বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ইংরেজ আমলে প্রতিষ্ঠিত গ্রামটির ইতিহাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া একমাত্র শিক্ষার্থী কাজল পাড়ে। ভূমিহীন পরিবারের সন্তান কাজল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র। স্বগোত্রের পিছিয়ে থাকায় তাঁর মনে শান্তি নেই। কাজলের ভাষায়, গ্রামের মেয়েরা মজুরির টাকা বাবার হাতে তুলে দেন। দেনা শোধে অথবা অন্নসংস্থানে সে টাকা কাজে লাগে। কিছু অংশ ছাত্রীদের খাতা-কলম, চুরি-ফিতাসহ ছোটখাটো শখের কেনাকাটায়ও কাজে লাগে। শিশু বয়সে কাজ করতে করতে ওদের হাতের নখ ক্ষয়ে গেছে। পায়ের নখেরও একই অবস্থা। ভালোভাবে দেখলেই বোঝা যায় অপুষ্টিতে ভুগছে ওরা।

৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘কাউকে পিছনে ফেলে নয়, আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠায় নতুন সামাজিক অঙ্গীকারের আহ্বান’। প্রতিপাদ্যটি মনে ধরেছে কাজল পাড়ের। তাই পিছিয়ে থাকা তুরি জনগোষ্ঠীর কথা তুলে ধরতে গ্রামে আমন্ত্রণ জানান তিনি।

গত শনিবার দুপুরে গ্রামে ঢুকতেই দেখা যায়, একটি ছোট বটগাছের ছায়ায় কয়েকজন বয়স্ক মানুষ বসে আছেন। সবচেয়ে বয়স্ক মানুষটির নাম বেংলু সুরেন। বয়স বলতে পারেন না। শুধু বলেন, ‘ললাবতীর (ইলা মিত্র) তেভাগার লড়াই যখুন চলে (১৯৫০), তখুন হামি জুয়ান (যুবক) মানুষ। এখুন বুঝে লাও হামার বয়স কত।’ তিনি জানান, এ গ্রাম ব্রিটিশ আমলের। তাঁদের পূর্বপুরুষেরা এসেছেন ভারতের নাগপুর ও রাঁচি থেকে।

বেংলু সুরেন জানান, গাঁয়ে আর কারামপূজা বা কারাম উৎসব হয় না। তবে পদ্মা দেবী ও মনসা দেবীর পূজা হয়। মাঝেমধ্যে গ্রামের বয়স্করা গাছতলায় একসঙ্গে হলে মাদল-বাঁশি বাজিয়ে বসে বসেই গান করেন।

আলাপ থেকে জানা যায়, ২৬টি পরিবারের মধ্যে এখন মাত্র ২টি পরিবারের সামান্য জমি আছে। স্বাধীনতার আগে ও কিছু পরে জালিয়াত চক্রের কবলে পড়ে জমিজমা হারিয়ে এখান থেকে ৩০-৩৫টি পরিবার দেশান্তরি হয়। এর মধ্যে ছয়টি পরিবার গ্রাম ত্যাগ করেছে ২০০৯ সালের পরে। এ গ্রামের বিমল জেড়ি নামের একজন প্রথম এসএসসি পাস করেন ১৯৮২ সালে। আরেকজন রুপেন জেড়ি ২০০৬ সালে।

কাজল পাড়ে আক্ষেপ করে বলেন, একজন থেকে দুজন হতে ২৪ বছর লেগে যায়। তুরিদের আরও দুটি গ্রাম আছে নওগাঁর পোরশা উপজেলার নোচনাহার ও চাচাইবাড়িতে। এ তিন গ্রাম মিলিয়ে মাধ্যমিক পর্যায়ে নয়জন, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে একজন ও উচ্চশিক্ষায় দুই শিক্ষার্থী আছেন।

বিকেলে গ্রামসংলগ্ন ধানখেতে গিয়ে দেখা যায়, একসঙ্গে জমির আগাছা পরিষ্কারের কাজ করছে গ্রামের কয়েকটি মেয়ে। এদের মধ্যে সখিনা জেড়ি উচ্চমাধ্যমিকে, রঞ্জনা বারোয়ার দশম শ্রেণিতে, মায়া তিরকি, আশা তিরকি ও বর্ষা তিরকি নবম শ্রেণিতে, রিংকি তিরকি অষ্টম শ্রেণিতে, লাবনি জেড়ি ও মোহনা জেড়ি ষষ্ঠ শ্রেণিতে এবং মোহনা জেড়ি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে।

ওদের জিজ্ঞেস করা হয়, কী হতে ইচ্ছা করে। সবাই এর-ওর মুখ-চাওয়াচাওয়ি করে। কিন্তু কিছুই বলে না।

কাজল পাড়ে প্রথম আলোকে বলেন, অন্যদের কাছে স্বপ্নের কথা বলতে ওরা ভয় পায়। এদের বেশির ভাগই এসএসসি পাসের আগে বিয়ে দিয়ে দেবেন মা-বাবা। ঝরে পড়বে তারা লেখাপড়া থেকে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন