বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা অর্থনীতি সমিতির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান মুক্তিযুদ্ধের আগে দেশের মানুষের সঙ্গে করা অঙ্গীকারগুলো স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি দেশের অগ্রগতি নিয়ে যেমন কথা বলেন, তেমনি তুলে ধরেন ব্যর্থতার দিকগুলোও।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শোষণমুক্ত সমাজের ধারণা থেকে দেশ অনেক দূরে সরে গেছে উল্লেখ করে রেহমান সোবহান বলেন, দেশে শাসনব্যবস্থা এখন অন্যায্য হয়ে উঠেছে। কীভাবে, তা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, দেশে নিয়মকানুন বা আইন সবই আছে। কিন্তু তা সবার বেলায় একই রকমভাবে প্রয়োগ হয় না। তিনি উল্লেখ করেন, স্বাধীনতাসংগ্রামে জাতির কাছে এসব অঙ্গীকার করা হয়েছে। ফলে এসব রক্ষার প্রয়োজনীয়তা আছে।

রেহমান সোবহান বলেন, ২০৪১ সালের মধ্যে জাতি উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার যে স্বপ্ন দেখছে, তা পূরণে জনগণের অকুণ্ঠ ভোটে জনপ্রতিনিধিদের নির্বাচিত হতে হবে। তাঁর মত, ‘এখন নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে, এই লক্ষ্যে আমরা কত দূর অগ্রসর হয়েছি বা সে জন্য আমাদের কী করতে হবে।’

অবশ্য শুধু অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই যথেষ্ট নয় বলেও উল্লেখ করেন রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, কারা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। সব স্তরেই ব্যবসায়ীরা এখন জনপ্রতিনিধিত্ব করছেন। প্রায় ৭০ শতাংশ সাংসদ ব্যবসায়ী। বাকিদেরও হয়তো ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্ক আছে। অথচ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সব স্তরের মানুষের প্রতিনিধিত্ব থাকার কথা, বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণির। তিনি আরও বলেন, ‘এঁরা এত এত টাকা খরচ করে সংসদে যাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই এই বিনিয়োগের লভ্যাংশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করবেন। তবে বঙ্গবন্ধুর সময় যাঁরা রাজনীতি করতেন, তাঁদের এত টাকা ছিল না। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও খুনোখুনি হচ্ছে। কারণ, পরিষদের সদস্য হওয়া খুবই লাভজনক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

বঙ্গবন্ধু শুধু বিদেশি শাসকদের হাত থেকেই জাতিকে স্বাধীন করতে চাননি, দেশীয় শোষকদের হাত থেকেও মুক্ত করতে চেয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’—বঙ্গবন্ধু এই কথার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার বার্তা পরিষ্কারভাবেই দিয়েছেন। স্বাধীনতা জাতি পেয়েছে। কিন্তু মুক্তির সংগ্রাম অনেক জটিল বিষয়।

রেহমান সোবহান বলেন, ‘স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্জন অনেক। পাকিস্তানকে আমরা প্রায় সব সূচকেই ছাড়িয়ে গেছি। কিন্তু সমাজে বৈষম্য বেড়েছে এবং রাজনীতির পরিবেশ অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি। এই বিষয়গুলো জাতির আমলে নিতে হবে।’

অর্থনীতি সমিতির এই দ্বিবার্ষিক সম্মেলনের প্রথম দিনে গতকাল সংগঠনের সভাপতি অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাতকে অর্থনীতি শাস্ত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে মুজিব স্বর্ণপদক দেওয়া হয়।

আবুল বারকাত বলেন, বঙ্গবন্ধু একই সঙ্গে স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামের কথা বলেছেন। কিন্তু দেশে স্বাধীনতা এলেও মুক্তি আসেনি। মুক্তির বিষয়টি অনেক জটিল। সে জন্যই বোধ হয় বঙ্গবন্ধু মুক্তির প্রসঙ্গ পরে উল্লেখ করেছেন।

বঙ্গবন্ধুর সমাজতান্ত্রিক চেতনা থেকে জাতি অনেক দূরে সরে গেছে উল্লেখ করে আবুল বারকাত বলেন, এখন সবকিছু বাজার ও বেসরকারি খাতনির্ভর হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ীদের প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথের একটি মন্তব্য উদ্ধৃত করেন তিনি। সেটি এ রকম—ব্যবসায়ীরা কদাচিৎ একত্র হন, আর কখনো যদি একত্র হন, তাহলে সম্ভাষণের পরে একটি বিষয় সঙ্গে নিয়ে বাড়ি যান, তা হলো দাম বাড়ানোর কূটকৌশল।

দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বিভিন্ন দিক নিয়ে আরও আলোচনা করেন আবুল বারকাত। তবে তাঁর আক্ষেপ, দেশে একসময় কৃষি সংস্কার নিয়ে অনেক আলোচনা হতো। রেহমান সোবহান তাঁর যুগে কৃষি সংস্কারের বিষয়ে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ ছিলেন। তিনি (আবুল বারকাত) এ নিয়ে কলম ধরেছেন। কিন্তু তারপর এ নিয়ে আর কেউ কথা বলে না।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির এই সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর গতকাল বিভিন্ন কর্ম-অধিবেশনে অর্থনীতিবিদেরা উপস্থাপনা তুলে ধরেন। আজ শনিবার সম্মেলনের শেষ দিন। এদিন সকালে সাধারণ সভার পর সমিতির নতুন পর্ষদ বেছে নেওয়ার ভোট গ্রহণ হবে। এ ছাড়া দিনব্যাপী বিভিন্ন অধিবেশনে অর্থনীতিবিদেরা উপস্থাপনা তুলে ধরবেন।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন