বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আবার এমনও পরিবার আছে, যাদের শোক–তাপ করার মানুষটিও প্রাণ হারিয়েছেন একই সঙ্গে। সড়ক ও নৌপথের দুর্ঘটনাতেই এমন নজির বেশি। ২৬ মার্চ রাজশাহীর কাটাখালীতে বাস-মাইক্রোবাস সংঘর্ষের পর একসঙ্গে আগুনে পুড়েছিল ১৭ জন। মাইক্রোবাসের যাত্রীদের কয়লা হওয়া চেহারা চিনতে না পারায় ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে পাঁচজনই বড় রাজাপুর গ্রামের একই পরিবারের সদস্য। বছরের শেষে ২৭ ডিসেম্বর ঢাকার নবাবগঞ্জে আত্মীয়ের লাশ দেখতে যাওয়ার পথে ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ হারানো ইজিবাইকের চার নারীও একই পরিবারের। আরও এক দুর্ঘটনায় একসঙ্গে ১৭ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছিল। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে সেদিন পদ্মার ঘাটে একদল বরযাত্রী অপেক্ষা করছিলেন। বজ্রপাতে প্রাণ হারান ১৭ জন।

default-image

একই পরিবারের সদস্য ছাড়াও আছে একসঙ্গে শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর মর্মান্তিক খবর। বছরের শুরুতে ১০ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় যাত্রীবাহী বাসের দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন কল্লোল আর সনাতনের মতো শিক্ষার্থীরা। এই মাস্টার্স পরীক্ষার্থীরা কেউ সিপাহি, কেউ রাজমিস্ত্রি, তাঁরা বাবার উপার্জনে পড়ছিলেন। এই তো আর কদিন পরেই পরিবারের হাল ধরতেন ছেলেটা। বাস আর ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১২ জনের মধ্যে ৬ জনই ছিলেন শিক্ষার্থী।

সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনার খবর ছিল বছরজুড়ে। আবার হারিয়েও গেছে সেসব। তবে বছরের শেষ দিকে এসে সিটি করপোরেশনের ময়লা ফেলার গাড়িতে শিক্ষার্থীর মৃত্যু নাড়া দিয়েছে সবাইকে। ২৪ নভেম্বর রাজধানীর গুলিস্তানে সিটি করপোরেশনের ময়লা ফেলা গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ হারায় নটর ডেম কলেজের উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র নাঈম হাসান। এ ঘটনায় রাজপথে নেমে এসেছিলেন শিক্ষার্থীরা। এক দিন পরই রাজধানীর বসুন্ধরা সিটির সামনে ঢাকা উত্তর সিটির ময়লার গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ হারান প্রথম আলোর সাবেক কর্মী আহসান কবীর খান। দুজন চালকই ছিলেন অবৈধ।

default-image

নভেম্বরের সপ্তাহটি ছিল সড়ক দুর্ঘটনার খবরে বারবার প্রধান সংবাদ শিরোনাম হওয়ার সময়কাল। ২৯ নভেম্বর রাজধানীর রামপুরায় বাস থেঁতলে দিয়েছিল এসএসসি পরীক্ষার্থী মাঈনুদ্দিন ইসলামকে। চা–বিক্রেতা বাবার এ সন্তানই শুধু লেখাপড়ার স্বপ্নই দেখছিল। সব৴শেষ ২৩ ডিসেম্বর রাজধানীর ওয়ারীতে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ হারান ৬২ বছর বয়সী স্বপন কুমার সরকার। অর্থাৎ এক মাসে রাজধানীতে ময়লার গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ হারান তিনজন। বছরজুড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থীসহ সব বয়সী মানুষের প্রাণহানির খবর বরাবরের মতো উদ্বিগ্ন করেছে পাঠককে।

যে মৃত্যুর খবর গত দুই বছর ধরে অব্যাহত থাকায় সংখ্যাগুলো গুরুত্ব হারিয়েছিল, তা হলো ‘করোনা’। বছরের মাঝামাঝি সময়ে প্রতিদিন প্রাণহানির সংখ্যা ছিল দুই শতাধিক। ২০২১ সালে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা আগস্ট মাসে। ৪ আগস্ট সকাল থেকে ৫ আগস্ট সকাল ৮টা পর্যন্ত সরকারি হিসাবে করোনায় মৃত্যু হয় ২৬৪ জনের। এর এক সপ্তাহ আগে ২৭ জুলাই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রাণহানি ছিল ২৫৮ জনের।

default-image

বছরের মাঝামাঝি অতিমারির এই দাপট প্রতি মুহূর্তে আপনজন কারও হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা গেঁথে দিয়েছিল মানুষের মনে। হাসপাতালে শয্যাসংকট আর দাফনের স্থান না পাওয়া অসহায় পরিবারের স্বজনেরাও জেনেছিলেন, ভয়াবহ মৃত্যুও কত সহজভাবে আসতে পারে যে কারও কাছে। করোনার এই দাপটের মধ্যে বছরের মাঝামাঝি শুরু হয় ডেঙ্গুর প্রকোপ। জুলাই থেকে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে থাকে। দুই মাসের মধ্যে আগস্টের শেষে প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৫০। তখনো হাসপাতালে ভর্তি এক হাজারের বেশি রোগী।

সাময়িক সংকট মানুষকে যৌথতার প্রয়োজন শেখালেও দীর্ঘকালীন বিপদে নষ্ট হয় সহনশীলতা। অসহায় মানুষ বিষণ্ন হয়, নিরীহ নিরন্নও হয়ে উঠতে পারে অপরাধপ্রবণ। অতিমারির পরিবর্তন প্রভাব ফেলেছে সব বয়সীর মধ্যে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা বলছে, আত্মহত্যাপ্রবণতার ক্ষেত্রে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দশম।

default-image

গত ১১ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে গড়ে প্রতিবছর ১৩ থেকে ১৪ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। এ বছর আত্মহত্যার ঘটনা নিয়ে সবচেয়ে বড় ঝড় কলেজছাত্রী মোসারাত জাহান মুনিয়ার মৃত্যু। হত্যা না আত্মহত্যা বিতর্ক শেষ হয়নি এখনো।

গত ২৬ এপ্রিল রাজধানীর গুলশানের একটি বাসা থেকে উদ্ধার হয় মুনিয়ার মরদেহ। ১৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর পরীবাগে দুটি নয়তলা ভবনের মাঝখান থেকে উদ্ধার করা হয় ৩২ বছর বয়সের নারী ইভানা লায়লা চৌধুরীর মরদেহ। একই দিনে উদ্ধার করা হয়েছিল এক শিক্ষকের মরদেহও। তবে আলোচনায় না আসায় এটি হয়ে গেছে বিচ্ছিন্ন ঘটনা।

default-image

ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যুর ঘটনা শুধু আত্মহত্যার ক্ষেত্রেই ঘটেনি। নির্মাণশ্রমিকদের পা ফসকে পড়ে মৃত্যু বা গুরুতর আহত হওয়ার খবর প্রায়ই লিপিবদ্ধ করতে হয়েছে থানার কর্মকর্তাদের। পা ফসকে মৃত্যুর ঘটনা ছাদের পাশাপাশি ঘটছে খাল আর নালায়ও। স্ল্যাবহীন উন্মুক্ত খাল আর নালা এখন মৃত্যুফাঁদ।

২৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরের ডবলমুরিং থানার আগ্রাবাদে রাতে নালায় পড়ে নিখোঁজ হন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্রী সেহেরীন মাহবুব সাদিয়া। ৫ ঘণ্টা পর উদ্ধার হয় ১৯ বছরের মেয়েটির মরদেহ। পাঁচ মাসে চট্টগ্রামে খাল-নালায় পড়ে মৃত্যু হয়েছে পাঁচজনের। একজন এখনো নিখোঁজ। রাজধানীর আজিমপুরে দেয়াল ধসে প্রাণ হারিয়েছিল শিশু জিসান। ২১ অক্টোবর বাথরুমে গিয়ে আর ফিরে আসেনি অঋব অনুসূর্য। মাত্র দশ বছর বয়সের এই সন্তানের মেধায় মুগ্ধ হয়ে বাবা তাকে ডাকতেন ‘বিস্ময় বালক’।

default-image

আর যেসব ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা শুধু বাড়তে থাকে তা হলো ‘আগুন’। সেসব ঘটনায় দু-একজন মানুষের ঘটনাই জানিয়ে দেয়, জীবন কতখানি মূল্যবান ছিল। রাজধানীর মগবাজারে ২৭ জুন গ্যাস বিস্ফোরণে নিহত রাসেল ঠাকুরগাঁও থেকে এসেছিলেন। ২১ বছরের ছেলেটার স্বপ্ন ছিল পরিবারের জন্য আরও একটু সচ্ছলতা এনে দেওয়া। এ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান ১১ জন।

২২ নভেম্বর রাজধানীর মুগদায় গ্যাস বিস্ফোরণ থেকে আগুনে দগ্ধ হওয়া একই পরিবারের চারজনের মধ্যে দুই শিশু ইয়াসিন ও নহরসহ মারা যান তিনজন। ১৪ ডিসেম্বর বগুড়ার সান্তাহারে প্লাস্টিক কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান পাঁচ শ্রমিক।

default-image

তবে আরও এক ধরনের প্রাণহানি লজ্জিত করেছিল গোটা দেশকে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ১৩ থেকে ২০ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রাণ হারায় ৯ জন। বছরজুড়েই ছিল পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর খবর। কখনো একসঙ্গে শিশু সহোদর, কখনো কিশোর-কিশোরী প্রাণ হারিয়েছে গোসল করতে নেমে বা নৌকা থেকে পড়ে। এমনকি বালতির পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে।

সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত মানুষের মরদেহ দুদিন পর ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনা যেমন আছে, তেমনই আবার নিহত সন্তানের পরিচয় দিতে নারাজ অভিভাবকের লাশ না নেওয়ার ঘটনাও উঠে এসেছে গণমাধ্যমে। এমন মৃত্যু বছরজুড়েই ঘটতে থাকে বিচ্ছিন্নভাবে।

default-image

এ বছর ভয়াবহ দুর্ঘটনা ছিল গত বছরের চেয়ে বেশি। যেসব দুর্ঘটনায় নিজের স্বজন পর্যন্ত অক্ষত থাকলেও অপরাধের অংশীদার মনে হয় নিজেকে। তেমন ভয়াবহ ও আকস্মিক দুর্ঘটনা ছিল বছরের প্রথম থেকেই। পাল্লা দিয়ে মৃতের সংখ্যা বাড়ছিল ২৮ জুন বুড়িগঙ্গায় মর্নিং বার্ড লঞ্চ দুর্ঘটনায়। ২১ পুরুষ, ৮ নারী ও ৩ শিশুর মরদেহ উদ্ধার হয় ২৪ ঘণ্টায়। ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় খেলনা নৌকার মতো দুমড়েমুচড়ে যায় মর্নিং বার্ড লঞ্চ। সিসিটিভির ফুটেজে দেখা যায়, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পানিতে হাবুডুবু খেতে খেতে তলিয়ে যাচ্ছে মানুষ। ২৭ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নৌকাডুবির ঘটনায় ২৪ ঘণ্টায় পাওয়া যায় ২২ জনের মরদেহ।

আগুন আর অব্যবস্থাপনার সংযোগে কী ঘটাতে পারে তা বাংলাদেশের সঙ্গে গোটা বিশ্বই দেখেছিল বছরের মাঝামাঝি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের জুস কারখানার আগুনে। ৮ জুলাই সন্ধ্যায় আগুনের দাবানল ছড়িয়ে গেলে আতঙ্কিত মানুষ কতখানি ভয় পেয়ে ছোটাছুটি করেছে, তা কল্পনা করতে পারব না আমরা। শুধু ভাবা যেতে পারে, সারা শরীরে আগুন নিয়ে শেষ মুহূর্তেও তালা খুলতে চেষ্টা করছে মানুষ। ৫১ জন প্রাণ হারিয়েছে। আর আজীবনের জন্য ক্ষত হয়েছে কতজনের সে হিসাব আমরা জানি না।

default-image

২০২১ সাল ক্যালেন্ডারের পাতা গুটিয়ে নিল ভয়াবহ আগুনের ঘটনা সাক্ষী রেখেই। ২৩ ডিসেম্বর ঝালকাঠির সুগন্ধার জলেও জ্বলেছিল আগুন। আড়াই বছরের শিশুকন্যা তাবাসসুমের ছবিটি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আছে। সফেদ জামা পরা ওই শিশুটিকে নিয়ে আগুন থেকে বাঁচতে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন বাবা নাসিরুল্লাহ আর তাঁর স্ত্রী। দুজন বেঁচে আছেন। হাত ফসকে বাবার হাত থেকে পড়ে তলিয়ে গেছে তাবাসসুম। অথবা ধরা যাক নাম না–জানা সেই মা আর সন্তানের কথা, মৃত্যুও যাঁদের পৃথক করতে পারেনি। অঙ্গার হওয়া যুক্ত শরীরেও বোঝা যাচ্ছিল, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সন্তানকে বুকে জাপটে ধরে রেখেছিলেন মা। তাঁদের দাফনও হয়েছে একই কবরে।

সুগন্ধা নদীতে এমভি অভিযান-১০ দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ৪১। বছরজুড়ে ঘটেছে মর্মান্তিক প্রাণহানির সহস্রাধিক ঘটনা। আমরা বছরের শুরুতে আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনার কথা বলছিলাম। এক বছর আগে বাবাকে হারানো সেতুর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল সেই মুহূর্তের কষ্ট এখনো একই রকম আতঙ্কের মনে হয় কি না। চট্টগ্রামে নির্বাচনী সহিংসতায় আজগর আলীর বড় ছেলে সেজান মাহমুদ বছরের শেষ সময়ে জানান, ‘ভয়াবহ ওই মুহূর্তের কথা এক জীবনে আমার পক্ষে ভুলে যাওয়া সম্ভব না।’

default-image

বছরজুড়ে এই ক্ষত ও ক্ষতির হিসাব আমরা হয়তো আবারও করব, নতুন বছর পুরোনো হলে। তরঙ্গ উঠবে, তরঙ্গ মিলাবে। তবে যাঁদের আপনজন চলে গেলেন, তাঁদের কাছে ২০২১ সাল থাকবে এক গাঢ় কালো ছায়া হয়েই।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন