default-image

জনবহুল দেশ হওয়া সত্ত্বেও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সাফল্য আছে। একজন মা এখন গড়ে দুটি সন্তানের জন্ম দেন। ৫০ বছর আগের মায়েরা গড়ে ছয়টি সন্তানের জন্ম দিতেন। সন্তান জন্ম দেওয়ার হার কমে যাওয়ার সুফল পাচ্ছে বাংলাদেশ।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার সময় দেশের প্রধান সমস্যা ছিল জনসংখ্যা ও দারিদ্র্য। বাংলাদেশ এ দুটি ক্ষেত্রেই সাফল্য দেখিয়েছে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাফল্য এসেছে মূলত মোট প্রজনন হার বা টোটাল ফার্টিলিটি রেট (টিএফআর) কমাতে পারার কারণে। এর ফলে নারী শিক্ষার সুযোগ বেশি পাচ্ছে, উপার্জনে বেশি সময় দিতে পারছে।

জনসংখ্যাবিদেরা বলছেন, প্রজননক্ষম নারীর সারা জীবনে (সাধারণত ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়স পর্যন্ত) সন্তান জন্ম দেওয়ার সংখ্যাই টিএফআর। যেসব দেশ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বা জনসংখ্যা কমাতে চায়, তাদের অন্যতম লক্ষ্য থাকে টিএফআর কমিয়ে আনা।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ ক্রমাগতভাবে টিএফআর কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে টিএফআর ছিল ৬ দশমিক ৯। অর্থাৎ ওই সময় বাংলাদেশের একজন মা গড়ে প্রায় সাতটি সন্তানের জন্ম দিতেন। ১৯৮১ সালে টিএফআর কমে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ২-এ। এরপর তা আরও কমতে থাকে। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে টিএফআর ২। যদিও সর্বশেষ বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ বলছে, টিএফআর এখন ২ দশমিক ৩।

দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭৩-১৯৭৮) জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ১৯৭৬ সালে দেশে প্রথম জনসংখ্যা নীতি প্রণয়ন করা হয়। এরপর সব কটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জনসংখ্যাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ ছাড়া স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচিতেও এ বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জনসংখ্যা নীতিও একাধিকবার হালনাগাদ করা হয়।

বিজ্ঞাপন
default-image

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাঠকর্মীদের পাশাপাশি গণমাধ্যম জন্মনিয়ন্ত্রণ বিষয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। এর সঙ্গে সারা দেশে যুক্ত ছিল ছোট-বড় বহু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা এনজিও। ছোট পরিবার, সুখী পরিবার—এই প্রচারণা ব্যাপকভাবে চলেছিল। ছেলে হোক মেয়ে হোক, দুটি সন্তাই যথেষ্ট—এই স্লোগানও ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল। স্বাধীনতার সময় সক্ষম দম্পতিদের ৮ শতাংশ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করত, এখন সেই হার বেড়ে ৬২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়ন কম সন্তান নেওয়ার পক্ষে কাজ করেছে। মানুষ অর্থনৈতিক অগ্রগতির কথা ভেবে পরিবার ছোট করেছে। ’

পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশ্বব্যাংক বলছে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের টিএফআর ছিল ৬ দশমিক ৬। অর্থাৎ বাংলাদেশের চেয়ে পাকিস্তানের টিএফআর কম ছিল। বর্তমানে পাকিস্তানের টিএফআর ৩ দশমিক ৫। অর্থাৎ বাংলাদেশের চেয়ে বেশি।

শুধু অর্থনীতি নয়, টিএফআর নারীর স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। নারী স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রওশান আরা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘সন্তান কম হওয়ায় নারী কাজের সুযোগ বেশি পাচ্ছে, শিক্ষার সুযোগ বেশি পাচ্ছে। বারবার সন্তান ধারণ, সন্তান জন্মদান ও সন্তান প্রতিপালনের যে স্বাস্থ্যঝুঁকি, তা আগের চেয়ে কমেছে। টিএফআর কমে যাওয়ার কল্যাণমূলক সুবিধা বাংলাদেশের নারীরা ভোগ করতে পারছে।’

তবে বাংলাদেশের সব এলাকায় টিএফআর সমান নয় বা সমানভাবে কমেনি। সিলেট, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ বিভাগে টিএফআর বেশি।

সরকারি হিসাব বলছে, দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। টিএফআর আরও কমানো সম্ভব হলে দেশের ওপর জনসংখ্যার চাপ বাড়বে না। বাংলাদেশে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়েছিল মূলত টিএফআর কমানোর মাধ্যমে। কিন্তু গত এক দশকে সেই অগ্রগতি কিছুটা থেমে আছে। ২০১১ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত টিএফআর কমছে না বা খুব সামান্য কমছে। অধ্যাপক রওশান আরা বেগম বলেন, ‘দেশে বাল্যবিবাহ অনেক বেশি। আবার কম বয়সী নারীদের মধ্যে টিএফআর বেশি।’ অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বর্তমান সমস্যাগুলো সকলের জানা। পিছিয়ে পড়া এলাকা বা বিশেষ জনগোষ্ঠীভিত্তিক জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি নিতে হবে। জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর অপূর্ণ চাহিদা দূর করতে হবে।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন