েছে। তারা আরও কিছু দিয়েছে। মেধাবী ও দৃঢ় মূল্যবোধের অধিকারী শীর্ষস্থানীয় শিক্ষার্থীকে স্বীকৃতি দিতে ‘ফারাজ হোসেন কোর ভ্যালুস অ্যাওয়ার্ড’ চালু করেছে তারা। অন্যান্য স্নাতক শিক্ষার্থীর তুলনায় তুমি অনেক বেশি কীর্তির চিহ্ন রেখে গেছ।

যে প্রভাব তুমি রেখে গেছ, তা তোমার কলেজের বা তোমার প্রিয় বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বহুদূর। গ্যারিও নামে ইতালির একটি এনজিও তোমাকে নীতিমান মানুষ হিসেবে সম্মানিত করেছে। তোমার সর্বোচ্চ ত্যাগের স্মরণে বিশ্বের ১৪টি দেশে তোমার নামে গাছ লাগিয়েছে সংগঠনটি। ইতালির ছোট শহর বেনেভেন্তোয় আমরা যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। ওই গাছগুলোর একটি লাগানো হয়েছে সেখানে। শিক্ষার্থীরা তোমার প্রশংসায় যে গান গেয়েছ, তা যদি তুমি দেখতে পেতে! ওই শিক্ষার্থীরা ছিল পুরোপুরি ভিন্ন একটি দেশের, যাদের সঙ্গে তোমার দেখা পর্যন্ত হয়নি কখনো।

তোমার সাহসের জন্য তোমাকে অসংখ্যবার সম্মান জানানো হয়েছে। মুম্বাইয়ে তোমাকে মাদার তেরেসা মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড ফর সোশ্যাল জাস্টিস পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। সেদিন মামার (মা) চোখে যে গৌরব স্ফুরিত হয়েছে, সে দৃশ্য তুমি যদি দেখতে! তোমার চলে যাওয়ার এক মাস আগে যেভাবে তিনি তোমাকে বলেছিলেন, ঠিক সেভাবে বললেন, তিনি তোমার মা হতে পেরে গর্বিত। বলেছিলেন, এই গর্ব শুধু এ জন্য নয় যে কলেজে তুমি ভালো করছিলে; বরং তোমার মানবিক গুণাবলির জন্য। বিশ্বে তুমি একটি সাহসিকতার দৃষ্টান্ত রেখে গেছ।

‘প্রতিটি মানুষের দুবার মৃত্যু হয়—একবার সমাহিত করার সময়, আরেকবার শেষ যখন কেউ তার নাম বলে।’ এই প্রবাদের কথা সত্যি হয়ে তুমি যদি হারিয়ে যেতে, তবে সেটি কষ্টের কারণ হতো। মনে হচ্ছে, তোমার আর নানাভাইয়ের দ্বিতীয় মৃত্যু পৃথিবী ঘটতে দেবে না।

আমি জানি, পরিবার ও বন্ধুদের তুমি মনেপ্রাণে ভালোবাসতে। তাদের জন্য তুমি যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত ছিলে। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সবাইকে তুমি তা দেখিয়ে গেছ। যাদের তুমি ভালোবেসেছ, তাদের সবার মঙ্গল চেয়েছ।

তোমার বন্ধুরা খুব ভালোভাবে এগিয়ে চলেছে। তারা যা যা করতে চেয়েছে, তার সবকিছুতেই সাফল্য পাচ্ছে। তুমি চেয়েছিলে, তারা সবাই ঢাকায় ফিরুক ও বাংলাদেশেই থাকুক; যদিও তাদের অনেকেই তা চাইত না। তাদের সিংহভাগই তোমার চাওয়া রেখেছে। তারা এখানে আছে। আমরা অনেকবার এই ভেবে হেসেছি যে ছোটু যা চেয়েছিল, কীভাবে তা হয়ে গেল।

তোমাকে নানুমার খুব মনে পড়ে। তোমাদের দুজনের যে অন্তরঙ্গ কথাবার্তা হতো, সেগুলোর কথা তিনি আমাকে বারবার বলেন। তিনি আমাকে বলেন, যেভাবে তুমি তাঁকে বুঝতে, আমি সেভাবে তাঁকে বুঝতে পারি না। তবে আমি চেষ্টা করছি! তোমাকে, নানাভাইকে আর ছোট মালিকিজানকে স্মরণ না করে তিনি কোনো রাতেই ঘুমাতে পারেন না। তিনি জানেন, তাঁর তিন স্বর্গদূত সব সময় তাঁর খেয়াল রাখবে।

মামার (মা) কথা কোথা থেকে শুরু করব? তিনি আজও যে কষ্ট বয়ে বেড়ান, তা আমরা কেউ কখনো বুঝতে পারব না। তবে তিনি কত শক্ত মনের মানুষ, আমরা তার সাক্ষী। তুমি নিশ্চয়ই তোমার সাহস তাঁর কাছ থেকে পেয়েছ। তাঁকে নিয়ে তোমার অনেক গর্ব হওয়ার কথা। তাঁকে আমরা দুজনই সারা জীবন আদর্শ হিসেবে মেনেছি। দৃঢ় সংকল্প নিয়ে তিনি যেভাবে নানাভাইয়ের কৃতিত্ব নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন, তা দেখলে তুমি মুগ্ধ হতে। তাঁর সেই সংকল্পের কথা আমাদের সবারই জানা। এরপরও তোমার রেখে যাওয়া পরিচয়েই তিনি সবচেয়ে গর্বিত। আর তা হলো তিনি ফারাজের মা। এমন একটি দিন বা মুহূর্ত কাটে না, যেদিন বা যখন তোমার কথা তাঁর মনে পড়ে না। এমন অসংখ্য ঘটনা আছে, যেখানে তুমি তাঁর পাশে না থেকেও তাঁকে গর্বে ভরিয়ে দিয়েছ। তুমি সব সময়ই তাঁর মনের মণিকোঠায় রয়েছ। তিনি জানেন, একদিন তোমার সঙ্গে আবার তাঁর দেখা হবে।

পাঁচ বছর ধরেই ১ জুলাই তারিখে আমরা তোমার মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্তের কথা স্মরণ করে আসছি। আর এ বছর ১ জুলাই আমরা তোমাকে আর নানাভাইকে একসঙ্গে স্মরণ করছি। আমরা সব সময়ই জানতাম, তোমার আর নানাভাইয়ের মধ্যে এক বিশেষ বন্ধন রয়েছে। তোমাদের আত্মা যে সত্যিই একত্রে গাঁথা, ২০২০ সালের ১ জুলাই আমাদের সবাইকে আল্লাহ সেটি দেখিয়ে দিলেন।

আমরা তোমাকে ভালোবাসি। তোমার অভাব আমরা অনুভব করি।

তুমি আমাদের সবার মধ্যে বেঁচে আছ, প্রতিটা দিন, সব সময়।

তোমার জন্য অনেক ভালোবাসা,

ভাইয়ু

যারেফ আয়াত হোসেন ফারাজ আইয়াজ হোসেনের বড় ভাই

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন