বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান ‘ওয়াটার রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট’–এর একজন প্রতিনিধি হাইড্রোজিওলজিস্ট মোহাম্মদ ফুয়াদ ঘটনার দিন সেখানে ছিলেন। স্থানীয় সাংবাদিকদের তিনি সেদিন জানিয়েছিলেন, তিন দিন আগে থেকে মাটির নিচে পাইপ ঢুকিয়ে তাঁরা পানি খুঁজছিলেন। ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাঁরা এক হাজার ফুট পাইপ মাটির নিচে ঢোকাতে পেরেছিলেন। তাতেও আরদ্ধ পানি না পাওয়ায় আরও গভীরে যাওয়ার উদ্দেশ্য থেকেই এই বিস্ফোরণ ঘটে।

বিস্ফোরণের পর মানুষের ভিড় একটু হালকা হলে খোঁড়াখুঁড়ির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এলাকা ছেড়ে চলে যান। এখন বিস্ফোরণ–পরবর্তী নিরাপত্তাব্যবস্থা কী হবে? তার ব্যয়ভার কে কীভাবে বহন করবে? এখন গর্তের মুখে আগুন ধরলেই তা দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে। এই বিস্ফোরণ হয়তো সেই রবীন্দ্রনাথের কবিতার মতো ‘সামান্য ক্ষতি’ হিসেবে বিবেচিত হবে। ক্ষতিপূরণে দায় কবিতায় নেওয়া হলেও বাস্তবে কেউ নেয় না। নিরাপত্তার কারণে সেই স্কুল এখন বন্ধ। দূরের আরেকটি স্কুলে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কত দিন এই ব্যবস্থা চলবে, কেউ জানে না। শিক্ষার্থীদের এ ক্ষতি সামান্য ক্ষতি নয়।

কোনো নিয়মনীতি আছে?

বাংলাদেশ পানি আইন, ২০১৩ এবং তার সংশ্লিষ্ট বিধিমালা ভূগর্ভস্থ পানি আহরণে নানা বিধিনিষেধ খুবই পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছে। মাটির নিচে কোথাও কোনো অনুসন্ধান করতে গেলে স্থানীয় পানি কমিটির সম্মতি নিয়েই সেটা করার কথা। দেশের বিশিষ্ট পানি বিশেষজ্ঞ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আইনুন নিশাত জানান, আইন ও বিধিমালায় যা–ই থাকুক না কেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব মানা হয় না। যে যার খেয়ালখুশিমতো কাজ করে। পানি কমিটিকে না জানিয়ে এসব কাজ করার কোনো বিধান নেই।

ঘটনার পরপর স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, এমনকি উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের লোকজন ভূগর্ভস্থ পানি অনুসন্ধানের খবর জানতে পারে বিস্ফোরণের পর।

‘নিরাপদ আহরণসীমা’ লঙ্ঘনকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবেই দেখেছে পানি আইন, ২০১৩। এখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, পানি অনুসন্ধানকারীরা নিরাপদ আহরণসীমার বিষয়টি কি বিবেচনায় রেখেছিলেন?

মাটির নিচে কি সব জায়গায় পানি আছে

সব জায়গায় মাটির নিচে একই স্তরে সুপেয় ও নিরাপদ পানি পাওয়া যায় না। তাই একেক জায়গায় পানির কল বা নলকূপ (টিউবওয়েল) বসাতে একেক রকম খরচ হয়। এ দেশে নিরাপদ পানির মাধ্যম হিসেবে নলকূপকে এগিয়ে নেওয়ার আর জনপ্রিয় করার কাজ করার সময় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সারা দেশের ভূগর্ভস্থ জলের মানচিত্র তৈরি করে। কোথায় কতটা নিচে গেলে নিরাপদ সুপেয় পানি পাওয়া যাবে, কোথায় গভীর নলকূপ বসাতে হবে, কোথায় অগভীরেই কাজ হবে, তার তত্ত্বতালাশ এই মানচিত্রে দেওয়া আছে। ২০১১ সালে প্রকাশিত ‘ইমপ্যাক্ট অব টিউবওয়েল এক্সেস অ্যান্ড টিউবওয়েল ডেফথ অন চাইল্ডহুড ডায়রিয়া ইন মতলব’ শীর্ষক এক গবেষণায় জানা যায়, চাঁদপুরের মতলব উপজেলায় বিভিন্ন এলাকার অবস্থান এবং ভূমিগঠনের ধরন অনুযায়ী নলকূপের গভীরতা ১০ থেকে ৯৯০ ফুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বেশির ভাগই ১২০ ফুটের নিচে, যাকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলের ভাষায় অগভীর নলকূপ বা শ্যালো টিউবওয়েল বলে। এর ওপরে গেলেই গভীর নলকূপ। তবে বাংলাদেশের কোথাও হাজার ফুট গভীরতার নলকূপ নজরে আসেনি বলে জানালেন দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের নানা দেশে কাজ করা পানি প্রকৌশলী জুলফিকার আলী হায়দার।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ভূগর্ভস্থ জল মানচিত্র ছাড়াও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) গ্রাউন্ড ওয়াটার জোনিং ম্যাপ আছে। ২০১৬ সালে সেটা হালনাগাদ করা হয়েছে। এসবের কোনোটিতেই পাথরঘাটার মাটির নিচে পানির কোনো সন্ধান দেওয়া হয়নি; বরং আমাদের সাবেক ও বর্তমান বিবেকবান সব পানিবিজ্ঞানীর মতে, টেকনাফ ও উখিয়ার কতিপয় অঞ্চলসহ বাংলাদেশের যেসব জায়গায় মাটি খুঁড়ে পানি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, তার মধ্যে পাথরঘাটা অন্যতম। এসব জায়গায় হরহামেশা খোঁড়াখুঁড়ি কেবল অর্থের অপচয় নয়, বরং বিপজ্জনকও বটে।

কেন বিপজ্জনক

পাথরঘাটার দায়িত্বে নিয়োজিত জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী বলেছিলেন, ‘পাথরঘাটার ভূপৃষ্ঠের নিচে বড় বড় পাথরের অস্তিত্ব রয়েছে। ফলে গভীর নলকূপ বসানো যায় না।’ এই পাথর ফাটিয়ে পানি বের করে আনাটা পরিবেশসম্মত হবে না। পাথরের নিচে জমে থাকা পানি সেখানকার ভূপ্রকৃতির গঠনবিন্যাস ও সুরক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছে।

সুইজারল্যান্ডের জুরিখভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান দ্য জুরিখ সার্ভিসেস করপোরেশন (রিস্ক ইঞ্জিনিয়ারিং) তাদের এক গবেষণা প্রকাশনায় (২০১৬ সালে প্রকাশিত) নানা তথ্য–উপাত্ত দিয়ে খুব পরিষ্কার করে বলেছে, ভূগর্ভে পানি ফেরত যাওয়ার গতির সঙ্গে ভূগর্ভ থেকে পানি তুলে নেওয়ার গতি তাল রাখতে না পারলে বিপর্যয় ঘটবেই। স্থায়ীভাবে পরিবর্তিত হয়ে যাবে মাটির নিচের পরিবেশ। এমন বিপর্যয়ের ঘটনা আমরা ইন্দোনেশিয়াসহ অনেক দেশেই দেখেছি। ২০১৮ সালের ২ অক্টোবর ইন্দোনেশিয়ার পালু শহরের রাস্তা, বাড়িঘর, দোকান—সব মাটির নিচে চলে যায় নিমেষে। এমন ভূমিধস কেউ আগে দেখেনি। কাদার নিচে ডুবে যায় বড় বড় ইমারত।

এখন যা অবস্থা, তাতে এক হাজার থেকে দেড় হাজার ফুট মাটির নিচে পাথর চুইয়ে পানি ফেরত পাওয়ার কথা চরম বিশ্বাসীর পক্ষেও আঁচ করা কঠিন। দেশে আশঙ্কাজনক হারে পাতকুয়াসহ উন্মুক্ত জলাধার কমে যাওয়ার কারণে পানির ভূগর্ভে ফেরত যাওয়ার পথ ক্রমশ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

এখন প্রতিবছর ভয়াবহ হারে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। সরকারি হিসাবমতেই, সারা দেশের নানা জায়গায় পানির স্তর ১৩ থেকে ৩২ ফুট পর্যন্ত কমে গেছে। গবেষকেরা বলছেন, প্রতিবছর ঢাকায় পানির স্তর ৩ থেকে ৯ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে যায়। গত ৫০ বছরে ঢাকার পানির স্তর এভাবে নেমে গেছে প্রায় ২২৯ ফুট। এ পরিস্থিতির জন্য মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলনকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। এখন গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে ঢাকারই যদি এমন করুণ অবস্থা হয়, তাহলে বাকিদের কী হাল। এ বছরের মে–জুন মাসে দেশের ৫৩ জেলায় ৩ লাখের বেশি অগভীর নলকূপ অকেজো হয়ে পড়ে। পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে বলা হয়, সারা দেশে গৃহস্থালি ও খাওয়ার পানির চাহিদার ৯৪ শতাংশই ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে আসে। মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যাচ্ছে। তাই আমাদের মাটির নিচে নয়, মাটির ওপরে সমাধান খুঁজতে হবে। এই পানিসংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জেলায় জেলায় বহুতল ভবন গড়ে তোলার সর্বনাশা খায়েশ। স্থানীয় পৌরসভাগুলো অনেক ক্ষেত্রেই কোনো বাছবিচার না করে বাড়িতে বাড়িতে গভীর নলকূপ বসানোর অনুমতিপত্র বিক্রি করছে।

পাথরঘাটার মতো এলাকার পানির ব্যবস্থা

পাথরঘাটা, শরণখোলা, টেকনাফ, রামপাল, সুন্দরবন ইত্যাদি নানা উপকূলীয় এলাকায় পানীয় আর গৃহস্থালিকাজের জন্য আকাশের পানি ছিল প্রধান উৎস। বড় বড় পুকুরে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে রাখা হতো। সেই পানি বালুখোয়ার ছাঁকনিতে ছেঁকে বা বাড়িতে কয়লা কলসের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত করে নিরাপদ করে নেওয়া হতো। চরম খরার বছরে একটু–আধটু সমস্যা হলেও পানির জন্য মানুষ চরম বিপাকে পড়ত না। এসব পুকুর রক্ষণাবেক্ষণ ও বালুখোয়া পরিশোধন পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ ব্যবহারকারীরা নিজেরা কমিটি করে চালিয়ে নিতেন। সেসব সামাজিক উদ্যোগে এখন ভাটা পড়েছে। সৌরশক্তিচালিত পানির ফিল্টার বসছে জায়গায় জায়গায়। অনেক সময় বেশির ভাগই চলে না। মেরামত করার লোক নেই। ফলে পড়ে থাকে দিনের পর দিন।

এ বছর বৃষ্টি দেরিতে আসায় উপকূলে পানীয় জলের সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করে। একপর্যায়ে পাথরঘাটায় সরকারি উদ্যোগে স্বল্প দামে সুপেয় পানি বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়। সুপেয় পানির চরম সংকটে পড়ে উপজেলার ৪৬টি গ্রাম। সরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত সৌরশক্তিচালিত পানির ফিল্টারগুলো নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে সংকটের সময়েও। এ রকম একটা পানি–অভাবী এলাকায় কোট–প্যান্ট পরা কেউ যদি ‘গভীরে যাও গভীরে যাও’ ধ্বনি তুলে বলে, আমি যন্ত্র দিয়ে মাটির নিচে থেকে নির্মল পানি এনে দিতে পারি, তাহলে বাধা দেবে কে? আলাদিনের চেরাগ আর জিনের গল্প শুনে বড় হওয়া আমরা ভানুর মতো বলতেই পারি ‘দেখি না কী হয়’।

পাথরঘাটার উপযোগী পরিকল্পনা আছে

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সুত্রে জানা গেছে, উপজেলায় ৪০টি খাসপুকুর খননের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে অচল সৌরশক্তিচালিত সাতটি পানির ফিল্টার মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বরগুনা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মির্জা নাজমুল হাসান সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, পাথরঘাটায় সুপেয় পানির সংকট নিরসনে খাসপুকুর খননের সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে বাড়িতে এখন বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে তাঁরা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এ বিষয়ে এলাকায় সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি পানির ট্যাংক দেওয়ার কাজ চলছে।

তবে কেন মিছে খোঁড়াখুঁড়ি

কার্যকর সাশ্রয়ী পরিবেশবান্ধব পদক্ষেপগুলো পাশ কাটিয়ে এলাকার প্রশাসন আর মানুষকে না জানিয়ে ভেল্কি দেখানোর ঝোঁক আমাদের ত্যাগ করতে হবে। এ রকম উচ্চাকাঙ্ক্ষী আর সর্বনাশা হঠকারী তথাকথিত গবেষণার একটা লাগাম টানার সময় এসেছে। প্রায় শূন্য জবাবদিহির দেশে এসব আশা করা হয়তো আরও বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষা। কিন্তু ওই শিশুদের আমরা কী বলব, যাদের স্কুল এখন পরিত্যক্ত হলো। সারা দেশের ছেলেমেয়ে যখন স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পেল, তখন কেন তারা বঞ্চিত থাকবে?

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন