কৃষি বৈজ্ঞানিকেরা জানান, পাহাড়ে এত দিন বিভিন্ন দেশি-বিদেশি ফল ও সবজি বিচ্ছিন্নভাবে চাষ করা হতো। কিন্তু কোন এলাকায় কোন জাতের ফল ও সবজি উচ্চফলন ও আবহাওয়ার জন্য উপযোগী, তা নির্ণয় করা যেত না। রাইখালী কৃষি গবেষণা কেন্দ্র গুরুত্বের সঙ্গে সেই বিষয়টি বিবেচনায় এনে কাজ করে যাচ্ছে। গবেষণা শেষে জাতীয় বীজ বোর্ডে নিবন্ধনের পর বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের প্রদর্শনী প্লট দেওয়া হয়। তারপর পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশে পাহাড়ি এলাকায় বীজ বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া গবেষণার মধ্যে ফসলের উন্নত জাত উদ্ভাবন ও যথাযথ মূল্যায়নের, উচ্চফলনের জন্য চাষাবাদ নিরূপণ করা হয়।

রাইখালী কৃষি গবেষণা কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, ১৯৫৭ সালে প্লান্ট ইন্ট্রোডাকশন সেন্টার নামে কাপ্তাইয়ের চন্দ্রঘোনা থানায় রাইখালী কৃষি গবেষণা কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। তখন শুধু বিদেশ থেকে আমদানি করা বীজ সংরক্ষণ করা হতো। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে রাইখালী পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ রূপ নেয়। ৯৬ একর জমির ওপর কৃষিবিজ্ঞানীদের নতুন জাতের ফল ও সবজি গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি হয়। ১৯৬৮ সালে থেকে নতুন জাতের ফল ও সবজি উদ্ভাবনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে দীর্ঘদিন গবেষণার পর ২০০২ সালে কেন্দ্রের প্রথম নতুন জাতের বারি ঝারশিম ২ নামে জাতীয় বীজ বোর্ডে সবজি নিবন্ধন করা হয়। ২০০৪ সালে বারি কলা ৩, ২০০৫ সালে বারি কলা ৪, এ ছাড়া বারি আম ৪, বারি ড্রাগন ১, বারি কুল ৪, বারি মিষ্টি লেবু ১, বারি ব্রকলি ১, বারি চিনাল ১, ও বীজবিহীন বারি পেয়ারা ৪–সহ ১৯ বছরে ২০টি ফল ও সবজি নতুন জাত উদ্ভাবন করা হয়। এর মধ্যে ১১টি ফল ও ৯টি সবজি। এসব ফল ও সবজি পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চাষ হচ্ছে। কৃষকেরা সাফল্যও পাচ্ছেন বলে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন। এসব নতুন উদ্ভাবন করা ফল ও সবজি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, হর্টিকালচার সেন্টার ছাড়াও রাইখালী পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রও বীজ ও কলম উৎপাদন করে আসছে। কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের এলাকায় ড্রাগন, পেয়ারা, আমসহ অধিকাংশ ফল কলমের মাধ্যমে চারা তৈরি করা হয়।

default-image

কৃষি বৈজ্ঞানিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাইখালী পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে উদ্ভাবিত নতুন জাতের ফল ও সবজি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও হর্টিকালচার সেন্টারগুলো মাধ্যমে সম্প্রসারণের কাজ করা হয়। নতুন উদ্ভাবন করা ফল ও সবজিগুলো কৃষকদের বিনা মূল্যে বীজ, চারা ও সার দিয়ে পরীক্ষামূলক প্রদর্শনী প্লট দেওয়া হয়। দু-এক বছর প্রদর্শনী প্লটগুলোর ফলন দেখে কৃষকেরা নিজেদের মধ্যে ছড়িয়ে নেন। ইতিমধ্যে উদ্ভাবিত নতুন জাতে ফসল ব্যাপক আলোচনায় এসেছে বলে জানান রাইখালী পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আলতাফ হোসেন। তিনি আরও জানান, ‘রাইখালী পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে ৬৫ জাতের দেশি-বিদেশি ফল ও সবজি রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১৫ জাতের বিদেশি ফল রয়েছে। এখন পাহাড়ে জনপ্রিয় কফি ও কাজুবাদাম নিয়ে গবেষণা চলছে। আশা রাখছি আগামী বছরের মধ্যে জাতীয় বীজ বোর্ডে নিবন্ধন করে চাষাবাদের জন্য ছড়িয়ে দেওয়া যাবে।’

রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলা ঘিলাছড়ির কৃষক অনন্ত চাকমা বলেন, ‘রাইখালী কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে উদ্ভাবন করা ড্রাগন ফল চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছি। প্রতিবছর তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকার ড্রাগন ফল বিক্রি করি। এ ছাড়া বারি শিম, আমসহ বেশ কিছু ফল ও সবজি চাষ করে আসছি। প্রতিবছর ড্রাগন, আমসহ অন্যান্য ফল ও সবজি চাষ করে পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। আমি ছাড়াও আমাদের এলাকায় নতুন উদ্ভাবন করা অন্তত ১০ জন কৃষক নানা ফল ও সবজি চাষ করছেন।’

রাইখালী কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আলতাফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘পাহাড়ে ফল ও সবজি চাষে অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ থাকলেও সঠিক গবেষণার অভাবে ভালো ফলন পাচ্ছিল না। মূলত কৃষকেরা যেন লাভবান হন, সঠিক বীজ ও ফলন পান, সেই কাজটা করছি। কারণ, তিন পার্বত্য জেলার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। আমরা ১৯ বছরের ২০টি ফল ও সবজি জাতীয় বীজ বোর্ডে নিবন্ধন করতে সক্ষম হয়েছি। বেশ কিছু দেশি-বিদেশির ফল গবেষণার কাজ চলছে। খুব কম সময়ের মধ্যে গবেষণার কাজ শেষ করতে পারব। গবেষণার শেষ পর্যায়ে রয়েছে কফি ও কাজুবাদাম।’

রাঙামাটি হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক কাজী মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন উদ্ভাবন করা ফল ও সবজি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে আমরা কৃষকদের প্রথমে প্রশিক্ষণ দিই। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চাষাবাদ, বীজ বপন, সার ও কীটনাশক প্রয়োগের বিষয়ে অবগত করা হয়। পরে পরীক্ষামূলক বিনা মূল্যে প্রদর্শনী প্লট কৃষকদের বরাদ্দ দেওয়া হয়। আমাদের কৃষি কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে চাষ সফল হওয়ার পর কৃষকেরা নিজেরাই বীজ সংগ্রহ করে চাষ করেন। আমরা এখন ২০১৭ সালে উদ্ভাবন করা বীজবিহীন পেয়ারা সম্প্রসারণের কাজ করছি। ২০১৪ সালে ড্রাগন উদ্ভাবনের পর পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক চাষ হচ্ছে।’

রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষ্ণ প্রসাদ মল্লিক বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ফল ও সবজি চাষ করে সারা দেশের চাহিদা মেটানো সম্ভব। সে জন্য দরকার সঠিক গবেষণা ও পরিকল্পনা। কোন অঞ্চলে কোন জাতের ফসল উচ্চফলন হবে, তা নিরূপণ করা গেলে কৃষকেরা লাভবান হবেন। এ ক্ষেত্রে রাইখালী পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র অবদান রাখছে। আমাদের গবেষণায় শুধু রাঙামাটি জেলা থেকে প্রতিবছর অন্তত এক হাজার কোটি টাকার ফল বিক্রি হচ্ছে। সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারের দৃষ্টি বাড়লে এর পরিমাণ আরও বাড়বে। ২০১৯ সাল থেকে রাঙামাটি থেকে ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ায় আম রপ্তানি করা হচ্ছে।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন