প্রসব করাতে চায়ের দোকানের ব্লেডই ছিল ভরসা

সুরাইয়া ইয়াসমিন

২৫ মে রাত সাড়ে ১১টা। সারা দিন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্ব পালন শেষে মেঘনা নদীর তীরে বেড়াতে গিয়েছিলেন তিন চিকিৎসক—ডা. ফাইয়াজ হোসাইন খান, ডা. নাহিদ হাসান ও ডা. সুরাইয়া ইয়াসমিন। সঙ্গে ছিলেন তাঁদের কয়েকজন স্বজন। এ সময় তাঁরা দেখতে পান, একটি স্পিডবোট এসে থেমেছে। সেখান থেকে নামছেন একজন অন্তঃসত্ত্বা।

ঘাট থেকে উঠতে গিয়ে ওই নারী বসে পড়েন। প্রসববেদনায় তিনি আর ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে পারছিলেন না। চিকিৎসকেরা গিয়ে দেখেন, নারীর অবস্থা ভালো নয়। তারপর তাঁরা তিনজন মিলে সেখানেই নারীর স্বাভাবিক প্রসব করান। জন্ম নেয় ফুটফুটে এক কন্যাসন্তান। তিন চিকিৎসকের মধ্যে সুরাইয়া ইয়াসমিনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাদ্দাম হোসাইন

প্রশ্ন :

প্রথম আলো: শিশুটি ও তার মা এখন কেমন আছে?

সুরাইয়া ইয়াসমিন: দুজনেই ভালো আছে। ঘটনার পরদিন সকালে হাসপাতালে গিয়ে মা ও শিশুকে সুস্থ অবস্থায় দেখতে পাই আমি। ওই দিনই মুক্তা নামের ওই মা ও তাঁর সন্তানকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।

প্রশ্ন :

ঘটনার দিন রাতে ওই নারীর অবস্থা কতটা খারাপ ছিল?

সুরাইয়া ইয়াসমিন: তিনি জটিল অবস্থায় ছিলেন। সেটি বুঝতে পেরেছিলেন নাহিদ হাসান। তিনিই আমাকে বিষয়টি জানান। তখনই আমি গিয়ে দেখি ভূমিষ্ঠ হওয়ার অপেক্ষায় থাকা শিশুটির শরীরের একাংশ মায়ের পেট থেকে বেরিয়ে গেছে। আর কিছু সময় দেরি হলেই শিশুটি মারা যেতে পারত।

প্রশ্ন :

তারপর কী করলেন?

সুরাইয়া ইয়াসমিন: অবস্থা এতই জটিল ছিল যে হাসপাতালে নেওয়ার মতো সময় ছিল না। নারীর সঙ্গে তাঁর দুই জা, স্বামী ও দেবর ছিলেন—সবাই অসহায়। এদিকে প্রসব করানোর জন্য গ্লাভস, ব্লেড, জীবাণুনাশকসহ বিভিন্ন উপকরণ দরকার। তার কিছুই নেই। সেখানে শুধু একটি চায়ের দোকান খোলা ছিল। দ্রুত সেখান থেকে একটি ব্লেড নিয়ে আসা হলো। সেটিই ছিল ভরসা। তারপর কাঁথা দিয়ে ঘিরে প্রসবের ব্যবস্থা করা হলো।

প্রশ্ন :

নবজাতক বা মায়ের কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি ছিল?

সুরাইয়া ইয়াসমিন: ঝুঁকি তো ছিলই। কিন্তু কোনো উপায় ছিল না। খালি হাতে পুরো কাজ শেষ করতে হয়েছে। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। ঠিকমতো প্রসব না হলে মায়ের মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে। কিন্তু আমাদের কাছে কোনো বিকল্প ছিল না। অবশ্য প্রসবের পর মা ও শিশুটিকে দ্রুত তাদের হাসপাতালে পাঠানো হয়।

প্রশ্ন :

এমন অভিজ্ঞতা কি আগে কখনো হয়েছিল?

সুরাইয়া ইয়াসমিন: চিকিৎসক হিসেবে আমার কর্মজীবন খুব দীর্ঘ নয়। ২০১৯ সালে ময়মনসিংহ কমিউনিটিবেজড মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে পাস করেছি। ৪২তম বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগ পেয়ে তিন মাস হলো চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসেছি। এমন অভিজ্ঞতা আগে কখনো হয়নি।

প্রশ্ন :

প্রথম আলো: প্রসবের পর নবজাতকের পরিবার আপনাকে কী বলেছিল?

সুরাইয়া ইয়াসমিন: সন্তান জন্মের পর প্রসূতি মায়ের জা দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরেন। এ অনুভূতি ভাষায় প্রকাশের না। সাধারণত রোগীদের সেবা দিলে রোগীর স্বজনেরা ধন্যবাদ দেন বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। কিন্তু কেউ কখনো আমাকে এভাবে বুকে জড়িয়ে নেয়নি। এ এক অন্য রকম অনুভূতি।