গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ উপলক্ষে আজ শনিবার এক ওয়েবিনারের আয়োজন করে সিজিএস। ‘অন্তহীন দুঃস্বপ্ন-বাংলাদেশের ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট ২০১৮’ নামের গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিস্টিঙ্গুইশড প্রফেসর এবং সিজিএসের উপদেষ্টা আলী রীয়াজ।

ওয়েবিনারে অংশ নিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, গবেষণা বলছে মামলা দায়েরের হার ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী। প্রথম ১৫ মাসে গড়ে ৬০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। পরবর্তী ৯ মাসে গড়ে ১৪৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এই মামলা প্রয়োগ করা হচ্ছে বেশি।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর অবমাননার অভিযোগে এই সময়ে মামলা হয় ৯৮টি। এর মধ্যে ১৩টি মামলা করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বাকি ৮৫ জনের মধ্যে সরকারি দলের সঙ্গে যুক্ত ৫০ জন। এসব মামলায় আটক হয়েছেন ৫৮ জন।

একই সময়ে মন্ত্রীদের অবমাননার অভিযোগে মামলা হয়েছে ৫১টি। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ৩টি মামলা করেছে। মন্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা করেছেন ৪টি, বাকি ৪৪টি মামলা করেছেন অন্যরা। রাজনৈতিক নেতাদের অবমাননার অভিযোগে মামলা হয়েছে ৭৫টি। সংক্ষুব্ধ রাজনীতিবিদেরা মামলা করেছেন ৪০টি।
আলী রীয়াজ বলেন, সিজিএস যে ৮৯০টি মামলা তলিয়ে দেখেছে, তার মধ্যে ৫০৮টি মামলায় অভিযোগকারীর পেশা জানা গেছে। এই ৫০৮ জনের মধ্যে ২০৬ জন রাজনীতিবিদ, এরপরই রয়েছে পুলিশ। রাজনীতিবিদদের ৮১ শতাংশ আবার শাসক দলের সদস্য।

এ সময় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহারের বিষয়ে আলী রীয়াজ বলেন, আইনটি অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সাংবাদিকেরা কথা বললেও শিক্ষাবিদেরা অতটা সোচ্চার নন। এর প্রভাব দেখা যাবে কয়েক বছর পর।

ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর বলেন, আইসিটি অ্যাক্টের পর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন হলো। দেখা গেল, নাম পরিবর্তন হচ্ছে কিন্তু সারবস্তু থেকে যাচ্ছে আগের মতো। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা ধর্মীয় অনুভূতির সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। রাষ্ট্র ও সরকার এক নয়। আর ভাবমূর্তিও কোনো বস্তুগত বিষয় নয়। এখন অন্যায়-অপরাধ করলে যদি কারও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন না হয়, তাহলে এসব নিয়ে বললে বা লিখলে কেন ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে, এটা পরিষ্কার নয়। কারও অনুভূতি ঠুনকো হওয়ায় সাধারণ মানুষের বাক্‌স্বাধীনতার যে অধিকার, সেটা আপস করতে হচ্ছে। তিনি বিষয়টি নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কথা বলেন।

ওয়েবিনারে বক্তারা জানান, অভিযোগকারীদের মধ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৬৬ জন, যুবলীগের ২৮ জন, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের ১৩ জন, ছাত্রলীগের ৬০ জন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ২ জন, অন্যান্য ৩৭ জন। এই তালিকায় ৫ জন সাংসদ, ৬ জন সিটি মেয়র, ১ জন পৌরসভার প্যানেল মেয়র, ১১ জন ওয়ার্ড কাউন্সিলর, ৮ জন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, ৪ জন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও ২ জন উপজেলা পরিষদ ভাইস চেয়ারম্যানও রয়েছেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বদিউল আলম মজুমদার বলেন, কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থায় সরকার আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করে অধিকার হরণ করে। ২০১৮ সালে কাছাকাছি সময়ে দুটি আইন হয়েছিল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও নিরাপদ সড়ক আইন। তাৎক্ষণিকভাবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ব্যবহার দেখা গেলেও অন্য আইনটির ব্যবহার সেভাবে হয়নি। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আসলে হয়েছিল নির্বাচনকে মাথায় রেখে। খুলনায় শতভাগ ভোট পড়া নিয়ে খবর প্রচারের জন্য একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছিল সে সময়।

সাংবাদিক, শিক্ষক, এনজিও ও অধিকারকর্মী, রাজনীতিবিদ, ছাত্র, সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারী, ব্যবসায়ী, আইনজীবী, ধর্মীয় নেতাসহ অন্য পেশাজীবীদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে। গবেষণার তথ্য বলছে, এই সময়ে ২৫৪ জন রাজনীতিবিদ ও ২০৭ জন সাংবাদিক এই মামলায় আসামি হয়েছেন।

ফেসবুকে মন্তব্য করার জন্য মামলা হয়েছে ৫৬৮টি। এর মধ্যে ফেসবুকে হয়রানি ও আর্থিক জালিয়াতির জন্য মামলা হয় মাত্র ৮০টি। অন্যদিকে ৮৫টি মামলা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে এবং ৩৯৯টি মামলা ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ায় দায়ের করা হয়।

আলী রীয়াজ ওয়েবিনারে বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো স্বচ্ছতা নেই। মানবাধিকারকর্মী সাদ হাম্মাদি গত বছরের ৭ জুন বাংলাদেশ পুলিশের কাছে আবেদন করেছিলেন দেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মোট কত মামলা হয়েছে, কত আসামি ও কতজন গ্রেপ্তার। তথ্য কমিশন পুলিশকে বলার পরও সাদ হাম্মাদি তথ্য পাননি।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এই আইনের কারণে নিবন্ধ লেখার সময় তাঁকে বহু চিন্তা করতে হয়। তিনি বলেন, ‘আমি ফেসবুক ব্যবহার করি না, বেশির ভাগ ই-মেইলের জবাব দিই না। বই লিখতে গেলেও চিন্তা করতে হয়। তাই ভ্রমণকাহিনি লিখি।’

ওয়েবিনারে অংশ নিয়ে, আর্টিকেল নাইন্টিনের বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক ফারুখ ফয়সল বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে শুধু শিশু নয়, গৃহবধূও গ্রেপ্তার হয়েছেন। এখন নতুন দুশ্চিন্তার কারণ ওটিটিবিষয়ক নীতিমালা। এটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের চেয়েও কঠোর হবে। তার ওপর ডেটা প্রটেকশনের নামে জনগণের ব্যক্তিগত তথ্য হস্তগত করার চেষ্টা আছে।

ওয়েবিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন সিজিএসের চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরী ও সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন