default-image

দেশের সর্বোচ্চ আদালত এক রায়ে বলেছেন, যখন কোনো অঙ্গীকার/প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে কোনো চেক ইস্যু করা হয়, তখন ওই প্রতিশ্রুতি যদি পূরণ না হয়, তাহলে চেকদাতার টাকা পরিশোধের কোনো বাধ্যবাধকতা থাকবে না। এমন ক্ষেত্রে চেক গ্রহীতার চেকে উল্লিখিত ওই অর্থ দাবি করার অধিকার তৈরি হয় না।

জনৈক আবুল কাহের শাহিন নামের এক ব্যক্তির করা আপিল খারিজ করে আপিল বিভাগের দেওয়া রায়ে এমন অভিমত এসেছে। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ ওই রায় দেন। সম্প্রতি ২০ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়।

আদালতে আপিলকারীর পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী। জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর ভাতিজা ইমরান রশিদ চৌধুরীর পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মওদুদ আহমদ।

রায়ের শেষাংশে বলা হয়, যেখানে কোনো অর্থ প্রদানের অঙ্গীকার/প্রতিশ্রুতি কোনো পরিপূরক ঘটনা বা অন্য কোনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ওপর নির্ভরশীল ও এর ভিত্তিতে যদি প্রতিশ্রুত অর্থ প্রদানের জন্য কোনো চেক দেওয়া হয়, কিন্তু ওই প্রতিশ্রুতি পূরণ না হলে সে ক্ষেত্রে চেক প্রদানকারীর ওপর চেকে উল্লেখিত অর্থ প্রদানের কোনো বাধ্যবাধকতা থাকবে না। চেক গ্রহীতার পক্ষে চেকে উল্লেখিত ওই অর্থ দাবি করার অধিকার তৈরি হয় না। এই ক্ষেত্রে অর্থ প্রদান বন্ধের নির্দেশনায় বিবাদী (ইমরান রশিদ চৌধুরী) অসততা বা প্রতারনা জন্য দায়ী হতে পারেন না। ফলশ্রুতিতে বিবাদীকে আইনের ১৩৮ ধারার অধীন সংঘঠিত অপরাধে শাস্তির প্রশ্ন আসে না। যে কারণে আপিল বিবেচনার দাবি রাখে না। তাই আপিল খারিজ করা হলো।

বিজ্ঞাপন

আপিলকারীর আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, এ রায়ের ফলে চেক ডিজঅনারের মামলাকারীকে আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি সত্যিকারের পাওনাদার।

আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি মঙ্গলবার হাতে পেয়েছেন বলে জানান ইমরান রশিদ চৌধুরীর অন্যতম আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মাহমুদ। বুধবার তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে চেক ডিজঅনারের মামলায় চেকদাতার দায় এড়ানোর সুযোগ খুবই সীমিত ছিল। এ রায়ের ফলে চেকগ্রহীতার টাকা পাওয়ার কোনো বৈধ কারণ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হলো। সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যদি দেখা যায় চেকটি দেওয়ার কোনো বৈধ কারণ নেই বা চেক দেওয়ার ক্ষেত্রে যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তা পূরণ হয়নি, তাহলে ওই চেকের ওপর চেক গ্রহীতার অধিকার জন্মাবে না। এমন ক্ষেত্রে চেক ডিজঅনার হলে চেকদাতাকে দোষী সাব্যস্ত হবে না।

বিজ্ঞাপন

ইমরানের আইনজীবীর তথ্যমতে, জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার প্রয়াত হুমায়ূন রশিদ চৌধুরীর ছোট ভাই, সাবেক কূটনীতিক কায়সার রশিদ চৌধুরীর স্ত্রী (মৃত) সামছি খানমের মালিকানাধীন নর্থ গুলশানের ৩০ কাঠা জমি ১৯৭৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সম্পাদিত ইজারা চুক্তি মূলে আমেরিকান দূতাবাসকে ১১০ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। ওই ইজারা চুক্তি নিবন্ধন (রেজিস্ট্রি) হয়নি এবং বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে সামছি খানমের উত্তরাধিকারীরা (ইমরান রশিদ চৌধুরী, পারভেজ রশিদ চৌধুরী ও জিনাত রশিদ চৌধুরী) জমিটি বিক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেন। আবুল কাহের শাহিন নামের এক ব্যক্তি ইমরান রশিদ চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, জমিটির বাজারমূল্য ১৫০ কোটি এবং এই মূল্যে তিনি তা বিক্রি করে দিতে পারবেন।

ইমরানের আইনজীবীর তথ্য অনুসারে, ওই আশ্বাসের ভিত্তিতে ২০১২ সালের ১৩ মার্চ শাহিনের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি হয়। চুক্তির শর্ত অনুসারে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বাজারমূল্যে জমিটি বিক্রি করে দেওয়া এবং এ জন্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে শাহিন ১৩ শতাংশ টাকা পাবেন বলা হয়। তখন ইমরান রশিদ চৌধুরী নিরাপত্তা জামানত হিসেবে পোস্ট ডেটেড (ভবিষ্যতের তারিখ উল্লেখ করে দেওয়া) ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকার চারটি চেক আবুল কাহেরের নামে ইস্যু করেন। তবে ৯০ দিন পার হওয়ার পরও শাহিন বাজার মূল্যে ক্রেতা যোগাড় করতে ব্যর্থ হন। চুক্তি অকার্যকর হয়ে যায়। ২০১২ সালের ১৬ আগস্ট জমিটির ইজারা গ্রহীতা আমেরিকান দূতাবাসের সঙ্গে মালিকেরা বায়না চুক্তি করেন এবং শেষ পর্যন্ত ২০১৩ সালের ৩ জুলাই বিক্রয় পূর্বক দলিল করেন। আর শাহিনকে চেকগুলো ফেরত দিতে বলা হয়। আবুল কাহের শাহিন পোস্ট ডেটেড চেক চারটি ফেরত না দিয়ে চেক চারটি নগদায়নের জন্য ব্যাংকে উপস্থাপন করেন। অন্যদিকে শাহিনকে দেওয়া চেকগুলো সম্পর্কে ব্যাংকে ‘স্টপ পেমেন্ট ইন্সস্ট্রাকশন’ দিয়ে রাখেন ইমরান রশিদ চৌধুরী। ফলে চেকগুলো ডিজঅনার হয়। এ অবস্থায় শাহীন নিম্ন আদালতে চেক ডিজঅনারের মামলা করে তার পক্ষে রায় পান।

বিজ্ঞাপন

আইনজীবীর ভাষ্য, নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করেন ইমরান রশিদ চৌধুরী। হাইকোর্ট শুনানি নিয়ে ২০১৬ সালের ৩১ আগস্ট ইমরানের আপিল মঞ্জুর করে রায় দেন। ফলে মামলার অভিযোগ থেকে খালাস পান ইমরান রশিদ চৌধুরী। এর বিরুদ্ধে আবুল কাহের শাহিন আপিল বিভাগে আপিল করেন। এই আপিল খারিজ করে আপিল বিভাগ ওই রায় দেন।

মন্তব্য পড়ুন 0