পুরান ঢাকার ঐতিহ্যে হবিগঞ্জের ছোঁয়া

ঢাকার ইতিহাস ৪০০ বছরেরও বেশি পুরোনো, তবে এ অঞ্চলে মানুষের বাস আরও আগে থেকে। ইতিমধ্যে সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে ঢাকার অনেক ঐতিহ্য। এরপরও টিকে আছে কিছু জিনিস, তারই একটি বাকরখানি। বাকরখানি পুরান ঢাকার ঐতিহ্য। এটা এখন নতুন ঢাকা এবং ঢাকার বাইরেও দেখা যায়। কিন্তু পুরান ঢাকার ঐতিহ্য বাকরখানির অনেক দোকান মালিক ও বেশির ভাগ শ্রমিকের বাড়িই হবিগঞ্জে।
পুরান ঢাকার বাগডাশা লেন, বেচারাম দেউড়ি, নাজিমুদ্দীন রোড, বেগম বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ১৭টি দোকানের ১২ টির মালিক হবিগঞ্জ জেলার বাসিন্দা। শ্রমিকদের বড় অংশই ওই জেলার। অবশ্য নাজিমউদ্দীন রোডের দুটি দোকানের মালিক এবং শ্রমিক ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাসিন্দা। দেখা গেছে, যেসব দোকানের মালিক হবিগঞ্জের, সেখানকার শ্রমিকেরাও হবিগঞ্জের। আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মালিকাদের দোকানের শ্রমিকেরাও এসেছেন একই জেলা থেকে।
‘কিংবদন্তির ঢাকা’ বইয়ে বলা হয়েছে, ধারণা করা হয়, মুঘল সুবেদার মুর্শিদকুলি খানের পুত্র আগা বাকেরের নাম থেকেই এই বিশেষ ধরনের রুটির নামকরণ। কাশ্মীরের শ্রীনগর থেকে মুঘলরা এই খাবার এ দেশে নিয়ে আসেন বলেও জনশ্রুতি রয়েছে। লোককথা থেকে জানা যায়, মুঘল আমলে মুর্শিদ কুলি খানের ছেলে আগা বাকর খান নর্তকী খানি বেগমের প্রেমে পড়েন। খানি বেগমের জন্য আগা বাকর একপর্যায়ে উজির পুত্রের ছেলের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। লড়াইয়ের কোনো এক মুহূর্তে নাকি নিহত হন খানি বেগম। আগা বাকর খান ও খানি বেগমের প্রেম কাহিনির ইতি ঘটে তখনই। সে সময়কার ঢাকাবাসী তাদের প্রেমকাহিনির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এই রুটির নাম রাখেন বাকরখানি। সে ধারাবাহিকতায় এই বাকরখানি নামের প্রচলন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন প্রথম আলোকে বলেন, বাকরখানির ইতিহাস ৩০০ বছরের। বাকরখানি তৈরিতে হবিগঞ্জের লোক জড়িত থাকার কারণ হিসেবে বলেন, প্রথম থেকে হবিগঞ্জের লোক জড়িত ছিল, তাই এর অধিকাংশ দোকান মালিক ওই অঞ্চলের। এভাবে তাঁরা তাঁদের ছেলে, ভাই, স্বজনদের নিয়ে আসেন। পুরান ঢাকার লোকেরাও এক সময় এর উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মানুষের কাজের ক্ষেত্রের পরিবর্তন হচ্ছে, তাই হয়তো এখন আর তাদের এ পেশায় দেখা যায় না।
হবিগঞ্জের জব্বার মিয়া বলেন, পাকিস্তান আমলে লালবাগে হাজি করিম পুরান ঢাকার এক ব্যবসায়ীর বাকরখানির তিনটি দোকান ছিল। তাঁর ব্যবসাও ছিল রমরমা। এখন আর সেই দোকানগুলো নেই। তাঁর মতে, এ কাজে অনেক পরিশ্রম করতে হয়, অনেক ধৈর্যের প্রয়োজন হয়। পুরান ঢাকার মানুষ অনেক শৌখিন। এ জন্য এই কাজ করেন না।
পুরান ঢাকার সিদ্দিক বাজার, আলু বাজার, নয়া বাজার, রায়সাহেব বাজার, দয়াগঞ্জ, নাজিম উদ্দিন রোড, লালবাগে বাকরখানির দোকান বেশি দেখা যায়। এ ছাড়া এখন নতুন ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়ও বাকরখানির দোকান দেখা যায়। বাগডাশা লেনের দোকান মালিক মো. মোশাহিদের বাড়ি হবিগঞ্জ জেলার লাকাই থানার জিরম মানফু গ্রাম। বড় ভাইয়ের মাধ্যমে তাঁর ঢাকায় আসা। বড় ভাই এক সময় একটি দোকানে কাজ করত। পরে সে নিজেই বাকরখানির একটা দোকান দেন।
শ্রমিক রেজওয়ান আহমেদের বাড়িও হবিগঞ্জে। ঢাকায় এসেছেন পাঁচ মাস হয়েছে। বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের হাল ধরার মতো কেউ ছিল না। তাই পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী হিসেবে ১০ বছর বয়সে খালাত ভাইয়ের মাধ্যমে এ পেশায় আসা।
মো. হাসিবুর রহমান দীর্ঘ আট-দশ বছর যাবৎ একাজের সঙ্গে জড়িত। তবে সব সময় ঢাকায় থাকেন না। যখন গ্রামে ধান কাটার সময় হয়ে তখন চলে যান। আর যখন গ্রামে কোনো কাজ থাকে না তখন আবার আবার ঢাকায় বাকরখানির দোকানে কাজ শুরু করেন।
বেচারাম দেউড়ির দোকান মালিক মো. নাজিম মিয়া হবিগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে বাকরখানি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন ১৯৮৮ সালে। বড় ভাই তাঁকে নিয়ে আসেন।
বেগম বাজার এলাকায় দোকানের শ্রমিক মাসুম মিয়া, শাহীন আলম, মো. বুলুর বাড়িও হবিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায়। তাঁরা জানান, তাদের কেউ বড় ভাই, কেউ বাবা, কেউ আত্মীয়-স্বজনের ধরে এ কাজে এসেছেন।
হবিগঞ্জের আলী আকবর (৬০) প্রথম আলোকে বলেন, তিনি এখানে কাজ করেন, নয়-দশ মাস হয়েছে। এর আগে বিভিন্ন দোকানে কাজ করেছেন। যেখানে টাকা বেশি দেয়, সেখানেই কারিগর হিসেবে কাজ করেন।
তবে দিন দিন এর চাহিদা বাড়ছে। আগে দোকান অনেক কম ছিল। এখন দোকানের সংখ্যাও বাড়ছে। এখন বিভিন্ন জেলাতেও বাকরখানির দোকান দেখা যায়। তবে বাকরখানি অন্যান্য সময়ের তুলনায় শীতের সময় বেশি খায়। গরম কালে ব্যবসা কিছুটা মন্দা থাকে।
পুরান ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দা সুলতান আহমেদের (৫৫) বলেন, বাকরখানি তারা সকাল, বিকেল ও সন্ধ্যায় চা দিয়ে খান। মাংস, দুধ, দিয়ে খেতেও বাকরখানি তুলনা হয় না। বাকরখানির দোকানগুলোর অধিকাংশের মালিক ও শ্রমিক হবিগঞ্জ জেলার কেন এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা আমরা বলতে পারি না। আমাদের বাবা-দাদারা বলতে পারবেন।