default-image

করোনাকালে নারী ও শিশুর প্রতি যত ধরনের নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে ধর্ষণ ও পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে অঘোষিত লকডাউনের সময় বিপুলসংখ্যক নারী ও শিশু পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছে। এই বছরের প্রথম দুই মাসের বেসরকারি পরিসংখ্যানেও এমনটাই দেখা গেছে। এই প্রেক্ষাপটে আইনের প্রয়োগ জোরালো করতে পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) বিধিমালা ২০১৩ সংশোধনের প্রস্তাবের খসড়া করেছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

ইতিমধ্যে স্থায়ী কমিটির ‘বাল্যবিবাহ ও জেন্ডার সহিংসতা প্রতিরোধ’ সাবকমিটি চারটি বিধিতে সংশোধনীর খসড়া প্রস্তাব তৈরি করেছে। প্রস্তাবে ভুক্তভোগী ব্যক্তির পক্ষে ‘প্রয়োগকারী কর্মকর্তা’র পরিসর ও ক্ষমতা বাড়ানো, মাঠপর্যায়ে মাসিক আলোচনায় পারিবারিক সহিংসতার বিষয় রাখা এবং দেশজুড়ে আইনের প্রয়োগ সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারের কথা বলা হয়েছে।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং বাল্যবিবাহ ও জেন্ডার সহিংসতা প্রতিরোধ সাবকমিটির সদস্য কানিজ ফাতেমা আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, সংশোধনী প্রস্তাবের খসড়া নিয়ে এখন কাজ চলছে। প্রস্তাবগুলোর ওপর বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হবে। মাস দুয়েকের মধ্যে খসড়া চূড়ান্ত করার আশা করা যাচ্ছে। তিনি বলেন, সবাই একসঙ্গে কাজ করলে এই আইনে প্রত্যাশিত সুরক্ষা পাবেন নারীরা।

আইনটির ব্যাপারে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতে, ২০১০ সালে পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইনটি কার্যকর হলেও আইনটি সেই অর্থে ভুক্তভোগী ব্যক্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারছে না। কারণ, আইনটির প্রয়োগ সার্বিকভাবে খুব দুর্বল।

বিজ্ঞাপন

৪টি বিধিতে সংশোধনী প্রস্তাবের খসড়া

খসড়া প্রস্তাবে ভুক্তভোগী ব্যক্তির অভিযোগ নেওয়া ও আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করার জন্য ‘প্রয়োগকারী কর্মকর্তা’র সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছে। বিদ্যমান বিধি ২(ঘ) অনুসারে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা বা সরকারি গেজেট অনুসারে এক বা একাধিক ব্যক্তি ‘প্রয়োগকারী কর্মকর্তা’ নিযুক্ত হন। প্রস্তাব অনুসারে, উপজেলার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আর পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে অধিক্ষেত্র নির্ধারণ করে নিযুক্ত অতিরিক্ত অন্যূন দশম গ্রেডের এক বা একাধিক কর্মকর্তাও ‘প্রয়োগকারী কর্মকর্তা’ হতে পারবেন।


বিধি ৪–এর উপবিধি ১(খ)–এ প্রয়োগকারী কর্মকর্তার দায়িত্বের ক্ষেত্রে ভাষার পরিবর্তন এনে দায়িত্ব পালন কঠোর করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা তাঁর পক্ষে তথ্য প্রদানকারীকে ‘প্রয়োজনে’ সহযোগিতা করার বাক্যটিতে পরিবর্তন এনে ‘প্রয়োজনীয়’ সহযোগিতা যুক্ত করা হয়েছে। এই বিধির উপবিধি ২–এ প্রয়োগকারী কর্মকর্তার ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।


৬(গ) বিধিতে একটি ‘প্রাপ্ত অভিযোগ সম্পর্কে অবিলম্বে প্রয়োগকারী কর্মকর্তাকে অবহিত করা’ বাক্যটি যুক্ত করা হয়েছে সংশোধনী প্রস্তাবে।


১০ নম্বর বিধিতে নতুন করে চারটি উপবিধি যুক্ত করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও মাঠ প্রশাসনের মাসিক সভায় পারিবারিক সহিংসতার বিষয় আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা, প্রয়োগকারী কর্মকর্তাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ রাখা, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে সারা দেশে আইনটির ব্যাপক প্রচার এবং মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাগুলোর ওয়েবসাইটে ফরমগুলো সহজলভ্য রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমীন প্রথম আলোকে বলেন, বিধিতে সংশোধনী আনার পদক্ষেপটি বেশ আশাব্যঞ্জক। আইনটি যে ঠিকভাবে কাজ করছে না, এটা শনাক্ত হয়েছে। আইনটির কার্যকর প্রয়োগের জন্য সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিচারকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। বেশির ভাগ বিচারক বুঝতে পারেন না এ ধরনের ঘটনায় নারীটির জন্য কী ধরনের সুরক্ষাব্যবস্থা দেওয়া প্রয়োজন। এ ছাড়া ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জাতীয় পর্যায়ে ডেটাবেইস আকারে এ আইনে করা মামলাগুলোর তথ্য সংরক্ষণ করা জরুরি।

গত বছরের অক্টোবরে আইনটির প্রয়োগ সম্পর্কে জানতে অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমীন একটি গবেষণা পরিচালনা করেন। এতে ২০ জন ভুক্তভোগী নারী এবং বিচারক, পুলিশ, আইনজীবী, মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা, এনজিওকর্মীসহ মোট ৬০ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। যশোরের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে এই আইনে দেওয়া ৭০টি আদেশ এবং সিলেট, খুলনা, কুষ্টিয়া, বরিশাল ও ঢাকার আদালত থেকে ২০টি মামলা পর্যালোচনা করা হয়। ভুক্তভোগী ২০ জনের মধ্যে ১৯ জনই জানান, তাঁরা আইনি প্রতিকারের বিষয়টি জানেন না। বরিশালের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত জানান, গত ১০ বছরে এই আইনে সেখানে মাত্র একটি মামলা হয়েছে। ওই গবেষণায় উঠে আসে, যতক্ষণ পর্যন্ত না শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের মাত্রা ভয়ংকর হয়ে ওঠে অথবা বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় বা স্বামী আরেকটি বিয়ে করেন, ততক্ষণ পর্যন্ত বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারী কাউকে কিছু না জানিয়ে নীরব থাকেন।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য লুৎফুন নেসা খান প্রথম আলোকে বলেন, আইনটির প্রয়োগ নিয়ে কিছু অসুবিধা আছে। অনেক নারী সামাজিক ও পারিবারিক নানা কারণে অভিযোগ জানাতে আগ্রহী হন না।

করোনাকালে পারিবারিক সহিংসতা বেড়েছে

বেসরকারি সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুসারে, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় করোনাকালে ধর্ষণের পরই সবচেয়ে বেশি পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। গত বছর ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৬২৭ জন নারী ও ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হন ৫৩ জন। একই সময়ে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৫৫৪ জন নারী। এর মধ্যে ৩৬৭ জনের মৃত্যু হয় এবং আত্মহত্যা করেন ৯০ জন। যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হন ২১৮ জন নারী। যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তের শিকার হন ২০১ জন নারী। ২০১৯ সালে পরিবারিক নির্যাতনের শিকার হন ৪২৩ জন নারী। ওই বছর ধর্ষণের শিকার হন ১ হাজার ৪১৩ জন নারী।

এ বছরের প্রথম দুই মাস জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতেও ধর্ষণ ও পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা সবচেয়ে বেশি। এ সময়ে ১৬৪টি ধর্ষণ, এর মধ্যে ৮টি ধর্ষণের পর হত্যা, ৬৪টি পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুক ২০টি এবং যৌন হয়রানির ১৭টি ঘটনা ঘটেছে। পারিবারিক সহিংসতার মধ্যে ৪৮ জন নারীকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে স্বামীর হাতে হত্যার শিকার হয়েছেন ২৯ জন। ১২ জন নিজ পরিবারের সদস্যদের হাতে এবং ৭ জন শ্বশুরবাড়ির লোকজনের হাতে হত্যার শিকার হয়েছেন।

বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) গত বছর অঘোষিত লকডাউনের সময় মে মাসে ৫৩ হাজার ৩৪০ জন নারী ও শিশুর ওপর টেলিফোনিক জরিপ চালায়। জরিপের তথ্য অনুসারে, ৩১ দিনে দেশের ৫৩টি জেলায় ১৩ হাজার ৪৯৪ জন নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে পারিবারিক নির্যাতনই ছিল ১১ হাজার ২৫টি।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন