বিজ্ঞাপন

অন্য অভিধানগুলো কেন মৌলিক নয়, সে প্রশ্নের জবাব দেওয়া দরকার। প্রথমে দ্বিভাষিক অভিধানগুলোর কথা বলা যাক। এই অভিধানগুলোর উৎস স্বাভাবিকভাবেই ভিন্ন ভাষার অভিধান। তাই বাংলা একাডেমির আরবি-বাংলা, উর্দু-বাংলা, ইংরেজি-বাংলা বা বাংলা-ইংরেজি অভিধানকে এককথায় অনুবাদমূলক অভিধান বলা যেতে পারে। এর মধ্যে বাংলা একাডেমির ইংরেজি-বাংলা অভিধানটি অক্সফোর্ডের অ্যাডভান্স লার্নার্স অভিধান থেকে সরাসরি অনুবাদের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলা একাডেমির বাংলা-ইংরেজি অভিধানটি তৈরি করা হয়েছে ব্যবহারিক অভিধানকে ভিত্তি ধরে নিয়ে।

বাংলা একাডেমির একভাষিক অভিধানগুলোর মধ্যে সংক্ষিপ্ত, সহজ, ছোটদের, উচ্চারণ, বানান এবং আধুনিক নামের অভিধানগুলো প্রচলিত বাংলা অভিধানগুলো থেকে সংকলিত। এতে ব্যবহারিক থেকে যেমন সহায়তা নেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি সহায়তা নেওয়া হয়েছে বিশ শতকের প্রথমার্ধে কলকাতা থেকে প্রকাশিত জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস ও হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিধান দুটি থেকে। অনেক সময়ে উনিশ শতকে প্রকাশিত অভিধান থেকেও শব্দ নেওয়া হয়েছে। সমকালীন ভাষায় সংকলিত শব্দটির কোনো প্রয়োগ আছে কি না, অনেক সময়ে সেই বিবেচনাও সংকলকদের মাথায় কাজ করেনি।

জ্ঞানেন্দ্রমোহন ও হরিচরণ ছাড়া কলকাতা থেকে প্রকাশিত অভিধানগুলোও ঢাকার অধিকাংশ একভাষিক অভিধানের মতো। সংসদ বাংলা অভিধান বা বাংলা আকাদেমির বিদ্যার্থী অভিধানের বেলায়ও সে কথা প্রযোজ্য।

অভিধানতত্ত্বে একটি কথা বারবার উচ্চারিত হয়ে থাকে, তা হলো: প্রকাশের দিনেই অভিধান সেকেলে হয়ে যায়। নকল অভিধানগুলোর কথা বলাই বাহুল্য। এমনকি জ্ঞানেন্দ্রমোহন, হরিচরণ, শহীদুল্লাহ্, এনামুল হক বা গোলাম মুরশিদ—সবার অভিধানই এই তত্ত্ব অনুযায়ী বাতিল অভিধান। বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান বা বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান যেহেতু বিশেষিত অভিধান, তাই সেসব বাতিল হওয়ার বিষয়টি আপেক্ষিক হতে পারে। কিন্তু জ্ঞানেন্দ্রমোহন, হরিচরণ বা ব্যবহারিক অভিধান অবশ্যই বাতিলের দিক দিয়ে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা অভিধান।

গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের প্রায় সব ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার অপরিহার্যতা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবেও জ্ঞানচর্চা, বিনোদন, বাণিজ্য, যোগাযোগ বিভিন্ন দিক দিয়ে বাংলা ভাষার গুরুত্ব বেড়েছে। তৈরি হয়েছে ৩০ কোটি বাংলাভাষী মানুষের একটি অদৃশ্য একক। যাঁরা নতুন অভিধান তৈরি করবেন, এই এককের বিষয়টি যেন তাঁরা ভুলে না যান।

প্রসংগত মনে রাখা দরকার, অভিধান ভাষাকে শাসন করে এবং ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে। কারণ, ভাষা ব্যবহারকারীরা অভিধান দেখে শব্দের বানান ঠিক করেন, অর্থ সম্পর্কে অবগত হন, প্রয়োগ সম্পর্কে নিশ্চিত হন, শব্দার্থের গুরুত্বক্রম স্বীকার করেন, শব্দের উচ্চারণ যাচাই করেন ইত্যাদি। অর্থাৎ ভাষা ব্যবহারকারীরা লিখতে, পড়তে বা বলতে শেখার কাজে অভিধানকেই শাসনকর্তা হিসেবে মানেন।

বাংলা ভাষা একটি বিশ্বভাষা, এই বিশ্বাস বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির অন্তরে স্থাপন করেছিলেন। বর্তমান সরকারও বাংলা ভাষাকে বিশ্বভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য সচেষ্ট। কিন্তু এই বিশ্বভাষাকে ইতিবাচকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নিখিল বাঙালির কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো অভিধান এখনো প্রণীত হয়নি। বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে অভিধান প্রণয়নের যে ঐতিহ্য বাঙালির রয়েছে, সমকালীন জ্ঞানের সঙ্গে সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন একটি অভিধান প্রণয়ন করা সময়ের দাবি। প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষাকে সাবলীল করার কাজেও সেই অভিধান আকর হিসেবে কাজ করতে পারে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন