default-image

প্রথম আলো: দেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্য কিছু অগ্রাধিকার চিহ্নিত করুন

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: ১৯৯৪ সালে বিএনপি সরকারের একটি ভুলে ওষুধের মূল্য নির্ধারণীর ক্ষমতা সরকার থেকে কোম্পানির হাতে চলে যায়। ২০২৫ সালে আমরা যখন উন্নত দেশের মর্যাদার দিকে অগ্রসর হব, তখন আমাদের নিয়মকানুনের অধিকতর বেড়ি পরতে হবে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে মানুষকে আরও চড়া দামে ওষুধ কিনতে হতে পারে। তাই আমার সুপারিশ হলো, ওষুধের মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতাটা আবার সরকার তার হাতেই নিক। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা, অস্ত্রোপচার ইত্যাদি খরচ নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। বড় ডাক্তারের বেতন অনেক বেশি করতে হবে, কিন্তু তা নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। ব্যবসায়ীদের মুনাফাবিরোধী নই আমি, কিন্তু এটা তো অন্য দশটা পণ্য নয়, তাই রাশ টানতেই হবে। বছরে চার শ কোটি টাকা বিদেশে গিয়ে চিকিৎসায় খরচ করেন বাংলাদেশিরা। কিডনি প্রতিস্থাপনে প্রতিবছর ভারতে যান বহু মানুষ। আইন বলছে, নিকটাত্মীয়রাই শুধু কিডনি দান করতে পারবেন। এটা পাল্টে বলতে হবে, যেকোনো সুস্থ ব্যক্তি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিতে পারবেন।

দেশে আধুনিক চিকিৎসা উপকরণ কতটা গরিব মানুষের সহজলভ্য?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী:১৯৮২ সালের ঔষধ নীতির যতটা মানা সম্ভব, সেটা কার্যকর করলেই ওষুধের দাম অর্ধেক কমবে। ভেজাল ওষুধও কমবে। দাম যত চড়ে, তত নকল ওষুধ বাড়ে। সরকারের তৈরি ওষুধ নকল হয় না। দেশে প্রবীণ রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে প্রবীণবান্ধব করে গড়তে হবে। নার্সরা তাঁদের ওষুধ খাওয়াতে, টয়লেটে নিয়ে যেতে বিমুখ। কিডনি মেশিন আসছে। মেশিনগুলো কে চালাবেন, কে দেখবেন—সেখানে কারিগরি লোকবলের ঘাটতি চলছে। আসলে খণ্ডিত সমাধান কোনো সমাধান নয়। সামগ্রিকভাবে দেখে সামগ্রিক সমাধান লাগবে।

কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যখাতে স্থায়ী কিছু উন্নতি হয়েছে বলে সরকারের অনেকে মনে করে

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: এটা উন্নতি না। ধাপ্পাবাজি। আরও কিছু মেশিন এসেছে। মানে মানুষের আরও প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে। বহু মানুষ আইসিইউতে গিয়ে পকেট শূন্য করে তবে মারা যাবেন। মানুষ তদারকিহীনভাবে অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে চলছে দেদার। ভবিষ্যতে অন্য ওষুধ এদের ওপর কাজ করবে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজি একজন সার্জন। এখানে যাঁদের বিশেষায়িত জ্ঞান দরকার তাঁরা হলেন ফার্মাকোলজিস্ট। তাঁদের ডাক পড়ে না। আবার বিশেষজ্ঞ কমিটি বলে আসছে অ্যান্টিবডি টেস্ট কিট ব্যবহার করতে। টিকার জন্য এটা অপরিহার্য জেনেও দায়িত্বশীলেরা নীরব। অথচ আমরা বানিয়ে বসে আছি। তাঁরা এর অগ্রগতিতে রাশ টেনে রেখেছেন।

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের সেরা অর্জন কী?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: প্রথমত, ভ্যাকসিন দেওয়া। স্বাধীনতার পরে এটা ২–৩ শতাংশ ছিল, এখন ৯০ ভাগের বেশি। বিশ্বের বহু দেশ এতটা পারেনি। দ্বিতীয়ত, মানুষ তার স্বাস্থ্যসচেতনতা থেকে খাওয়ার স্যালাইন গ্রহণ করেছে।

সংবিধানে স্বাস্থ্যসেবা এখনো ঐচ্ছিক। মৌলিক অধিকার হিসেবে এটা রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক করা সমীচীন কি না?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: কিন্তু তাতে হবেটা কী। একটি ইউনিয়নে ৫০ হাজার মানুষের বাস। গত ৫০ বছরেও তাদের জন্য দুজন করে চিকিৎসক দিতে পারিনি আমরা। পবিত্র ধর্মগ্রন্থে বাবা-মাকে সুখে–শান্তিতে রাখার কথা বলা আছে। কিন্তু আধুনিক ফ্ল্যাটগুলোতে তাঁদের জন্য রুম নেই। সংবিধানে বাধ্যতামূলক করলেও তো বাস্তবে এ রকমই হবে। কারণ, রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অভাব। ব্যক্তি তাঁর স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭০ ভাগই নিজের পকেট থেকে খরচ করেন। স্বাস্থ্য খাতের পরিভাষায় এটা হলো ওওপি বা আউট অব এক্সপেন্ডেচার। এই হার পৃথিবীতে সর্বোচ্চ। এর কারণ, নাগরিকের জন্য উন্নত মানের সরকারি বা বেসরকারি স্বাস্থ্যবিমা না থাকা। এটা চালু করতে হবে।

গবেষক ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বিআইডিএসে কর্মরত থাকা অবস্থায় ১৯৯৪ সালে দারিদ্র্য না কমার মুখ্য কারণ হিসেবে যেসব বিষয়গুলো উল্লেখ করেছিলেন তার মধ্যে বাংলাদেশিদের অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়টি ছিল। কিন্তু পরিহাস হলো, চিকিৎসাব্যয় মেটাতে প্রয়োজনে জমিজিরাত বিক্রি করে কপর্দকশূন্য হয়ে পড়া এসব মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই সুচিকিৎসা পান না। কারণ, রোগীর চাপ ও ওষুধ কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের প্রভাবে থাকা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র দিতে খুবই স্বল্প সময় নেন। মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভদের পরামর্শের প্রতি অনেক চিকিৎসকের দুর্বলতা সুবিদিত। এর কারণ, মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত সমকালীন অগ্রগতির খবর তাঁদের জানাই থাকে না। কারণ, এসব জার্নাল তাঁরা পড়েন না।

আপনার অভিযোগ সত্য হলে এটা বদলানোর দায় কার?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: অবশ্যই সরকারের। তাদের এটা অজানা নয় যে এই ধরনের অনিয়ম প্রকাশ্য-গোপনে স্বাস্থ্য খাতে বিরাজমান এবং সেটাই গোটা খাতকে কুরে কুরে খাচ্ছে। স্বাস্থ্য প্রশাসনে পর্দার মতো বড় বড় আর্থিক দুর্নীতি তো আছেই। এর বাইরে নির্ধারিত কোম্পানির ওষুধ, অকারণে দামি ওষুধ কিংবা অপ্রয়োজনীয় রোগনির্ণয় পরীক্ষা করোনার বিষয়ে ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার বিষয়ে অনেক বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ বিশ্বাস বাতাসে ভেসে বেড়ায়। অথচ এ বিষয়ে কোনো জবাবদিহি দেখি না। তবে অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এই অনিয়মের কারণে এ দেশে চিকিৎসক-রোগীর আস্থাহীনতা গভীরতর হয়ে চলছে। বিশেষ করে বড় চিকিৎসকেরাও, এমনকি তাঁদের প্রাইভেট চেম্বারে বসেও রোগীকে সময় এতটাই কম দেন যে যা রোগীর প্রতি সুবিচার বলে গণ্য করা চলে না। বহু ক্ষেত্রে একগাদা ওষুধ লেখেন চিকিৎসক, কোনটা কী ওষুধ, তার সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াসহ অবশ্য দরকারি অনেক তথ্য জেনে নেওয়ার কোনো ফুরসতই পান না রোগী বা তাঁর সঙ্গে থাকা অধিকতর সচেতন স্বজন বা আত্মীয়টিও। এ রকম অস্বস্তি ও উদ্বেগ নিয়েই শুরু হয় এক ক্লিনিক থেকে আরেক ক্লিনিক, এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘোরা, এর সঙ্গে চলে ডাক্তার ও ওষুধ বদলানো। আসলে এঁদেরই একটা বৃহৎ অংশ শেষ পর্যন্ত সুচিকিৎসা পেতে সীমান্ত পেরিয়ে যান। আমাদের এই মলিন চিত্রটা বদলাতে হবে।

কে শুরু করবে? আপনার অভিজ্ঞতা কী বলে?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী:১৯৭৩ সালে সাভারে পরিবারপ্রতি মাসে দুই টাকার কিস্তিতে (প্রিমিয়াম) স্বাস্থ্যবিমা চালু করি। বিনিময়ে চিকিৎসকদের ফ্রি পরামর্শ এবং ওষুধ, রক্ত, মলমূত্রের মতো সাধারণ সুবিধা পেতেন বিনা খরচে। কিন্তু তুলনামূলক সচ্ছলেরা গরিব মানুষের পেছনে লাইনে থেকে বিমাসুবিধা নেওয়া পছন্দ করেননি। এক যুগের ব্যবধানে ছয়টি সামাজিক শ্রেণিবিভাজননির্ভর বিমা চালু করি। ২০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকার প্রিমিয়াম। ঢাকা শহরে মাত্র ৫ হাজার এবং গ্রামে প্রায় ৫০ হাজার পরিবারের গণস্বাস্থ্যবিমা আছে। সরকার চাইলে এই ব্যবস্থাকেই তার মতো করে সারা দেশে এগিয়ে নিতে পারে। এ জন্য প্রচার-প্রচারণাটিই আসল। কিন্তু এতে সরকারের আগ্রহ দেখি না।

প্রথম আলো: আর কোনো পরামর্শ?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী:সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকের নিবন্ধন নিয়মাবলি সহজ হওয়া প্রয়োজন। সরকার ন্যূনতম যন্ত্রপাতির তালিকা স্থির করে দেবে। তবে ডাক্তার, নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা কত থাকবে, এ বিষয়ে সরকারের কাগুজে নির্দেশনাগুলো শুধু বড় দুর্নীতি বিস্তারেই সহায়ক হবে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিসের ফি নির্ধারণের মতো চেষ্টাও নিরর্থক।

এই মুহূর্তে সরকারের কাছে আপনার চাওয়া যদি একটি বাক্যে বলেন।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: প্রতিটি ইউনিয়নের হেলথ ক্লিনিকে দুজন ডাক্তার নিয়োগ দেওয়া। প্রধানমন্ত্রী যথার্থই গ্রামে ডাক্তার থাকার নির্দেশনা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিলেন। তাঁকেই সেটা এখন নিশ্চিত করতে হবে। তাঁদের ওপর শর্ত থাকবে, আগামী দুই বছর তাঁরা ইউনিয়ন থেকে নড়তে পারবেন না। শুধু এই একটি পদক্ষেপে স্বাস্থ্য খাতে আপনা–আপনি অনেক পরিবর্তন এনে দিতে পারে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0