বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

শুধু ওই দুটি প্রকল্পই নয়, মন্ত্রণালয়ের চলমান ২২টি প্রকল্পের হাল একই রকম। কোনোটিই সময়মতো শুরু করা যায়নি। ফলে বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের অর্থ ব্যয় হয়েছে সামান্যই। প্রকল্প সময়মতো শুরু ও শেষ না হওয়া রীতিমতো রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২১–২২ অর্থবছরে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ২২টি প্রকল্পের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ ৮১৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সব৴শেষ ২০২১ সালের জুলাই থেকে এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৯ শতাংশ।

গোড়ায় গলদ

ঠিক কী কী কারণে প্রকল্প সময়মতো শুরু ও শেষ করা যায় না, সেই উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেল, প্রকল্পগুলোর কেনাকাটা থেকে শুরু করে প্রকল্প পরিচালকসহ জনবল নিয়োগ সুনির্দিষ্ট না করে তা এডিপিভুক্ত করে ফেলা হয়। এসব প্রকল্প পরে সংশোধন করে পাস করাতে বছর লেগে যায়। অনেক সময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মনে করেন, তাঁর ঘনিষ্ঠ লোক পদে থাকা অবস্থায় প্রকল্প জমা দিলে সহজে পাস হয়ে যাবে। ফলে তাড়াহুড়া করে প্রকল্প তৈরি করে পাস করিয়ে ফেলেন। পরে সেই প্রকল্পে অনেক ত্রুটি ধরা পড়ে। ত্রুটি সংশোধন করে পুরো প্রক্রিয়া মেনে আবার পাস করাতে সময় নষ্ট হয়। নির্মাণসংক্রান্ত প্রকল্পগুলোতে সময় বাড়লে ব্যয়ও পাল্লা দিয়ে বাড়ে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পগুলোতে ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক পাল্টে যায়। আরেকজন এসে কাজ বুঝে নিতে নিতে কয়েক মাস চলে যায়। এ মন্ত্রণালয়ে সচিবেরও ঘন ঘন পরিবর্তন হয়। গত তিন বছরে তিনজন সচিব নিযুক্ত হয়েছেন। সবচেয়ে বড় বিষয়, প্রকল্পগুলো সময়মতো শুরু ও শেষ করতে না পারা নিয়ে কারও কোনো জবাবদিহি করতে হয় না।

আইএমইডির সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামান প্রথম আলোকে বলেন, সব প্রকল্পে সময় লাগছে তা নয়। অবকাঠামোগত প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণের সমস্যা থেকে প্রকল্পে সময় লেগে যায়। শুরুতে ভূমির জন্য যে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়, তা বেড়ে যায়। প্রশিক্ষণের প্রকল্পের ক্ষেত্রে গত দুই বছর ধীরগতির কারণ হচ্ছে করোনা।

অথচ প্রকল্পের গুরুত্ব অনেক

সাতক্ষীরা মহিলা কলেজে বাংলায় মাস্টার্স করছেন হাফিজা খাতুন। গত ১৭ এপ্রিল সাতক্ষীরা সদর উপজেলা পরিষদের সামনে সুলতানপুরে অবস্থিত তথ্যকেন্দ্রে গিয়েছিলেন অনলাইনে চাকরির আবেদন ফরম পূরণ করতে। ‘তথ্য আপা: ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির মাধ্যমে মহিলাদের ক্ষমতায়ন প্রকল্প (২য় পর্যায়)’–এর আওতায় তিনি সেখানে বিনা মূল্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পান। মুঠোফোনে প্রথম আলোকে হাফিজা খাতুন বলেন, তিনিসহ তাঁর অনেক সহপাঠী তথ্যকেন্দ্র থেকে সমবায় অধিদপ্তরের প্রশিক্ষক পদে চাকরির আবেদন করেছেন। তাঁরা সেখানে ইন্টারনেটসহ কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ পান।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ‘তথ্য আপা’ হীরা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিদিন ৮–১০ জন নারী এ প্রকল্প থেকে তথ্যকেন্দ্রে এসে সেবা নেন। এ ছাড়া গ্রামে গ্রামে মাসে চারটি উঠান বৈঠক হয়। সেখানে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, জেন্ডার সমতা, নারী ও শিশু নির্যাতন রোধ, সরকারি তথ্য পাওয়ার অধিকারসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক তথ্য জানানো হয় উপকারভোগীদের।

তুলনামূলক গতিশীল এই প্রকল্পটির মেয়াদ ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের জুন মাস পর্যন্ত। গত বছরের জুন মাস পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি প্রায় ৪৩ শতাংশ। তবে অভিযোগ রয়েছে, উঠান বৈঠকে সচেতনতামূলক কার্যক্রমে শুধু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ (ইউএনও) উপজেলার সরকারি কর্মকর্তারাই আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে থাকেন। তাঁরা মোট সম্মানী পান ৫ হাজার ৭০০ টাকা। এর মধ্যে ইউএনও ১৫০০ টাকা, বিশেষ অতিথি ১২০০ টাকা, একজন তথ্য কর্মকর্তা ১০০০ টাকা, দুজন সহকারী তথ্য কর্মকর্তা ৭৫০ টাকা করে ১৫০০ টাকা এবং একজন অফিস সহায়ক ৫০০ টাকা পান।

বেতনভোগী সরকারি কর্মকর্তাদেরই আবার বক্তা হিসেবে সম্মানী নেওয়ার বিষয়ে স্থানীয় বিশিষ্টজন অনেকের অসন্তোষ রয়েছে। এমন একজন প্রথম আলোকে বলেন, কালেভদ্রে বাইরের বক্তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয় উঠান বৈঠকে। তিনিও একবার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে কোনো সম্মানী দেওয়া হয়নি।

সাতক্ষীরা পৌরসভার কিশোর–কিশোরী ক্লাবটি রসুলপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবস্থিত। ক্লাবের আবৃত্তির শিক্ষক রাফিয়া পারভীন প্রথম আলোকে বলেন, ২০ জন ছাত্রী ও ১০ জন ছাত্র বৃহস্পতি ও শুক্রবার আবৃত্তি, গান ও কারাতে শেখে। ‘কিশোর–কিশোরী ক্লাব স্থাপন (১ম সংশোধিত)’ প্রকল্পটির মেয়াদ ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত। গত বছরের জুন পর্যন্ত এ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৩ শতাংশ। তবে প্রকল্প–সংশ্লিষ্টরা বলেন, করোনার কারণে ক্লাব বন্ধ ছিল। তাই শিক্ষকেরা পারিশ্রমিক পাননি বলে আর্থিক অগ্রগতি কম। দেশজুড়ে প্রতিটি ইউনিয়নে ক্লাব স্থাপনের কাজ ৬০ শতাংশের বেশি হয়েছে।

চলমান প্রকল্পগুলোর অবস্থা

সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) অনুসারে, ২০২১-২২ অর্থবছরে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ৬টি, মহিলা ও শিশুবিষয়ক অধিদপ্তরের ৯টি, জাতীয় মহিলা সংস্থার ৪টি এবং জয়িতা ফাউন্ডেশন বাস্তবায়নাধীন ২টি প্রকল্পসহ মোট ২১টি প্রকল্প পর্যালোচনা করেছেন এই প্রতিবেদক। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সামাজিক সুরক্ষা (কারিগরি সহায়তা খাত) বিষয়ে ২৫৫ কোটি ১ লাখ টাকার ৫টি প্রকল্প ২০২১ সালের জুন মাস পর্যন্ত ব্যয় করতে পেরেছে মাত্র ১৭ শতাংশ। এ ছাড়া সামাজিক সুরক্ষার অপর প্রকল্প (বিনিয়োগ খাত) নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টি সেক্টরাল প্রোগ্রাম (৪র্থ পর্ব)–এর ব্যয় হয়েছে ৭০ শতাংশ। এটির মেয়াদ শেষ হবে এ বছরের জুন মাসে।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক অধিদপ্তরের ৮টি প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ২৭ শতাংশ। এর মধ্যে ‘মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলায় মহিলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কাম হোস্টেল নির্মাণ প্রকল্প’–এর মেয়াদ এ বছরের জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। গত জুন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি মাত্র ১ শতাংশ।

আরএডিপিতে সাধারণ সরকারি সেবা খাতে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের ‘ন্যাশনাল রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম’ দুই দফা সংশোধনের পর মেয়াদ ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত। ৩৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রকল্পে জুন মাস পর্যন্ত কোনো ব্যয় হয়নি। দুর্যোগকালে নারীদের উদ্যোগী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে নেওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হয়েছে বলে জানান প্রকল্পটির পরিচালক মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের যুগ্ম সচিব মনোয়ারা ইশরাত। তিনি বলেন, প্রকল্প অনুমোদন হয়ে আসতে এক বছর চলে গেছে। এখন ব্যয় হচ্ছে। খুলনা, কক্সবাজার, সাতক্ষীরা, কুড়িগ্রাম ও শেরপুরের ২টি করে ১০টি জেলায় মৌমাছি, চিংড়ি চাষ, সার বানানো ইত্যাদি বিষয়ে ২ হাজার ৭০০ নারীকে প্রশিক্ষণ ও ১৫ হাজার টাকা করে (৪ কোটি টাকা) সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

জাতীয় মহিলা সংস্থার চারটি প্রকল্পে গত বছরের জুন মাস পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৩৩ শতাংশ।

প্রকল্পটি বাতিল হওয়ার পথে

মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের ‘নার্সিং বিষয়ে মহিলাদের জন্য ঢাকায় কমিউনিটি নার্সিং ডিগ্রি কলেজ স্থাপন’ প্রকল্পটি ২০১৭ সালে শুরু হয়ে গত বছরের ৩০ জুন শেষ হওয়ার কথা ছিল। মেয়াদ শেষ হলেও প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি নেই। ২২ কোটি ১২ লাখ টাকার মধ্যে গত বছরের জুন মাস পর্যন্ত ২৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে, যা মোট ব্যয়ের ১ শতাংশ মাত্র। তবে কাগজেকলমে প্রকল্পে ২৬ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে কোনো ব্যয় হয়নি বলে দাবি করেছে মহিলা অধিদপ্তর।

অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে রাজধানীর মগবাজারের ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালের সঙ্গে যৌথভাবে অধিদপ্তর প্রকল্পটি নেয়। ছয়তলা ভিতের ওপর ছয়তলা ভবনের হিসাব কষে ব্যয় ধরা হয়। একপর্যায়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতবিরোধে প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব থেকে সরে আসেন। অনেক দিন কোনো প্রকল্প পরিচালক ছিলেন না। নতুন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া জমিতে ৯ তলা ভবন করার সিদ্ধান্ত হয়। এর ফলে নকশা প্রণয়ন ও খরচ পুনর্নির্ধারণসহ নানা কিছুতে পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। খরচ আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ধরার সিদ্ধান্ত হয়। তবে সরকার গণপূর্ত অধিদপ্তর দিয়ে ভবন নির্মাণের কাজ করাতে চাইলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাতে আপত্তি জানায়। সব৴শেষ, প্রকল্পটি বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে অধিদপ্তর।

জবাবদিহি দরকার

সরকারি কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি, সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়নের লক্ষ্যে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি (এপিএ) চালু করেছে সরকার কয়েক বছর আগে।

প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে এপিএর বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পগুলোর কাজ সময়মতো শুরু ও শেষ না হওয়া একটা রীতিতে পরিণত হয়েছে। দুই বছরের কাজ আট বছরে শেষ হলে, এক টাকার কাজ চার টাকায় শেষ হলেও আমরা খুশি হই। এ ধরনের অব্যবস্থাপনা সহ্য করার শক্তি আমাদের বেড়ে গেছে। এ সংস্কৃতি বদলাতে হবে।’

তিনি বলেন, অর্থের অভাবে প্রকল্প চলছে না তা তো নয়। উল্টো সময়মতো অর্থ ব্যয় করতে পারে না। এসব সমস্যা সমাধানে বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্প নিতে হবে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত কি না, কখন, কোথায়, কী কাজের জন্য খরচ করতে হবে তা নির্দিষ্টভাবে তুলে ধরে নকশা তৈরি করতে হবে। এডিপিভুক্ত হওয়ার পর এসব বিষয় ঠিক করতে গেলেই সময়ক্ষেপণ হয়। আর প্রকল্প পরিচালকসহ নিবেদিতপ্রাণ লোকজন লাগবে।

জাহিদ হোসেনের মতে, কর্ণফুলী টানেল, পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেল প্রকল্পের চেয়ে নারী ও শিশুদের জন্য নেওয়া প্রকল্প কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ছোট প্রকল্প মনে করা হলেও এসব প্রকল্পের বিষয়ে স্থানীয় লোকজনের আগ্রহ অনেক বেশি।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন