default-image

মানবসভ্যতার অগ্রগতি নিহিত আছে বিজ্ঞানচর্চায়। বিজ্ঞান দুটি খাঁচায় বন্দী, একটি ভাষার খাঁচা, অন্যটি সোনার খাঁচা। অনেক জাতি এ দুই খাঁচা ভেঙে বিজ্ঞানকে নিজেদের রাষ্ট্রভাষায়, মাতৃভাষায় মুক্ত করে দিয়েছে। বিজ্ঞান যত দেরিতে এ দুই পিঞ্জরমুক্ত হবে, বাঙালি জাতির সামগ্রিক মুক্তিও ততই পিছিয়ে যাবে।

‘কৃষিবিজ্ঞানে অনার্স করেছি সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে, মাস্টার্স করেছি গাজীপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং বর্তমানে জৈবনিয়ন্ত্রণ নিয়ে পিএইচডি করছি বেইজিংয়ের কৃষিবিজ্ঞান একাডেমিতে। বাংলাদেশে পড়েছি ইংরেজিতে, পরীক্ষায় উত্তরও দিয়েছি ইংরেজিতেই। মাঝে মাঝে শিক্ষকেরা বাংলায় বক্তৃতা দিতেন, প্রশ্নও বাংলায় করা যেত। আমাদের পাঠাগারে অল্প কিছু গবেষণা–রিপোর্ট বাংলায় ছিল বটে, কিন্তু প্রয়োজনীয় সব টেক্সট বই ছিল ইংরেজিতে।

‘চীনে শিক্ষার মাধ্যম ম্যান্ডারিন। বিজ্ঞানের পৃথিবী-বিখ্যাত যত টেক্সট বই, সবগুলোই আছে চীনে, সেই সঙ্গে আছে প্রত্যেকটির চীনা অনুবাদ। আমি আর আমার অধ্যাপকের লেখা যে প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে আমেরিকার জার্নালে, তিনি সেটা চীনা ভাষাতেও অনুবাদ করিয়েছেন, যাতে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা সহজে পড়ে বুঝতে পারেন। আমার চীনা সতীর্থরা কৃষিবিজ্ঞানের সর্বশেষ গবেষণাগুলো সম্পর্কেও ওয়াকেবহাল, যদিও তাদের বেশির ভাগই ইংরেজি ঠিকঠাকমতো পড়তে-লিখতে-বুঝতে পারে না।

বিজ্ঞাপন

“বিনা স্বদেশি ভাষা পুরে কি আশা!” আমরা মুখে বলি, কিন্তু চীনারা করে দেখায়।

“হুজ্জতে বঙ্গাল, হিকমতে চীন!” ডিএনএ কিংবা আরএনএর মতো শব্দেরও চীনা প্রতিশব্দ আছে, আছে নির্দিষ্ট কাঞ্জি বা চিত্রাক্ষর? নেচার-এর মতো পত্রিকার চীনা অনুবাদ-ভার্সন রয়েছে। চীনের কোনো জার্নালে ইংরেজিতে লেখা কোনো গবেষণাপত্র যদি প্রকাশিত হয়, তবে চীনা ভাষায় তার সারমর্ম থাকা বাধ্যতামূলক। শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজি, এমন বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে বৈকি চীনে। কিন্তু ইংরেজিতে লেখা থিসিসের শুরুতে গবেষণাকর্মের সারসংক্ষেপ চীনা ভাষাতে লিখতেই হবে। থিসিস ডিফেন্ড করার প্রারম্ভে সেই সারমর্ম চীনা ভাষায় বলতে আপনি বাধ্য, মুখস্থ করেই পারেন কিংবা অন্য যেকোনোভাবে।

‘আমাদের দেশের মতো ইংরেজিকে শিক্ষার মাধ্যম করার পাগলামি ভর করেনি চীনাদের মাথায়। চীনারা ইংরেজি শিখছে বিদেশি ভাষা হিসেবে। একজন কানাডীয় শিক্ষককে রাখা হয়েছে আমাদের একাডেমিতে স্রেফ ছাত্রদের গবেষণাপত্র ইংরেজিতে লেখার কাজে সহায়তা করার জন্য। চীনের স্কুল-কলেজে ইংরেজি ভাষার শিক্ষকদের অনেকেরই মাতৃভাষা ইংরেজি। চীনা কিশোর-কিশোরীদের অনেকেই বোধগম্য নেটিভ উচ্চারণেই ইংরেজি বলতে শিখছে। রাস্তাঘাটে সবকিছু চীনা ভাষায় লেখা বলে পিকিংয়ে পথ হারিয়ে ফেললে আমরা বড়দের নয়, ছোট ছেলেমেয়েদের জিজ্ঞাসা করি।’

default-image

এগুলো যাঁর মুখের কথা, সেই পল্লব ভট্টাচার্য ২০১৬ সালে বাংলাদেশে একটি গবেষক দলের সদস্য ছিলেন। চার মহাদেশের ৩১ জন বিজ্ঞানীর সমন্বয়ে গঠিত এই গবেষক দল গমের বিস্ফোরণ রোগের উৎস ও কারণ আবিষ্কার করেছিল, যার ফলে থামিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল সেই মহামারি। পল্লবের শিক্ষক অধ্যাপক তোফাজ্জল ইসলাম ছিলেন এই দলের পরিচালক। কৃতবিদ্য এই গবেষক-শিক্ষকের বহু প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে দেশ-বিদেশের জার্নালে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবপ্রযুক্তি ও জিন প্রকৌশল ইনস্টিটিউট, যেখানে তিনি বর্তমানে পরিচালক, সেখানে বঙ্গবন্ধুর প্রাণের বাংলা ভাষা প্রায় নির্বাসিত। ইংরেজিতে পড়া, পড়ানো এবং পরীক্ষা নেওয়া বাধ্যতামূলক।

‘বাংলাদেশের সংবিধান এবং ১৯৮৭ সালের বাংলা প্রচলন আইনের দৃষ্টিতে এটা কি শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়?’

অধ্যাপক তোফাজ্জল ইসলামের উত্তর, ‘অপরাধ তো বটেই। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম, আশির দশকে, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা কিংবা ইংরেজিতে পরীক্ষা দেওয়া যেত। স্বাধীনতার পরপর মাতৃভাষায় শিখন ও শিক্ষণের একটি ধারা চালু হয়েছিল। কখন যে ইংরেজির মরুপথে হারাল বাংলা ভাষার এই ধারা, আমার ঠিক জানা নেই।

‘জাপান-জার্মানিসহ পৃথিবীর যত দেশে আমি পড়েছি, পড়িয়েছি, মাতৃভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা কোথাও শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখিনি। বিজ্ঞানের মতো তীব্র আনন্দের একটি বিষয় আমাদের শিক্ষার্থীরা প্রচণ্ড বিতৃষ্ণার সঙ্গে মুখস্থ করতে বাধ্য হয়, স্রেফ মাতৃভাষা বাংলা শিক্ষার মাধ্যম নয় বলে। এই সৃষ্টিছাড়া ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছিলাম আমি সারা জীবন, কিন্তু আমাকেও ইংরেজিতেই পড়তে-পড়াতে হয়েছে।’
‘কপালের ফের নইলে কী আর, পাখিটির এমন ব্যবহার!’

যেকোনো ভাষা শিক্ষার ও বিজ্ঞানের মাধ্যম হতে পারে, তবে মাতৃভাষা সর্বোত্তম মাধ্যম। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা হলে, গবেষণা প্রবন্ধ বাংলায় পড়লে বিষয়টা যত তাড়াতাড়ি সর্বাধিকসংখ্যক লোকের ‘মরমে পশিবে’, ভিন্ন ভাষার মাধ্যমে কি সেটা হওয়া সম্ভব?। সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই সহজ সত্যটা বুঝতে চাইছেন না: বিজ্ঞানের ‘পাখিটা বন্দী আছে’ ভাষার খাঁচায়।

বিজ্ঞাপন

‘এ খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে?’

অধ্যাপক তোফাজ্জল ইসলামের উত্তর, ‘প্রথমেই বাংলা ভাষাকে শিক্ষা তথা বিজ্ঞানচর্চার একমাত্র মাধ্যম করতে হবে, কমপক্ষে স্নাতক পর্যন্ত। লিঙ্গুয়া একাডেমিকা ইংরেজিকেও একটি ভাষা হিসেবে শিখতে হবে। ইংরেজি ভাষা শিখতে ইংরেজি মাধ্যমে লেখাপড়া করতেই হবে, এটা নাগরিক কুসংস্কার। বিজ্ঞানের যত গুরুত্বপূর্ণ টেক্সট বই আছে, সবগুলো বাংলায় অনুবাদ করে দেখুন। বাংলাদেশে বিজ্ঞানচর্চায় বিপ্লব সাধিত হবে। এটা কঠিন কাজ নয় মোটেই। খুব বেশি অর্থেরও প্রয়োজন হবে না। স্রেফ কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার প্রয়োজন। সাবাটিক্যাল লিভ এবং প্রয়োজনীয় অর্থ দিলে বিজ্ঞান জানে এবং বাংলাও জানে, এমন কিছু ব্যক্তিকে একত্রিত করে পারঙ্গম অধ্যাপকেরা বছরখানেকের মধ্যেই বিজ্ঞানের দরকারি সব বই বাংলায় অনুবাদ করে ফেলতে পারেন। প্রশ্ন হচ্ছে সরকারের অনুরূপ ইচ্ছা আছে কি না কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা বাংলা একাডেমি এটা চায় কি না।’

‘বিচিত্র বিষয়ে গবেষণা হয় পাশ্চাত্যে। পারঙ্গমতা থাকলেও গবেষণার প্রয়োজনীয় আর্থিক সামর্থ্য কিংবা অবকাঠামো বাংলাদেশে নেই। একটি গবেষণাপত্র “ডাউনলোড” করতে গেলে বিদেশের অ্যাকাউন্টে ডলার “আপলোড” করতে হয়। “ফেলো কড়ি মাখো তেল!” সেই সামর্থ্য উন্নয়নশীল দেশের গবেষকদের কোথায়? বিজ্ঞানের “পাখিটা বন্দী আছে সোনার খাঁচায়। বন্দী বিজ্ঞান মানবসভ্যতার জন্যে মঙ্গলজনক নয়।

গবেষণা কমবেশি মুক্ত হয়েছে বলেই না এক গবেষণা দলের তথ্য ও বিশ্লেষণ অন্যেরা ব্যবহার করে এত অল্প সময়ে করোনার একাধিক টিকা আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে।’
‘যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে/ মুক্ত করো হে বন্ধ!’ সভ্যতা ও অগ্রগতির প্রাণভোমরা বিজ্ঞান। অধ্যাপক ইসলাম নিশ্চিত, বিদেশি ভাষার বদ্ধ খাঁচা থেকে বিজ্ঞানকে মুক্ত করে মাতৃভাষার নির্মল আকাশে উড়িয়ে দেওয়ার বিকল্প নেই।

শিশির ভট্টাচার্য্য: অধ্যাপক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন