default-image

১৯৬০-এর দশকে নানা রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের দাবি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় পরিণতি পায়। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা থেকে ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় পর্যন্ত বাঙালির রাজনৈতিক চেতনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দুর্নিবার প্রভাব বিস্তার করেন। ১৯৭১ সালের শুরু থেকে সারা দেশ কার্যত তাঁরই নির্দেশের অধীন হয়ে পড়ে।

মার্চ মাসে ঘটনার দৃশ্যপট দ্রুত পাল্টাতে থাকে। স্থগিত করে দেওয়া নবনির্বাচিত জাতীয় পরিষদ নিয়ে আলোচনার জন্য পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার নামে তিনি কালক্ষেপণই করতে থাকেন। একই সময়ে গণহত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এখানে এসে জমায়েত হতে থাকে পাকিস্তানি সেনারা। আসতে থাকে আগ্নেয়াস্ত্র।

ইয়াহিয়ার আলোচনা স্বাভাবিকভাবেই কানাগলিতে গিয়ে পৌঁছায়। পাকিস্তানি সমর-শাসকদের গণহত্যার সব প্রস্তুতি তখন সম্পন্ন। এই প্রেক্ষাপটে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

সেই সময়ের বাস্তবতা ও নিরাপত্তাজনিত কারণে এই ঘোষণা নথি সংরক্ষণ করা সম্ভব ছিল না। স্বাধীনতার পর নানাজন স্বাধীনতার ঘোষণাটি নিজেদের মতো করে উপস্থাপন করেন। সে বিভ্রান্তি দূর করার জন্য বাংলাদেশ সরকার স্বাধীনতার ঘোষণাটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে।

২০১৬ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশের সংবিধানের উপক্রমণিকায় এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ তারিখে বাঙালী জাতির অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে বাংলার ইতিহাসে সর্ববৃহৎ জনসভায় এক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বর্ণনা করিয়া স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হইবার ডাক দেন এবং ঘোষণা করেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”।’

>

গণহত্যা থেকে বিজয় পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ পার হয়েছে বহু জটিল পথ। আনন্দ-বেদনাময় সে পথরেখার চিহ্ন ধরা আছে রাশি রাশি নথিপত্রে। নির্বাচিত কিছু নথির মধ্য দিয়ে আমরা দেখব মহত্তম সেই সময়টিকে।

উপক্রমণিকায় আরও বলা হয়েছে, ‘রক্তপাতহীন স্বাধীনতা প্রাপ্তির প্রত্যাশায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের সামরিক জান্তা এবং রাজনৈতিক নেতাদের সহিত ঢাকায় আলোচনায় বসেন। কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ দিবাগত রাত্রিতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী বাঙালীদের উপর অতর্কিত হামলা চালাইয়া নির্বিচারে গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করতে থাকে। এমতাবস্থায় ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এই ঘোষণা বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে প্রচারিত হয়।’

বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলে। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার মূল্যবান দলিলটি সেখানে লিপিবদ্ধ হয়েছে এভাবে:

‘ইহাই হয়তো আমাদের শেষ বার্তা, আজ হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহ্বান জানাইতেছি যে, যে যেখানে আছ, যাহার যাহা কিছু আছে, তাই নিয়ে রুখে দাঁড়াও, সর্বশক্তি দিয়ে হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করো। পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি হইতে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাও।

শেখ মুজিবুর রহমান
২৬ মার্চ ১৯৭১’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0